আওয়ামী লীগ ও ভাসানীর প্রিয় ‘মজিবর’

সিরাজুজ্জামান
সিরাজুজ্জামান সিরাজুজ্জামান , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৫৯ এএম, ২৩ জুন ২০২১ | আপডেট: ০২:১৫ এএম, ২৩ জুন ২০২১
ভাষাশহীদদের স্মরণে ১৯৬৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শোকর‌্যালিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ/ ছবি: সংগৃহীত

অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনে ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। পরে ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। নাম রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। এই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগই আজকের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে।

সেসময় মওলানা ভাসানী তার ছত্রচ্ছায়ায় নিয়ে আসেন কতিপয় তরুণ ও ছাত্রকে। তাদের মধ্যে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের ভেতর দেখতে পেয়েছিলেন বারুদের মসলা। এজন্য তাকে নেতৃত্বের সামনের সারিতে নিয়ে আসেন তিনি। আওয়ামী মুসলিম লীগের সময়ই এ ঘটনা ঘটে।

দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট প্রয়াত এ বি এম মূসা তার ‘মুজিব ভাই’ গ্রন্থে মওলানা ও তার মজিবুর অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘...পাকিস্তান সৃষ্টিতে অবদান রেখে ভারত খণ্ডিত করে নতুন দেশের জন্ম দেয়ার বছর দুয়েকের মধ্যেই এতদসংশ্লিষ্ট মোহভঙ্গ ঘটে। সেদিন যখন নতুন দেশের জন্মের আনন্দ-আবেশে সবাই আচ্ছন্ন, মওলানা এগিয়ে এসেছিলেন জনগণকে বোঝাতে, কী অলীক ভিত্তির ওপর পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল! পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের সেই মোহ ভাঙতে অভূতপূর্ণ সাহস দেখিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী। কতিপয় অনুসারী নিয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। এর ছত্রচ্ছায়ায় নিয়ে আসেন কতিপয় তরুণ ও ছাত্রকে, যাদের মধ্যে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন বারুদের মসলা। তাদেরই শীর্ষে ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যাকে তিনি আদর করে ডাকতেন, মজিবর। কথায় কথায় বলতেন আমার মজিবর না থাকলে এটা হতো না, ওটা করতে পারতাম না।’

jagonews24

এ বি এম মূসা আরও লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের তৃতীয় কাতারের নেতা। ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর পর আতাউর রহমান, কফিল উদ্দিন চৌধুরী ও আবদুস সালাম খান প্রমুখ। তারপরই শেখ মুজিব ও তার সমসাময়িক তরুণের দল। কয়েক বছর পর সেই মজিবরকে তিনি সামনের কাতারে নিয়ে এসেছেন অন্য সবাইকে আড়াল করে। তার মধ্যেই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন ভবিষ্যতের দাবদাহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে।’

আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘...পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই বঙ্গবন্ধু হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন, এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। ওই উদ্দেশ্যে ’৪৮-এর জানুয়ারিতে ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ নামে সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ‘গণবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের স্থলে জনসম্পৃক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা’ করে গণমানুষের অসাম্প্রদায়িক দল গঠন। এই লক্ষ্য সামনে রেখে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার আগে ’৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মহান ভাষা আন্দোলন এবং মহত্তর মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়।’

jagonews24

তোফায়েল আহমেদ আরও লিখেছেন, ‘১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের উদ্যোগে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পূর্ব বাংলায় সফল ধর্মঘট পালিত হয়। সূচিত হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের। ’৪৯-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রাম সংগঠিত করার কারণে ১৯ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে কারারুদ্ধ ও পরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে শর্ত দেয়া হয়, যদি তিনি বন্ড দিতে সম্মত থাকেন, তা হলে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়া হবে। বঙ্গবন্ধু অন্যায় সিদ্ধান্তের কাছে নতি স্বীকার করেননি।’

সেই আওয়ামী লীগ এখন পরপর তিনবার ক্ষমতায়। দিন দিন অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে দলটি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর মাঝে বহু বছর স্বৈরশাসনে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয়ার তৎপরতা দেখা গেলেও ২০০৮ সালের পর জনগণ টানা তিন দফায় ক্ষমতায় বসিয়েছে এই দলকে। সেজন্যই যেন বিশিষ্ট লেখক ও চিন্তাবিদ আহমদ ছফা একটি দৈনিক পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি বরাবর বলেছি, আওয়ামী লীগ যখন জেতে তখন শেখ হাসিনা তথা কিছু মুষ্টিমেয় নেতা জেতেন, আর আওয়ামী লীগ যখন হারে গোটা বাংলাদেশ পরাজিত হয়।’

তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগার নই, কিন্তু আওয়ামী লীগের পলিটিক্যাল কনটেন্ট আউটলিব করার মতো কোনো পলিটিকস আমরা তৈরি করতে পারিনি। আওয়ামী লীগ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ভিন্নরকম রাজনীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা আমরা করেছি, করতে পারিনি।’

এইচএস/ইএ/এমআরএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]