ধর্ম

সহানুভূতির হাত প্রসারিত করি

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৫৬ এএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২

অত্যন্ত মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাটে মর্মান্তিক নৌকাডুবির ঘটনায় আমরা মর্মাহত। হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা তথা মহালয়ায় চারদিক যখন আনন্দমুখর, তখনই পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায় ঘটে গেছে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

এদিন করতোয়া নদীতে যাত্রীবোঝাই নৌকাডুবির ঘটনা মহালয়ার আনন্দকে পরিণত করে বিষাদে। নদীর পাড়ে এখন কান্নার রোল। স্বজনহারা মানুষের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠেছে পুরো জনপদ। একসঙ্গে এত প্রাণহানি, স্বজনহারা মানুষের আর্তনাদ এর আগে হয়তো দেখেনি এলাকার মানুষ। নৌকাডুবিতে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা প্রকাশ ছাড়া আমরা আর কিবা করতে পারি।

মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাশ তার এক কবিতায় যথার্থই লিখেছেন ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই’। আল্লাহপাক আমাদের দুটো হক আদায় করার আদেশ দিয়েছেন, একটি হল আল্লাহর হক অপরটি হলো বান্দার হক। ইসলামের শিক্ষা হলো, তুমি যা নিজের জন্য পছন্দ কর তা অন্যের জন্যও পছন্দ কর।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার সাথে অন্য কিছুকে শরিক করো না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, এতিম, অভাবী, আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সহচর, পথচারী ও তোমাদের অধিকারভুক্তদের সাথেও (সদয় ব্যবহার কর)। নিশ্চয় অহংকারী ও দাম্ভিককে আল্লাহ পছন্দ করেন না’ (সুরা নেসা, আয়াত: ৩৬)।

এই আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, শুধু নিজের ভাই, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতরা এবং প্রতিবেশী ও অধিনস্তদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো না, কেবল তাদের প্রতিই সহমর্মিতা প্রদর্শন করো না আর তাদের সাহায্যের প্রয়োজন হলে কেবল তাদেরই সাহায্য ও যথাসাধ্য উপকার সাধন করো না বরং যাদের এবং যেসব প্রতিবেশীকে তোমরা চেন না, যাদের সাথে তোমাদের কোনো আত্মীয়তা বা ওঠাবসার সম্পর্ক নেই, যাদের সাথে তোমাদের ক্ষণিকের পরিচয় হয়েছে মাত্র এদের ক্ষেত্রেও যদি তোমার সহমর্মিতা এবং তোমার সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে, তোমার মাধ্যমে যদি তারা কিছুটা হলেও উপকৃত হতে পারে তবে তাদের সেই উপকার সাধন কর।

ইসলামের শিক্ষা কতই না চমৎকার। এই শিক্ষার বাস্তবায়ন করলে নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর ইসলামী সমাজ গড়ে উঠবে। আজ আমাদের মনমানসিকতা এমন হয়েছে যে, নিজেদের প্রতিবেশীর কথা তো দূরে নিজ রক্তের সম্পর্ককেও বজায় রাখতে চাই না। সবাই যেন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত।

অন্যের কোনো উপকারের বা খোঁজখবর নেওয়ার চিন্তা একেবারেই নেই। আমার পাশের ঘরের পরিবারটি যে কষ্টে দিনাতিপাত করছে তার খেয়াল রাখছি না। আমরা যাই করি না কেন আল্লাহতায়ালা কিন্তু সবই দেখছেন, তিনি ঠিকই আমাদের কাছ থেকে এর হিসাব নেবেন।

একটি হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মহাপরাক্রমশালী আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম তুমি আমার সেবা শুশ্রূষা করনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রভু, তুমি সারা বিশ্বের প্রতিপালক আমি তোমার সেবা শুশ্রূষা কীভাবে করতে পারি?

আল্লাহতায়ালা বলবেন, আমার উমুক বান্দা অসুস্থ ছিল তুমি তা জানতে পেরেও তার সেবা শুশ্রূষা করনি। তুমি তার শুশ্রূষা করলে তুমি আমাকে তার পাশে পেতে- এটি কি তুমি জানতে না? হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম তুমি দাওনি। এটি শুনে আদম সন্তান বলবে, হে আমার প্রভু! তুমি তো রাব্বুল আলামীন আমি কীভাবে তোমাকে খাওয়াতে পারি।

আল্লাহতায়ালা বলবেন, তোমার কি মনে নেই আমার অমুক বান্দা খাবার চেয়েছিল, তুমি তাকে খাবার খাওয়াওনি। তুমি যদি খাবার খাওয়াতে তাহলে তুমি আমার কাছে এর প্রতিদান পেতে তুমি কি এটি জানতে না। হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। আদম সন্তান বলবে, হে আমার প্রভু! তুমিই তো সারা বিশ্বের প্রতিপালক তোমাকে কীভাবে আমি পানি পান করাতে পারি। এতে আল্লাহতায়ালা বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল কিন্তু তুমি তাকে পানি পান করাওনি। তুমি তাকে পানি পান করালে এর প্রতিদান তুমি আমার কাছে পেতে’ (মুসলিম, কিতাবুল বিরের ওয়াস সিলা, বাব ফাজলে ইয়াদাতিল মারিয)।

আরেক বর্ণনায়, হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, ‘সকল সৃষ্টিজীব আল্লাহর পরিবার। অতএব আল্লাহতায়ালার কাছে তার সৃষ্টজীবের মাঝে সেই প্রিয়ভাজন যে তার সৃষ্টজীবের সাথে দয়ার্দ্র আচরণ করে এবং তাদের প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান থাকে’ (মিশকাত, বাবুশ শাফকাতু ওয়ার রাহমাহ আলাল খালক)।

তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভালোবাসা লাভ করতে হলে তার নির্দেশিত পথে আমদের জীবন পরিচালনা করতে হবে। আর আল্লাহতায়ালার বিধি বিধানের মাঝে ইহসান বা অনুগ্রহ হচ্ছে বড় এক নির্দেশ। তিনি চান, তার বান্দারা যেন একে অপরের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে, সৎ হয়, পবিত্র জীবন যাপন করে, অন্যকে ভালোবাসে।

কে কোন জাতির বা কোন ধর্মের তা যাচাই করে ব্যবহার করার কথা বলা হয়নি। সৎকর্মশীল আমরা তখনই হতে পারি যখন আমাদের হৃদয়ে মানবজাতির জন্য অফুরান ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। এক আল্লাহ প্রেমিকের একান্ত বাসনা এটাই যে, সে যেন আল্লাহতায়ালার প্রকৃত প্রেমিক হতে পারে।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত হুযায়ফা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল করিম (সা.) বলেন, ‘তোমরা অন্যের দেখাদেখি এ কথা বলো না যে, মানুষ আমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করলে আমরাও সদ্ব্যবহার করবো। আর তারা আমাদের প্রতি অন্যায় করলে আমরাও তাদের সাথে অন্যায় করব। বরং তোমরা নিজেদের তরবিয়ত এভাবে কর যেন মানুষ তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করলে তোমরা তাদের সাথে ইহসান করবে। আর তারা তোমাদের সাথে দু্র্ব্যবহার করলেও তোমরা অন্যায় আচরণ করবে না। (তিরমিজি, কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদাবি)।

কতই না সুন্দর এ শিক্ষা, যা থেকে বোঝা যায়, আমাদের সাথে যদি কেউ সাধারণ নেকিও করে, তাহলে আমিও যেন তার সাথে ইহসান সুলভ আচরণ করি। যে আমার সাথে সামান্য ভালো ব্যবহার করেছে তার সাথে এর কয়েকগুণ বেশি ভালো করতে হবে। আর এখানেই শেষ নয়, বরং বলা হয়েছে যদি আমাদের সাথে কোনো মন্দ আচরণও কেউ করে, তার পরও আমি যেন তার প্রতি কোনো অন্যায় না করি।

মানুষের প্রতি যারা অনুগ্রহশীল, তাদের আল্লাহপাক অনেক ভালোবাসেন। হজরত আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল করিম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর খাতিরে কোনো অনাথ ছেলে বা মেয়ে শিশুর মাথায় স্নেহভরে হাত বুলায় তার বিনিময়ে সে সেই শিশুর প্রতিটি চুলের জন্য পুণ্য লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি তার অধীনস্ত অনাথ ছেলে বা মেয়ে শিশুসন্তানের প্রতি অনুগ্রহ করে সেই ব্যক্তি আর আমি জান্নাতে এভাবে থাকব (তারপর রাসুল করিম (সা.) নিজের দুটি আঙুল এক সাথে মিলিয়ে দেখালেন (মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫০, বৈরুত থেকে প্রকাশিত)।

 

ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, একজন নারী এ কারণে নরকাগ্নিতে প্রবেশ করেছে যে, একটি বিড়ালকে সে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত রেখেছিল। অপরদিকে পিপাসার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করানোর ফলে এক ব্যক্তি বেহেশত লাভ করেছে। সৃষ্টির সেবা যে কত মহান কাজ, তা উল্লিখিত দুটি ঘটনা দ্বারা সহজে অনুমেয়।

ধর্ম, মানুষের সুখ-শান্তি ও পথ প্রদর্শন এবং আলোর সন্ধান দেয়। মানুষ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে ভালোবাসে এবং জীবন ধারণের জন্য একে অপরের ওপর নির্ভর করে। একা কেউই তার নিজ প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারে না। একে অপরের সহায়তা করবে এবং করে থাকে এটাই স্বাভাবিক।

আমাদের উচিত হবে, যার যতটুকু সাধ্য আছে সে অনুযায়ী মানুষের উপকার করা। আমাদের উচিত হবে, পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাটে মর্মান্তিক নৌকাডুবির ঘটনায় নিহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। এই পরিবারগুলো যা হারিয়েছে তা আর কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয় কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া সবার কর্তব্য। আমরা আশা করব, মানবিক এই সরকার সর্বোচ্চ দরদ নিয়ে দিশেহারা হতভাগ্য নিঃস্ব এই পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবে। এই ক্ষতি কোনো কিছুর বিনিময়ে পূরণ হওয়ার নয় কিন্তু আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনে কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারি না।

এইচআর/ফারুক/জিকেএস

কে কোন জাতির বা কোন ধর্মের তা যাচাই করে ব্যবহার করার কথা বলা হয়নি। সৎকর্মশীল আমরা তখনই হতে পারি যখন আমাদের হৃদয়ে মানবজাতির জন্য অফুরান ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। এক আল্লাহ প্রেমিকের একান্ত বাসনা এটাই যে, সে যেন আল্লাহতায়ালার প্রকৃত প্রেমিক হতে পারে।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।