ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে হত্যা-নির্যাতনের আরও পাঁচ অভিযোগ

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:২৮ এএম, ০৯ অক্টোবর ২০১৯
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ রাব্বীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আলোচনায় ওঠে এসেছে ছাত্রলীগের নাম। সম্প্রতি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।

আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন ও নৃশংসতার এমন অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন ও নির্যাতনের অনেক ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার বার শিরোনাম হয়েছে।

শুধু সাধারণ শিক্ষার্থী নয় সাধারণ মানুষ যেমন হত্যা বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তেমনি নিজ দলের অনেক নেতাকর্মীও রয়েছেন।

গণমাধ্যমে সমালোচনা-বিতর্কের ঝড় উঠলেও এসব ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে খুব কম ক্ষেত্রেই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যার ফলে ছাত্রলীগের নেতারা নিজেদের সকল আইনের ঊর্ধ্বে কি না -সে প্রশ্নও উঠেছে বার বার। ক্ষমতাসীন এ দলের নেতারাও প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন যে, ছাত্রলীগের বেপরোয়া কাজকর্মে তারাও বিব্রত।

সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর পাঁচ ঘটনা

১. ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়ায় চোখ জখম
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এহসান রফিক নিজের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রলীগের এক নেতাকে একটি ক্যালকুলেটর ধার দিয়েছিলেন। মাস কয়েক পার হলেও সেটি ফেরত পাননি।

ফেরত চাওয়ায় শুরুতে কথা-কাটাকাটি হলেও ঘটনার জেরে পরে তাকে হলের একটি কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। এহসান রফিকের একটি চোখের কর্নিয়া গুরুতর জখম হয়েছিল।

তার সেই ফুলে ওঠা চোখ আর কালশিটে পরা চেহারার ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পরেছিল। পরের দিকে চোখের দৃষ্টি প্রায় হারিয়ে ফেলছিলেন এহসান রফিক। পরে চোখে অস্ত্রোপচার করানো হয়।

ওই ঘটনায় একজনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার ও সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

২. বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরনো ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে দিনে দুপুরে খুন হন এলাকার একটি দর্জি দোকানের কর্মী বিশ্বজিৎ দাস। সেদিন বিএনপির-নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচি চলছিল।

ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে তাদের একটি মিছিল পৌঁছালে সেখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মীরা হামলা চালায়।

সেখানে পথচারী বিশ্বজিৎ দাসকে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা ধারালো অস্ত্র ও রড দিয়ে আঘাত করে। শুধু তাই নয়, সংবাদমাধ্যমের অনেকগুলো ক্যামেরার সামনেই তাকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল সেদিন।

নির্মমভাবে ওই হত্যার দৃশ্য, রক্তাক্ত শার্ট পরা বিশ্বজিতের নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টার ছবিসহ খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ওই ঘটনার মামলার রায়ে ৮ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনের যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছিল।

তবে পরবর্তীতে বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে।

৩. জুবায়ের হত্যাকাণ্ড
২০১২ সালের শুরুর দিকের ঘটনা ছিল জুবায়ের হত্যাকাণ্ড। জুবায়ের আহমেদ ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। তিনি নিজেও ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন।

৮ জানুয়ারি ছাত্রলীগের মধ্যে অন্তর্কলহের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতরভাবে আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

জুবায়ের আহমেদের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সময় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জনের কর্মসূচিসহ নানা চাপে চাপে সে সময়ের উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ওই ঘটনায় মামলা আপিল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। গত বছর পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তরা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী।

৪. দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত মরদেহ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় একটি ভাড়া বাসা থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

প্রথম দিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তাকে হত্যা করার আলামত না মিললেও বাবার করা নতুন হত্যা মামলায় পুনরায় ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত পাওয়া যায়।

দিয়াজের মরদেহের প্রথম ময়নাতদন্ত হয় ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর। দুইদিন পর পুলিশ জানায়, তাকে হত্যা করার আলামত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মেলেনি।

ছেলে হত্যার বিচার না পেয়ে দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মা জাহেদা আমিন চৌধুরী একাই ব্যানার পোস্টার নিয়ে প্রতিবাদ জানান অনেকবার। মামলাটি এখনো সিআইডিতে তদন্তাধীন রয়েছে।

৫. এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে আগুন
এটিও ২০১২ সালের ঘটনা। সিলেটে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছিল। যার ফলে পুড়ে যায় ছাত্রাবাসের ৪০টিরও বেশি কক্ষ। সেদিন ছাত্র শিবিরের কর্মীদের সাথে ছাত্রলীগ কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছিল।

ঘটনার পাঁচ বছর পর বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যাতে বলা হয়, সংঘর্ষের জের ধরে ছাত্রলীগের কর্মীরাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছিল তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছাত্রলীগের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল।

ওই ছাত্রলীগ কর্মীদের অবশ্য তার আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়। সেগুলো এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

আরএস/জেআইএম