ভারত নয়, জনগণের কাছে যান

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ১০:০১ এএম, ২২ আগস্ট ২০২২

ড. এ কে আব্দুল মোমেন ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ানও নন, ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাটও নন। আমলা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও পরে তিনি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন শিক্ষকতায়। বড় ভাইয়ের কোটায় রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ৬ বছর জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বড় ভাই সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার পর ২০১৮ সালের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে দায়িত্ব পান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। মন্ত্রী হিসেবে তিনি সফল না ব্যর্থ, সে আলোচনায় যাওয়ার সুযোগই রাখেননি তিনি। বরং বারবার নিজের কথার ফাঁদে আটকে গেছেন।

বিভিন্ন সময়ে তার বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উষ্ণতা বোঝাতে তিনি একবার বলেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মত। কদিন আগে সিলেটের এক অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ ভালো আছে বোঝাতে তিনি বলেছিলেন, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে। দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট মানুষ তার এই অসংবেদনশীল উক্তিতে বেদনাহত হয়েছে। তিনিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রলের শিকার হয়েছিলেন।

বেহেশতে থাকার প্রতিক্রিয়া কাটতে না কাটতেই তিনি নতুন ঝড় তুলেছেন। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমির অনুষ্ঠানে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ভারত সফরে গিয়ে তিনি বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে যা যা করা দরকার, ভারত যেন তা করে সেজন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো বটেই গণমাধ্যম এবং কূটনৈতিক মহলে ঝড় নয়, রীতিমত সাইক্লোন তুলে দিয়েছে।

এর আগে ড. মোমেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নেই, এমন কথা বলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তোপের মুখে পড়েছিলেন। এমনকি চট্টগ্রামে সেদিন তার বক্তব্যের সময়ও ‘বিক্ষুব্ধ সনাতনী সমাজ’ নামে একটি সংগঠন কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচি পালন করে। আমার ধারণা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সহানুভূতি পেতেই তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কতটা উষ্ণ সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

এই চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘দুই দেশেরই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। এটি সম্ভব যদি শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন দেয় ভারত।’ ভারত ও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কারও এমন কিছু করা উচিত হবে না, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এমন কোনো উসকানি দেওয়া ঠিক হবে না, যাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেশি দেশে কয়েকটি মসজিদ পোড়ানো হয়েছে। সেটি দেশে প্রচার করতে দেওয়া হয়নি। এর কারণ হচ্ছে কিছু দুষ্ট লোক আছে, কিছু জঙ্গি লোক আছে, যারা এটার বাহানায় আরও অপকর্ম করবে। তিনি বলেন, ‘অনেকে আমাকে ভারতের দালাল বলে, কারণ অনেক কিছুই হয়, আমি স্ট্রং কোনো স্টেটমেন্ট দিই না।’

তিনি আরো বলেন, ‘কিছুদিন আগে একজন ভদ্রমহিলা একটি কথা বলেছিলেন, আমরা একটি কথাও বলিনি।... বিভিন্ন দেশ কথা বলেছে, ...আমরা একটি কথাও বলিনি। এ ধরনের প্রটেকশনও আমরা আপনাদের দিয়ে যাচ্ছি। সেটা আপনাদের মঙ্গলের জন্য, আমাদের মঙ্গলের জন্য।’ বলতে বলতে এক পর্যায়ে তিনি তার সাম্প্রতিক ভারত সফরের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে যা যা করা দরকার, তা করার জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ জানানোর কথা উল্লেখ করেন।

এটা ঠিক বর্তমান সরকারের সময়েই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের অসামান্য সহযোগিতা আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত একটা বড় ইস্যু। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দল ও সরকার ভারত বিরোধিতার কার্ড খেলেছে। এমনকি বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাও চলেছে।

বিএনপি আমলে ভারতে পাঠানোর জন্য আনা ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান আটকের ঘটনাও ভারতকে শঙ্কিত করেছে। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ভারতকে আশ্বস্ত করে যে সন্ত্রাসীদের কোনো ভাবেই বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। শুধু মুখের কথা নয়, বাংলাদেশ কাজেও তা প্রমাণ দেয়। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এখনও সীমান্তে হত্যা বন্ধ হয়নি, তিস্তার ন্যায্য পানিও আমরা পাইনি। তবে দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে।

আগেই বলেছি, মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের অসামান্য সহায়তা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। এখন ভারত শুধু নয়, যে কোনো দেশের সাথেই বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক, স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার। তবে ভারতের সাথে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সম্পর্কটা দুই দেশের জন্যই জরুরি কারণ বন্ধু বদলানো গেলেও প্রতিবেশি বদলানো যায় না।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো। কিন্তু তার মানে তো এই নয়, বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় থাকবে না থাকবে, সেটা ভারত ঠিক করবে। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো বরাবরই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভারতপ্রীতির অভিযোগ আনে। তাদের অভিযোগ, ভারতের আনুকূল্যেই আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় থাকতে পারছে। বিরোধীদের সেই অভিযোগের এতদিন কোনো ভিত্তি ছিল না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য তাদের অভিযোগের ভিত্তি দিল। বিএনপি এখন আরো জোরেশোরে সরকারের বিরুদ্ধে ভারতনির্ভরতার অভিযোগ আনবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাংলাদেশের জনগণের জন্য অবমাননকার, আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। একই সঙ্গে তার বক্তব্য দল ও সরকারের জন্য বিব্রতকর। এমনকি যাদের মন পেতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেকে ‘ভারতের দালাল’ প্রমাণে উঠে পড়ে লেগেছেন, সেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যও বিষয়টি অসম্মানজনক। কারণ যে যে ধর্মেরই হোন, আমরা সবাই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য আলাদা কোনো মাত্রা বহন করে না। বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক মহলেও বিষয়টি দারুণ অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন আলগা মন্তব্যে বিব্রত সবাই।

আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদের এই অস্বস্তিটা গোপন করেননি। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এটি তার ব্যক্তিগত মত। দল বা সরকার এর দায় নেবে না। দল বা সরকারের কেউ এসন বেফাঁস কিছু বললে, নগদে তা ব্যক্তিগত মত বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা আছে আওয়ামী লীগের মধ্যে। অতীতে বেফাঁস কথা বলে চাকরি হারিয়েছেন লতিফ সিদ্দিকী ও ডা. মুরাদ হাসান। তবে দল দায় না নিলেও সরকারকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের দায় নিতে হবে এবং সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। কারণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলেছেন, তার নিজের মন্ত্রণালয় নিয়েই।

ড. মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেই ভারত সফর করেছেন এবং সেখানে যাই বলে থাকুন, সেটা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেই বলেছেন। তাই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য তার ব্যক্তিগত মত হতে পারে না। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ সরবারের মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান আরো একদফা এগিয়ে বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দলের কেউ নন, তাই তার বক্তব্যে দল বিব্রত নয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন করেননি, বরং সমালোচনা করেছেন। তবে অস্বীকার করলেই দায় এড়ানো যাবে না। দল এবং সরকার আলাদা। তাই মন্ত্রীর বক্তব্যের দায় দল নাই নিতে পারে। কিন্তু তিনি দলের কেউ নন, এটা বলা আবার বাড়াবাড়ি। দলের কেউ না হলে তিনি মনোনয়ন পেলেন কীভাবে, এমপি হলেন কীভাবে, মন্ত্রী হলেন কীভাবে?

২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি, ভালোও হয়নি। বাংলাদেশ এখন আরেকটি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকবে কি থাকবে না, সেটা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণ; ভারত তো নয়ই, অন্য কোনো দেশও নয়। তাই আওয়ামী লীগ হোক, বিএনপি হোক; ভারত হোক, যুক্তরাষ্ট্র হোক; আমরা যেন কারো দিকে তাকিয়ে না থাকি। মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আপনি ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতকে অনুরোধ না করে, জনগণের কাছে যান। দ্রব্যমূল্যে পিষ্ট জনগণ কোন বেহেশতে সেটা কাছ থেকে দেখুন। আপনাদের আলগা কথাই কিন্তু সরকারকে আলগা করে দিতে পারে।

অনেকেই বলছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী একজন সহজ সরল মানুষ। কোনো প্যাচগোছ বোঝেন না। মনে যা আসে মুখে তাই বলেন। সারল্য একজন মানুষের বিশাল গুন। ড. মোমেনর বড় ভাই এএমএ মুহিতের মধ্যেও শিশুর সারল্য ছিল। কিন্তু দুদিন পরপর যার কথায় প্যাচ লেগে যায়, এমন সরল একজনকে মন্ত্রী বানাতে হবে কেন? আর বানাতেই যদি হবে, তাকে পররাষ্ট্রের মত স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে হবে কেন?

ভালো কূটনীতিবিদ হতে হলে একটু কুটনামিও জানতে হয়। আর ডিপ্লোম্যাসি হলো শব্দের খেলা, ভাষার মারপ্যাচ। কিন্তু আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর গত কদিনের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, ডিপ্লোম্যাসি বা ডিপ্লোম্যাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ কোনোটাই তাঁর আয়ত্বে নেই।

ডিপ্লোম্যাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ তো দূরের কথা বাংলা ভাষায়ও তিনি নিজেকে ঠিকঠাক প্রকাশ করতে পারছেন না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ হলো প্যাচ ছোটানো, আর আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন নতুন প্যাচ লাগাচ্ছেন। সরল মানুষ এখন পাওয়াই ভার। সরল মানুষ আমার খুবই প্রিয়, তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নয়।
২১ আগস্ট, ২০২২

লেখক: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ।

এইচআর/জিকেএস

মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আপনি ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতকে অনুরোধ না করে, জনগণের কাছে যান। দ্রব্যমূল্যে পিষ্ট জনগণ কোন বেহেশতে সেটা কাছ থেকে দেখুন। আপনাদের আলগা কথাই কিন্তু সরকারকে আলগা করে দিতে পারে।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।