বন্দর নগরীর তিন আসনে হেভিওয়েটদের মর্যাদার লড়াই

আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৬:২১ পিএম, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

টানা ১০ বছর পর আবারও লড়াই হবে নৌকা ও ধানের শীষে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী তালিকাও চূড়ান্ত। একটি বাদে বাকি ১৫ আসনে পুরনোদের ওপর আস্থা রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থী তালিকায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। জেলার ১৬ আসনের আটটিতে নতুন মুখ নিয়ে এসেছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিজ্ঞতা ও মাঠের রাজনীতিতে চট্টগ্রামের ১৬ আসনেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটপ্রার্থীরা এগিয়ে। সে অনুপাতে অর্ধেক আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের থাকছে নতুন প্রার্থী। তবে নতুন বলেই ভোটের মাঠে তারা পিছিয়ে পড়বেন-এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।

বিগত পাঁচ সংসদ নির্বাচনের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক চারটির (১৯৯১-২০০৮) ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চট্টগ্রামে আনুপাতিক হারে বিএনপির ভোট বেশি। সবমিলিয়ে এবার চট্টগ্রামে দুই জোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার মনে করেন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ আসনেই আওয়ামী জোটের সংসদ সদস্যরা দুই মেয়াদে আছেন। এলাকার জনগণ ও প্রশাসনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও বেশি। সেই সুবিধা নিতে দলটি তাদের প্রার্থী তালিকায় তেমন কোনো পরিবর্তন আনেনি। তবে এর সুফলের পাশাপাশি অসুবিধাও আছে। ওইসব সংসদ সদস্যের ভালো-খারাপ সবই ভোটারদের জানা। সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।

‘অন্যদিকে, বিএনপি ১০ বছর পর নির্বাচনে এসেছে। তাই তাদের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন থাকবে-এটা স্বাভাবিক। তবে রাজনীতি আর ভোটের মাঠে অভিজ্ঞতার আলাদা মূল্যায়ন আছে। একেবারে আনকোরা এসব প্রার্থী মাত্র ১৯ দিনে (৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন) কীভাবে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তৈরি করবেন তা দেখার বিষয়। সেদিক বিবেচনায় তারা হয়তো কিছুটা পিছিয়ে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রার্থীর চাইতে প্রতীকই যে বড়’- যোগ করেন এ বিশ্লেষক।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্টের আসনভিত্তিক প্রার্থী পরিচিতি, ভোটের প্রস্তুতি, দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, ভোটের মাঠে প্রার্থীদের সর্বশেষ অবস্থান ও সম্ভাবনা এবং প্রার্থীদের নিয়ে ভোটাররা কী ভাবছেন-এসব নিয়ে জাগো নিউজ’র চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন ‘অভিজ্ঞতায় এগিয়ে আ.লীগ, ভোটের হিসাবে বিএনপি’- এর তৃতীয়টিতে আজ থাকছে চট্টগ্রামের হেভিওয়েট আসন-‘৯, ১০ ও ১১’ এর আদ্যোপান্ত।

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন

বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সবচেয়ে হাইভোল্টেজ আসন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি)। চট্টগ্রামে একটি প্রবাদ চালু আছে, ‘কোতোয়ালি আসন যারা জেতে, তারাই সরকার গঠন করে’। স্বাধীনতার পর থেকে এর স্বাভাবিক পুনরাবৃত্তি চলে আসছে। এবার সেই হাইভোল্টেজ আসনে নির্বাচন করছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন ও আওয়ামী লীগের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

এবারের নির্বাচন এদের দুজনেরই প্রথমবারের মতো নির্বাচন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের এ আসনটিতে প্রথমবারের মতো ইভিএমে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। যা নিয়ে এ আসনের ভোটারদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

chart-3

এবারের নির্বাচনের মধ্যদিয়েই চট্টগ্রামে রাজনীতির মাঠে যাত্রা শুরু হচ্ছে নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের। তবে সে মাঠের পুরনো খেলোয়াড় কারাবন্দী ডা. শাহাদাত হোসেনের রয়েছে ‘৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম’র চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা।

চট্টগ্রামে এই দুই পেশাজীবী রাজনীতিকের রয়েছে ‘ক্লিন ইমেজ’। তাই চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে বড় দুই রাজনৈতিক দলের দুই পেশাজীবী রাজনীতিক নেমেছেন মর্যাদার লড়াইয়ে।

চট্টগ্রাম মহানগরের সদর আসন হওয়ায় কোতোয়ালি-বাকলিয়া নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৯ আসনে অতীতে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ-দুই দলের প্রার্থীই একাধিকবার বিজয় লাভ করেছেন। ফলে দুই দলের ভোটার-সমর্থকরাই বিজয়ের ব্যাপারে সমান আশাবাদী। চট্টগ্রামের এ আসনে নওফেল-শাহাদাতের সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পেশাজীবী এই দুই রাজনীতিকের কে হবেন বিজয়ী-এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

কোতোয়ালি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা নিয়ে হয়েছে দারুণ নাটকীয়তা। এ আসনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন দৌড়ে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিলেন জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দীন আহমেদ বাবলু। কিন্ত রাতের ব্যবধানে এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী করা হয় ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে। জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বর্তমান দূরত্বের কারণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে এ বিষয়টিকে।

তিনি ছাড়াও প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ও নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুলের মতো হেভিওয়েট নেতারা।

তাই এখানে নৌকার প্রার্থী নওফেলের চ্যালেঞ্জ শুধু বিএনপি নয়। স্থানীয় রাজনীতিতে মহিউদ্দিনের বিরোধী হিসেবে পরিচিত আওয়ামী শিবিরের বিরুদ্ধেও তাকে লড়তে হচ্ছে। মাঠের রাজনীতিতে তা দৃশ্যমান না হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিষয়টি ‘ওপেন সিক্রেট’। তবে বাবা মরহুম এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত ইমেজ মাঠের লড়াইয়ে এগিয়ে রাখছে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে।

এদিকে গত ৭ নভেম্বর ঢাকা থেকে গ্রেফতার হয়ে চট্টগ্রাম কারাগারে অন্তরীণ আছেন নগর বিএনপির সভাপতি ও চট্টগ্রাম-৯(কোতোয়ালি) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। সরাসরি ভোটের মাঠে থাকতে না পারলেও সম্প্রতি জেল থেকে নিজ আসনের ভোটারদের প্রতি তার লেখা চিঠি আলোচনার জন্ম দেয়। ইতোমধ্যে ডা. শাহাদাতের পক্ষে মাঠে নেমেছেন এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে থাকা আরেক বিএনপি নেতা শামসুল ইসলাম ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, ডা. শাহাদাত হোসেন জেলে থাকলেও ভোটের মাঠে তার প্রভাব পরবে না। বিশেষ করে বাকলিয়া এলাকায় তার আলাদা পরিচিতির কারণে ভোটের মাঠে তিনি এগিয়ে থাকবেন।

কোতোয়ালি (চট্টগ্রাম-৯) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯০ হাজার ৩৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার আছেন ২ লাখ ৪ হাজার ১৭৮ জন ও নারী ভোটার আছেন ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৫ জন।

১৯৯১ সাল থেকে চারদফা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমান দুবার বিজয়ী হয়েছে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হন বর্তমান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম এ মান্নান (প্রয়াত) এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন নুরুল ইসলাম বিএসসি। তাই ভোটাররা বলছেন, ভোট সুষ্ঠু হলে এবার লড়াই হবে সমানে সমান।

chart-2

চট্টগ্রাম ১০ (ডবলমুরিং) আসন

চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ ডবলমুরিং-হালিশহর-খুলশী-পাঁচলাইশ ও পাহাড়তলী থানার একাংশ নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং) আসন। বরাবরই এ আসন থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও নগরের সবচেয়ে অবহেলিত এলাকা এটি।

এবারের নির্বাচনেও জলাবদ্ধতা, গ্যাস সংকট, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানা সমস্যার দিকগুলোই ভোটের মাঠের প্রধান ইস্যূ হয়ে সামনে এসেছে। এখানে ১৯৯৬ থেকে টানা চারবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া ও গত দুই মেয়াদে সাংসদ ডা. আফছারুল আমীন এবারও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হচ্ছেন। তবে এর পেছনেও কম পানি ঘোলা হয়নি।

মনোনয়ন দৌড়ের শুরুতে পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত নিজের টিকিট বজায় রেখেছেন পরিচ্ছন্ন ইমেজের ডা. আফছারুল আমীন। তার বিকল্প হিসেবে জোরেশোরে আলোচনায় ছিলেন সাবেক মেয়র মনজুর আলম।

নির্বাচনী এলাকায় এ মানুষটির চলাফেরা নিতান্তই সাদামাটা, অন্য দশজনের মতো জীবনযাপন করেন ডা. আফছারুল আমীন। এমপি-মন্ত্রী থাকার সময়ও পুলিশ প্রটোকল-গানম্যান ছাড়াই তিনি চলাফেরা করেন। সাদামাটা মানুষটির রাজনৈতিক দর্শনটাই অন্যরকম, সবার থেকে আলাদা। শোডাউন, লোকদেখানো, মিথ্যা আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি, স্ট্যান্টবাজি তিনি অপছন্দ করেন। এসব কারণে নির্বাচনী এলাকায় তার রয়েছে আলাদা মূল্যায়ন। মূলত সেই কারণেই বারবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ডা. আফছারুল আমীন।

এ ছাড়া তিনি প্রচলিত ‘হেভিওয়েট প্রার্থী’ হিসেবে নিজেকে ও অন্যকে মানতে নারাজ। তার ভাষায়, ‘মসজিদের সব মুসল্লি যেমন সমান, একইভাবে পরীক্ষার হলের সব পরীক্ষার্থীই সমান।’

ডা. আফছারুল আমীন বলেন, ‘সাধারণ ভোটারেরা চিরাচরিত প্রথায় ভোট দেয়। আমরা তো মাছে-ভাতে বাঙালি। বাঙালিরা কোনটা ভালো কোনটা মন্দ বোঝে। তাই তারা বুঝেশুনেই ভোট দেবেন।’

এদিকে এ আসনের আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান। নির্বাচনী এলাকায় তারও রয়েছে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা। ২০০৮ সালে এ আসন থেকে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে অল্প ভোটে পরাজিত হন তিনি। তবে নির্বাচনে হেরেও এলাকা ত্যাগ করেননি বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান। বরং পরবর্তী নির্বাচনের জন্য নিজেকে গুছিয়ে নেন। তাছাড়া চট্টগ্রাম-১০ আসনভুক্ত থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে আছে বলে ধারণা করা হয়।

তবে স্থানীরা বলছেন, চট্টগ্রাম-১০ আসনে আওয়ামী লীগবিরোধী ভোট বেশি। কিন্তু অন্য এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল নোমান এ সুযোগ কতটুকু কাজে লাগাতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘২০০৮ সালে আমি হালিশহর-ডবলমুরিং থেকে প্রথম নির্বাচন করি। কারচুপি না হলে আমিই সে নির্বাচনে বিজয়ী হতাম। এবারও অনেক আগে থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছি। সুষ্ঠু ভোট হলে ধানের শীষের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। তবে এ পর্যন্ত সুষ্ঠু ভোটের কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। গতকাল (বুধবার) সরকার দলের সন্ত্রাসীরা ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে আমার নির্বাচনী প্রচারে হামলা চালিয়ে মাইক ভাংচুর করেছে।’

চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার আছেন ২ লাখ ৪০ হাজার ২১০ জন ও নারী ভোটার আছেন ২ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন।

১৯৯১ সাল থেকে চার দফা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে এ আসনে তিনবারই বিএনপি জয়লাভ করেছে। ১৯৯৬ থেকে টানা চারবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া আফছারুল আমীন ২০০৮ সালে ৯ হাজার ২৯১ ভোটের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো বিএনপির প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমানকে পরাজিত করেন। সবমিলিয়ে ভোটের হিসেবে এ আসনে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে থাকলেও লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।

Chart-1

চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর) আসন

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে চট্টগ্রাম-১০ আসনটির সীমানা পুনর্বিন্যাস করে নতুন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) সংসদীয় আসনটি গঠন করে করে নির্বাচন কমিশন। শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য এ এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর-পতেঙ্গা এলাকাকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির ‘হৃৎপিণ্ড’। বন্দর, রফতানিকরণ অঞ্চল, কাস্টম হাউস, বিমানবন্দর, তেল শোধনাগারের মতো এক ডজনেরও বেশি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে এই এলাকায়।

সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর প্রথম নির্বাচনে অংশ নিয়েই চমক সৃষ্টি করেন জামায়াত ঘরনার বলে পরিচিত চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম এ লতিফ। বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে হারিয়ে প্রথম এমপি হন তিনি। কিন্তু প্রায়শই বিতর্কের জন্ম দেয়া এই সংসদ সদস্য অনেক জল ঘোলার পরেও তৃতীয় দফায় নৌকার প্রার্থী হয়েছেন।

তবে এ আসেন বিএনপি’র হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে লড়াই করার আগে নিজ দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমঝোতায় আসাটাই প্রথম কাজ লতিফের। আগামী ১৭ দিনে তিনি তা কতটা করতে পারবেন সেটাও দেখার বিষয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর) আসনে প্রথমে দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাকে বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী এম এ লতিফকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এবারও জোরেশোরে আলোচনায় ছিলেন খোরশেদুল আলম সুজন। তবে অজানা কারণে দলীয় সিদ্ধান্ত আসে এম এ লতিফের পক্ষে।

তবে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ লাঘবে মহেশখালের বাঁধ অপসারণে ব্যতিক্রমধর্মী আন্দোলন গড়ে তুলে এলাকাবাসীর কাছে আলোচিত খোরশেদ আলম সুজন। মহেশখালের বাঁধ অপসারণ করে বাঁকটি সোজা করায় হালিশহর, আগ্রাবাদ এক্সেস রোডসহ আশপাশ এলাকার মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি পাচ্ছে জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের পানির দুর্ভোগ থেকে। ইপিজেড, বন্দরসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনেও রয়েছে তার আলাদা নেটওয়ার্ক। তাই স্বাভাবিকভাবে খোরশেদ আলম সুজনের আয়ত্তে থাকা বিশাল ‘ভোট ব্যাংক’কে কতটুকু ভাগ বসাতে পারবেন, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে গেলেও এর আগে বর্তমান চট্টগ্রাম-১১ আসনের বন্দর ও পতেঙ্গা এলাকা নিয়ে অবিভক্ত চট্টগ্রাম-১০ আসনে নির্বাচন করে তিনবারের সাংসদ বিএনপি প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাই স্থানীয়দের দাবি, এম এ লতিফের বিতর্কিত কার্যক্রম ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জনপ্রিয়তা এ আসনে কিছুটা এগিয়ে রাখবে ধানের শীষকে।

তবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল (বুধবার) অভিযোগ করেন, প্রচারণা শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচনে তার প্রস্তাবক ডবলমুরিং থানা বিএনপির সভাপতি ও দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের প্রাক্তন কমিশনার মোহাম্মদ সেকান্দর আলমকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। এ ছাড়া গতকাল দুপুর পৌনে দুইটার দিকে পূর্ব মাদারবাড়ি সিটি কর্পোরেশনের বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে তার নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা করেছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ।

এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমার নির্বাচনী প্রস্তাবকারীকেই (সেকান্দর) পুলিশ নিয়ে গেল! দিস ইজ ইমপসিবল। এভাবে হলে তো নির্বাচন করার কোনো দরকার নেই। সবাইকে গ্রেফতার করলে কাকে নিয়ে নির্বাচন করব?’

নবগঠিত চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর) আসনে প্রথম দফা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম এ লতিফ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৯১ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেবার তার নিকটতম প্রতিদন্দ্বী বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৪৬ ভোট।

[জাগো নিউজ’র চার পর্বের বিশেষ আয়োজন ‘ভোটের বাদ্য’। আগামীকাল থাকছে ‘চট্টগ্রাম-১৩, চট্টগ্রাম-১৪, চট্টগ্রাম-১৫ ও চট্টগ্রাম-১৬’ আসনের আদ্যোপন্ত নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ (অভিজ্ঞতায় এগিয়ে আ.লীগ, ভোটের হিসাবে বিএনপি-৪)। বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন জাগো নিউজে]

এসআর/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :