এজলাসে হট্টগোল: অ্যাটর্নি জেনারেলকে দুষলেন বিএনপির আইনজীবীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৩৭ পিএম, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯

দীর্ঘ তিন ঘণ্টা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে বিএনপির সমর্থক আইনজীবীদের অবস্থান করিয়ে বিচার কাজ বন্ধ রাখার ঘটনার জন্য বিএনপির আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন উল্টো রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলকেই দায়ী করেছেন।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগে হট্টগোলের পর সংবাদ সম্মেলন করে এ দোষারোপ করেন মাহবুব।

খালেদার জামিনের বিষয়ে শুনানি করতে গিয়ে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টা এজলাস কক্ষে অবস্থান করার পর এই ঘটনাকে নজিরবিহীন বলেও উল্লেখ করেছেন বিএনপির এ আইনজীবী।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল বৃহস্পতিবার। তবে খালেদার স্বাস্থ্যের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি না হওয়ায় তা আজ আদালতে দাখিল করেনি রাষ্ট্রপক্ষ। সেজন্য বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন শুনানি ফের পিছিয়ে আগামী ১২ ডিসেম্বর শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেন আপিল বিভাগ।

জামিন আদেশকে কেন্দ্র করে বিএনপির আইনজীবীরা চকলেট মুখে এজলাস কক্ষে অবস্থানের পাশাপাশি এক পর্যায়ে হট্টগোলের সৃষ্টি করেন। হইচই ও হট্টগোলের মধ্যে ১০টার পর এজলাস থেকে নেমে যান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ। এজলাস থেকে নেমে যাওয়ার সময় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের উদ্দেশ করে বলেছেন, সব কিছুর সীমা থাকা উচিত। আপনারা এজলাস কক্ষে যে আচরণ করেছেন, তা নজিরবিহীন।

এ ঘটনায় সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ সফিউর রহমান মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আজকে যে ঘটনা ঘটেছে তার সব দায়-দায়িত্ব অ্যাটর্নি জেনারেলের। কেননা বেগম খালেদা জিয়ার মামলায় মেডিকেল রিপোর্টের দরকার হয় না। এ মামলায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর। সাত বছরই তাকে দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। আজকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাজতে রয়েছেন অথচ এ ধরনের মামলায় শত শত আসামি জামিন নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমি প্রথম থেকে বলে এসেছি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বেগম জিয়াকে জেলে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বেগম খালেদা জিয়াকে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করা যাবে না। তারই প্রমাণ আজকে আপনারা পেয়েছেন। যেখানে সাত বছরের সাজার মধ্যে দেড় বছর ধরে তিনি জেলে। তার ওপর একজন নারী হিসেবে জামিন পাবেন না, এর চেয়ে ন্যক্কারজনক আর কিছু হতে পারে না।

দণ্ড নিয়ে কারাগারে থাকা খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের সমালোচনা করে খন্দকার মাহবুব বলেন, একটি বিচারাধীন মামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়া রাজার হালে আছেন। আল্লাহ যদি কোনো দিন সুযোগ দেন, বাংলার জনগণ একদিন তাকেও হয়তো এমন সুযোগ দেবেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, একটা মামুলি মামলায়, মিথ্যা অভিযোগে খালেদা জিয়াকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রায় এক বছর ১০ মাস ধরে জেলে। কেন এতোদিনে তার জামিন হয়নি আজকে আপনারা তা বুঝতে পারছেন।

তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তির আদেশ হবে। যে রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছে, যেকোনও আদালতে মানবিক কারণে সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে জামিন দিতে পারেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আজকে খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের দ্বিতীয় রিপোর্টে কী আছে সেটিও জয়নুল আবেদীন উল্লেখ করেছেন। একটা সামান্য অজুহাতে আদালত সাত দিন সময় দিয়েছেন। যা অপ্রত্যাশিত।

সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে এবং এই কারণেই খালেদা জিয়ার মুক্তি এতোদিন দেরি হয়েছে উল্লেখ করে মওদুদ আহমদ বলেন, আমি মনে করি, শুধুমাত্র মানবিক কারণে তার জামিন চাওয়া হয়েছে। মেরিটে আলোচনা করেননি। শুধুমাত্র তার স্বাস্থ্যগত কারণে তার জামিন দেওয়া উচিত। আমাদের আইনে সেকশন ৪৯৭-এ এটা দেওয়া আছে। কোনও আসামি যদি নারী হন, অসুস্থ হন, বয়স্ক হন তাহলে কোর্ট তাকে জামিন দিতে পারেন। এটা একেবারে সামান্য জিনিস।

আজকের কোর্টের অবস্থা পেশাগত জীবনে দেখেননি উল্লেখ করে সাবেক এ আইনমন্ত্রী বলেন, আমি বলবো আমাদের আইনজীবীরা আজকে প্রচণ্ড প্রতিবাদ করেছেন এবং তারা ন্যায়বিচার চান বলে দাবি করেছেন আদালত কক্ষে। তারা ক্ষোভ থেকে এমনটি করেছেন।

তিনি বলেন, আমি পেশাগত জীবনে এ রকম ঘটনা দেখেনি। আমরা পাকিস্তান আমল থেকে বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এমনকি আওয়ামী লীগের বড় নেতাদেরও স্বাস্থ্যগত বিষয় দেখিয়ে জামিন পেয়েছি। এই ধরনের কোনো আচরণ বা এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা আমার পেশাগত জীবনে দেখিনি। তারপরও বলবো আমাদেরকে ধৈর্য্য ধরতে হবে, পরের বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

বিএনপির আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, আপনারা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছেন জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে মামলা দিয়ে জেল খানায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। বেগম জিয়া ভালো মানুষ হিসেবে জেলখানায় গিয়েছেন কিন্তু এখন তিনি চিকিৎসার অভাবে জেলখানায় ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। তার যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা সেই চিকিৎসা তিনি জেলখানায় পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি আছেন, সেখানেও তিনি চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তার শারীরিক অবস্থা জানার জন্য আমাদের সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি তার আত্মীয়-স্বজনকেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না সেখানে।

এফএইচ/পিআর