খালেদার আইনজীবীর নৈতিক স্খলনে বিএনপিতে অস্বস্তি

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৩১ পিএম, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯
ফাইল ছবি

সহকারী জুনিয়র আইনজীবীর স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া ও অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ঝগড়া-মারামারির জেরে শ্রীঘরে যেতে হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও দলের আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে। তার এমন নৈতিক স্খলনে ভীষণ অস্বস্তির মধ্যে পড়েছেন দলটির নেতারা। বিষয়টি নিয়ে ‘বুক ফাটলেও মুখ ফাটছে না’ তাদের।

গত ৪ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের সামনে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তার সহকারী জুনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আতিকুর রহমানের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া ও অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ঝগড়া-মারামারির সময় কলাবাগান থানা পুলিশের হাতে আটক হন। আতিকুর রহমান নারী হেনস্থা, প্রতারণা ও সংসারের ক্ষতির অভিযোগ তুলে কায়সার কামালের বিরুদ্ধে মামলা করলে পুলিশ তাকে ওই মামলায় গ্রেফতার করে।

আতিকুর মামলায় অভিযোগ করেন, তার অজান্তে তার স্ত্রীকে নিয়ে কায়সার কামাল গোপনে গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াতেন, বিভিন্ন স্থানে সময় কাটাতেন। একপর্যায়ে কায়সার কামাল ও আতিকের স্ত্রীর মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে আতিকের সংসারে ও ব্যক্তি হিসেবে বিপুল ক্ষতি হয়েছে।

পরে সেই মামলায় কায়সার কামালকে আদালতে তোলা হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরনারীতে আসক্তির কারণে ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ত্যাগ করেছেন তার স্ত্রী। এই সুযোগে কায়সার কামাল লন্ডন ও ঢাকায় বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছেন। শুধু দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সঙ্গে কায়সার কামালের সুসম্পর্ক থাকায় এ নিয়ে কেউ টু-শব্দও করতে পারছিলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই স্খলনের অভিযোগে তাকে শ্রীঘরে যেতেই হলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন যুগ্ম-মহাসচিব জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল, যে দল ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের একটি জনপ্রিয় দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা যখন দলীয় হাইকমান্ডের সঙ্গে সখ্যতার প্রভাব নিয়ে এ ধরনের অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান, তা অন্যদের জন্য লজ্জাজনক। আমি মনে করি, গোপনে কে কী করেছে না করেছে সেটা হয়তো আমাদের বিবেচ্য বিষয় না হতে পারে, কিন্তু নিজের সহকারীর স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে যখন রাস্তা-ঘাটে তাকে মারামারিতে জড়াতে হয়েছে, সে অবস্থায় পুলিশ তাকে আটক করেছে, ওইদিনই কায়সার কামালকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা উচিত ছিল। তাহলে জনগণের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়ে যেত। এখন দেখা যাক তারেক সাহেব কী করেন?’

বিএনপির নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের একজন নেত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সাধারণ একজন মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে মূত্রত্যাগ করলে মানুষের তা নিয়ে কিছু আসে যায় না। কিন্তু ধর্মীয় লেবাসের কেউ যদি করে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী, এসব সামাজিক পদ ব্যবহার করে তিনি যে নির্লজ্জ জঘন্য কাজ করেছেন, তাতে দলের নেতাদের মধ্যে ভীষণ অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। আমরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছি। না পারছি বলতে, না পারছি সহ্য করতে। বলতে পারেন, বুক ফাটছে তো মুখ ফাটছে না।’

কায়সার কামালের নৈতিক স্খলনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় দলের ইমেজ ক্ষুন্ন হয়েছে কি-না বা নেতারা বিব্রত কি-না জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক ১০ মিনিট পর এ প্রতিবেদককে কল করবেন বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন। এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।

ব্যারিস্টার কায়সার কামালের জেলা নেত্রকোনার সন্তান ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. খোরশেদ আলম মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করা উচিত হবে না। সিনিয়র নেতারা আছেন, তারা এ বিষয়ে বলতে পারবেন।’

বিএনপির নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে চারদিকে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তাতে ব্যারিস্টার কায়সার কামালের বিষয়টা সেই ষড়যন্ত্রের অংশ কি-না, সেটা আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলটির সহযোগী সংগঠন ‘নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম’র প্রধান সেলিমা রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মামলা কেন হলো, কী কারণে হয়েছে আমি সঠিক জানি না। আজ-কালতো মামলার কোনো কারণ লাগে না। সত্যি কথা বলতে কী, আমরা যারা বিএনপি করি বা দলের যে সিনিয়র নেতারা আছেন, তাদের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মামলা দেওয়া হয়। আমরা শুনেছি তাকে একটা মামলা দেওয়া হয়েছে, তিনি কারাগারে আছেন। এটা সঠিক কি বেঠিক আমি জানি না। সরকারতো যেকোনোভাবেই নিষ্পেষিত করছে বিএনপিকে। বিশেষ করে, তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের একজন আইনজীবী। সুতরাং তাকেতো হেনস্তা করার জন্য মামলা দিতেই পারে।’

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমি জানি না, কী মামলা। আমি প্রথম আপনার কাছে শুনলাম। আল্লাহর কসম জানি না। আমি হাসপাতালে ছিলাম, কেউ আমাকে কিছু বলেনি।’

কেএইচ/এইচএ/এমএস