ভালা হইতেছে না কিন্তু

মোকাম্মেল হোসেন
মোকাম্মেল হোসেন মোকাম্মেল হোসেন , সাংবাদিক, রম্যলেখক
প্রকাশিত: ১০:০৬ এএম, ১৯ নভেম্বর ২০২১

ট্রেন ফেল করার আতংকে ঠিকমতো ভাতও খায়নি ইব্রাহিম; ছুটতে ছুটতে পিয়ারপুর স্টেশনে এসে উপস্থিত হয়েছে। স্টেশনে আসার পর সে শুনলো, দেওয়ানগঞ্জ লোকালের ইঞ্জিন বিদ্যাগঞ্জ স্টেশনের আউটার পয়েন্টে লাইনচ্যুত হয়ে মুখে চুনপড়া জোকের ন্যায় চিৎ হয়ে পড়ে আছে। খবর শুনে ইব্রাহিমের মাথায় হাত। সে যাবে জামালপুর। খুবই জরুরি। বাড়িতে রাজমিস্ত্রি, জোগালিরা এসে বসে থাকবে। জামালপুর থেকে সিমেন্টের বস্তা কিনে আনার পর তবেই কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। তাই নাওয়া-খাওয়া ভুলে ভোরের এই ট্রেনটা ধরার জন্য ছুটে এসেছিল সে। অথচ হারামির বাচ্চা ট্রেন কারবারটা করল কী!

ইব্রাহিম দেওয়ানগঞ্জ লোকালের বাপ-মা তুলে গালি দিল। রাজমিস্ত্রি, জোগালিদের সারাদিন বসিয়ে রেখে মজুরি দিতে না চাইলে ইব্রাহিমের সামনে এখন একটাই পথ খোলা আছে। সে পথটা হচ্ছে, রিকশায় মুক্তাগাছা গিয়ে সিমেন্টের বস্তা কিনে আবার রিকশায় প্রত্যাবর্তন করা। মুক্তাগাছা যেতে ইব্রাহিমের কোনো আপত্তি নেই। তার যতো আপত্তি রিকশা ভাড়া নিয়ে।

দেওয়ানগঞ্জ লোকালে জামালপুর যেতে টিকিট কাটতে ব্যয় হবে মাত্র পাঁচ টাকা। দেওয়ানগঞ্জ লোকাল জামালপুর স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার ঘন্টাখানেক বাদে সেখান থেকে ছেড়ে আসা জগন্নাথগঞ্জ লোকালের টিকিটের দামও পাঁচ টাকা। তার মানে জামালপুর যাওয়া-আসা বাবদ বুকিংবিহীন সিমেন্টের বস্তার জন্য জিআরপি পুলিশ আর ট্রেনের চেকারকে দশ-বিশ টাকা ঘুষ দেওয়াসহ তার খরচ হবে মাত্র ত্রিশ টাকা। অথচ রিকশায় মুক্তাগাছা আপ-ডাউন করলে এই খরচটাই বেড়ে কমপক্ষে দেড়শ' টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে।

ইব্রাহিম একবার ভাবল, দুরউ, ছাতার মাথা; যামুই না। কিনতু না গেলে কি নিস্তার আছে? রাজমিস্ত্রি, জোগালিরা তো তার বাপের শালা না, ভাইগ্নার বেকায়দা অবস্থা দেখে মজুরির টাকা মাফ করে দেবে। কাজ করলে তো কথাই নেই, না করলেও সন্ধ্যার পর হাজিরা অনুসারে মজুরি দিতে হবে; কোনো টালিবালি চলবে না। বড় ক্ষতি ঠেকাতে ছোট ক্ষতির ইতরামি সহ্য না করে উপায় নেই। নিরুপায় ইব্রাহিম ছোট ক্ষতি মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে স্টেশন সংলগ্ন রিকশা স্ট্যান্ডে গিয়ে রিকশাওয়ালার সঙ্গে দরদামে লিপ্ত হলো-
: অই মিয়া, মুক্তাগাছা যাবা?
: যামু।
: কত নিবা?
: আশি টেকা।
: জোড়া কত?
: আপনের লগে তো আর কাউরে দেখি না!
: অত দেখাদেখির কাম কী তোমার? তুমি জোড়া কত নিবা কও?
: জোড়া একদাম একশ' টেকা।
: ঠিক আছে, আরেকজন পাও কিনা দেখতে থাক। আমি চায়ের স্টলে আছি।

জোড়া মিলানোর দায়িত্ব রিকশাওয়ালার উপর ছেড়ে দিয়ে ইব্রাহিম ঢুকল সেলিম মিয়ার চায়ের স্টলে। ইব্রাহিমের কপাল খারাপ। প্রায় এক ঘন্টা অপেক্ষা করার পরও মুক্তাগাছাগামী কোনো যাত্রী পাওয়া গেল না। শেষে রিকশাওয়ালা তাকে বলল-
: বিসমিল্লাহ কইয়া উইঠা বসেন। সামনে জয়বাংলা বাজার থেইকা একজন পাইলে লইয়া লমু।
জয়বাংলা বাজারেও কাউকে পাওয়া গেল না। পরিস্থিতি দেখে ইব্রাহিম মনে মনে বলল-
: কপাল আইজ ভালা মতনই ফাটছে।
ইব্রাহিমের ফাটা কপাল জোড়া লাগল খামারের বাজার পৌঁছার পর। চল্লিশ টাকা ভাড়া দিতে রাজি এমন একজনকে এখান থেকে সহযাত্রী করে নিল ইব্রাহিম। শেষ পর্যন্ত যে কিছু টাকা বাঁচানো গেল, এতেই ইব্রাহিম খুশি। তবে তার এই খুশি ভাব অধিকক্ষণ স্থায়ী হলো না। রিকশা চন্দবাড়ি পৌঁছার পরপরই সহযাত্রী শব্দ সহযোগে পায়ুপথে যে বায়ুর নির্গমন ঘটালো, তার দুর্গন্ধে ইব্রাহিমের পেটের নাড়িভুড়ি উল্টে যাওয়ার দশা।

এ ধরনের একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হয়েও ইব্রাহিম ভদ্রতা করে নিশ্চুপ রইল। কিনতু কিছুক্ষণ পর আবারও একই কাণ্ড। এবারও ভদ্রতা করে কিছু বলল না ইব্রাহিম; নাক-মুখ চেপে পরিস্থিতি সামাল দিল সে। কিনতু তৃতীয়বার যখন নির্গমিত বায়ু সেই শব্দ, সেই কুঘ্রাণ নিয়ে ইব্রাহিমের কর্ণদ্বয় ও নাসারন্ধ্রে আঘাত করল, তখন সে সরব হলো। সহযাত্রীর উদ্দেশ্যে বলল-
: ভালা হইতেছে না ভাই!
সহযাত্রী ইব্রাহিমের কথার উত্তর দেওয়ার গরজ দেখাল না; তবে কিছুক্ষণ পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে শব্দের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। ইব্রাহিম আবারও প্রতিবাদ জানিয়ে বলল-
: ভালা হইতেছে না কইলাম।
ইব্রাহিমের আপত্তি আমলে না নিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর সহযাত্রী প্রকোপিত বায়ুর শব্দ ও দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিলে ক্ষেপে গেল ইব্রাহিম। রেগেমেগে অস্থির হয়ে সে বলল-
: বেশি ভালা হইতেছে না কইলাম!
ইব্রাহিমকে এভাবে রেগে যেতে দেখে অবশেষে মুখ খুলল সহযাত্রী; বলল-
: ভাই রে, চেতেন কীজন্য! ভালা হইতেছে না বইলা চিল্লাইয়া কোনো লাভ আছে? স্টকে এর চাইতে ভালা কিছু থাকতে হইব তো? বিষয়টা একটা উদাহরণ দিয়া আপনেরে বুঝাইতেছি। এই যে দেশে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইতেছে। নির্বাচনি সংঘর্ষে এরইমধ্যে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হইছে। আহত হইছে বেশুমার। এইসব দেইখা চাইরদিক থেইকা আওয়াজ উঠছে- ভালা হইতেছে না, ভালা হইতেছে না। কিনতু নির্বাচন কমিশন এর চাইতে ভালা কিছু কি দিতে পারতেছে? পারতেছে না। কারণ, তাদের স্টকে এর চাইতে ভালা কিছু নাই। তেমনি আমার স্টকেও এর চাইতে ভালা কিছু নাই। কাজেই আপনে যতই গোসা হন, আমি নিরুপায়; এর চাইতে ভালা কিছু আপনেরে দিতে পারমু না।

[email protected]

এইচআর/জিকেএস

নির্বাচনী সংঘর্ষে এরই মধ্যে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হইছে। আহত হইছে বেশুমার। এসব দেইখা চাইরদিক থেইকা আওয়াজ উঠছে- ভালা হইতেছে না, ভালা হইতেছে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এর চাইতে ভালা কিছু কি দিতে পারতেছে? পারতেছে না। কারণ, তাদের স্টকে এর চাইতে ভালা কিছু নাই। তেমনি আমার স্টকেও এর চাইতে ভালা কিছু নাই। কাজেই আপনে যতই গোসা হন, আমি নিরূপায়; এর চাইতে ভালা কিছু আপনেরে দিতে পারমু না।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]