ইসি নিয়োগে সার্চ কমিটি জনগণের সঙ্গে ‘ধোঁকাবাজি’: ফখরুল

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫৯ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২১

সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন প্রক্রিয়াকে ‘জনগণের সঙ্গে ধোকাবাজি’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ইসি নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, আমরা বারবার বলছি, সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের যে অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, সে অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এক নম্বর: একেবারেই তাদের (সরকার) নিজস্ব লোকজন দিয়ে, প্রাধান্য দিয়ে গঠন করা হয়। দুই নম্বর হচ্ছে, এটা জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি ছাড়া কিছু নয়। তখন তারা (আওয়ামী লীগের প্রতি ইঙ্গিত করে) বলবে, ইসি গঠন সার্চ কমিটি করেছে, আমরা তো করি নাই, আমরা তো দিই নাই।

ফখরুল বলেন, কিন্তু পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে, তারও আগের অভিজ্ঞতা থেকে, এটা সম্পূর্ণভাবে সরকার নিজের পছন্দমত লোকজন দিয়ে তৈরি করে এবং সেটাকে নির্বাচনে কাজে লাগায়।

আগেরবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা গতবার দেখলাম, ২০১৮ সালের নির্বাচনে হুদা (কেএম নূরুল হুদা) সাহেবের যে কমিশন সে কমিশন পুরোপুরিভাবে সরকারের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে আগ বাড়িয়ে তাদের সেই দলীয় ভূমিকা পালন করেছে, যেটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য না।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে একটি নিরপেক্ষ সরকার যদি না থাকে, তাহলে সে নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হয় না। এটা আমার কথা নয়, আগে নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত (সাখাওয়াত হোসেন) সাহেবরা যে নির্বাচন কমিশনে ছিলেন, তারা খুব সুস্পষ্ট করে বলেছেন, একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ সরকার সবচেয়ে জরুরি।

তিনি বলেন, সে দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি, আসলে ওটাই হচ্ছে প্রথম সংকট। নির্বাচন কমিশন খুব ভালো করলেন, একেবারে সমস্ত …, কিন্তু তারা কাজ করতে পারলো না। সরকার তাদের কাজে সহযোগিতা করলো না বা তাদের কাজ করতে দিলো না, তখন তো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।

বর্তমান কে এম নূরুল হুদা কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় এবারও আগেরবারের মতো একই পদ্ধতিতে ইসি নিয়োগ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের একদিন পরই মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপি মহাসচিব।

বিএনপিকে মানুষ কেন ভোট দেবে- প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ওনাদের (আওয়ামী লীগ সরকার) হাত থেকে বাঁচার জন্য জনগণ বিএনপিকে ভোট দেবে। ওনারা দেশের যে অবস্থা করেছেন, মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই, জীবিকার কোনো নিরাপত্তা নেই। চতুর্দিকে ভয়, ত্রাস আর সন্ত্রাস ছাড়া কিছু নেই- এতে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়াবে বলে আজকে চালের কেজি ৭০ টাকা। ৭০ টাকায় চাল খাওয়া সম্ভব নয় বলেই জনগণ বিএনপিকে ভোট দেবে। এ সরকার কৃষকদের বিনা পয়সায় সার দেবে বলেছিলো, সারের দাম এখন আকাশচুম্বী। মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে চায় এবং যাকে খুশি তাকে দিতে চায়, সেজন্যই বিএনপিকে ভোট দেবে। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার জন্য জনগণ বিএনপিকে ভোট দেবে। গত দুই বছরে সরকারের ব্যর্থতায় করোনাকালীন অর্থনৈতিক প্যাকেজ মানুষের হাতে পৌঁছায়নি। এ প্যাকেজ দিয়ে জনগণকে রক্ষা করা যেতো। সেটা হয়নি। বেশিরভাগ কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরগুলো পুঁজি হারিয়েছে, কর্মসংস্থান কমে গেছে। সরকার দেশকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখান থেকে মানুষ এখন মুক্তি চায়। মানুষ আওয়ামী লীগের হাত থেকে মুক্তি চায়, শেখ হাসিনার হাত থেকে মুক্তি চায়, এ অবৈধ সরকারের হাত থেকে মুক্তি চায়।

বিএনপির বিগত সরকারের সফলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি একমাত্র দল যারা জনগণকে কিছুটা শান্তি দিয়েছিলো। মাইক্রো ইকোনমিক্সকে স্টেবল পজিশনে নিয়ে এসেছিলো। সেজন্য জনগণ বিএনপিকে ভোট দেবে।

ফখরুল বলেন, সরকার বলছে, অনেক উন্নয়ন করেছে। যদি এত উন্নয়ন করে থাকে তাহলে তারা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে সাহস পায় না কেন? আজকে সংকট সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কেন তারা বসছেন না, কেন সমাধান করছেন না। সরকারকে বলব, এতো কথা বলেন, এতো দাম্ভিকতা দেখান, ভাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করে দেখেন। দেখেন, মানুষ কাকে ভোট দেয়।

বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, আজকে যতগুলো ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি আছে, এমনকি জাতিসংঘের কাছ থেকে এমনও কথা আসছে, তারা নির্বাচনে সহযোগিতা করতে রাজি, যদি বাংলাদেশ সরকার চায়। এরকম প্রশ্ন কেন আসছে? কারণ, বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি কারো আস্থা নেই। না জাতির না আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর।

সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই- সরকারের এ বক্তব্য খণ্ডন করে তিনি বলেন, সংবিধান কি বাইবেল যে এটা পরিবর্তন করা যাবে না। জনগণের প্রয়োজনে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। তারাও (আওয়ামী লীগ) তো পরিবর্তন চেয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়েছিলো, ১৭৩ দিন হরতাল করেছিলো। সেজন্যই কিন্তু দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেছিলেন।

তিনি বলেন, আজকে সরকার জেনে গেছে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তারা আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। সেজন্য দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনের বিধান রাখতে চায় তারা।

মির্জা ফখরুল বলেন, এদেশের মানুষ আন্দোলন করবেই। আন্দোলন হবেই। কারণ, দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন হবে, দেশের জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আগে আন্দোলন করেছে, এবারও করবে। আমাদের দাবি একটাই- আমরা কিচ্ছু চাই না, আমরা শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন একটা নিরপেক্ষ সরকার চাই।

বিএনপি কার নেতৃত্বে নির্বাচন করবে কিংবা বিজয়ী হলে সরকার গঠন করবে- আওয়ামী লীগের এ প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, নির্বাচনে আমাদের নেতা খালেদা জিয়া। আমাদের নেতা বেগম খালেদা জিয়া, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আমাদের দলের চেয়ারপারসন।

দণ্ডিত বেগম জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, উনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও নেতা থাকতে পারবেন না- এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা ছিলো, তিনি কারাগারে ছিলেন, তিনি কি নেতা ছিলেন না?

অতীতের মতো নির্বাচন জনগন মানবে না দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, অতীতের মতো নির্বাচন কোনো মতেই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আমরা পরিষ্কার বলছি, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না এবং ২০১৪ অথবা ২০১৮ সালের নির্বাচন নির্বাচন খেলায় জনগণ আর যাবে না। ২০১৪ সালে কী করেছে? ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করলো। কোনো বিরোধী দল নির্বাচনে যায়নি, শুধু জাতীয় পার্টি ছাড়া। সবাই নির্বাচন বর্জন করলো। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ভোটের বুথ দখল করে ভোট ডাকাতি করা হলো।

তিনি বলেন, শুনতে পাচ্ছি, এবারও (দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে) ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এটা হলে তো হয়েই গেলো, আর নির্বাচন দরকার নেই। ইভিএম দিয়েই তো তারা ভোট নিয়ে চলে যাবেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, সুতরাং তারা (সরকার) যদি সত্যিকার অর্থে একটা অর্থবহ নির্বাচন চায়, তবে প্রথমে দায়িত্ব হচ্ছে আমি করি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলা, আলোচনা করে সবার মতামত নেওয়া এবং সেই মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার গঠনে একমত হওয়া। তারপর ভালো নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য তাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কনসেনসাসে আসতে হবে। অন্যথায় এ নির্বাচনও সম্পূর্ণভাবে একটা প্রহসন হবে। ২০১৮ সালের নির্বাচন সম্পর্কে বিশ্বের যে জনমত, তাদের মতে এটা কোনো নির্বাচনই হয়নি। এমনকি গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস, ইকোনোমিস্টের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও তাদের খবরে সে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ছিলো না বলে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সঠিক নয়, মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন ছিলো। অবশ্যই ছিলো। ওই সময়ে সরকার ছিলো একটা অবৈধ সরকার। হাইকোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে তাদের দুই বছর বাড়িয়ে দিয়েছিলো। কোথাও প্রভিশন নাই, সংবিধানের কোথায় দুই বছর থাকার কথা নেই। আছে ৯০ দিন থাকার কথা।

তিনি বলেন, আমরা তখনও বলেছিলাম, এটা গণতন্ত্রের স্বার্থে দেশনেত্রী মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এটা মনে করার কোনো কারণ নেই, ওই সময়ে ফেয়ার ইলেকশন হয়েছিলো।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলের সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরের ঘটনা ক্যু-পাল্টা ক্যুতে বিভিন্নজনকে ফাঁসি দেওয়ায় জিয়াউর রহমানের বিচার হওয়া উচিৎ বলে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত যতগুলো হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সিরাজ শিকদার থেকে শুরু করে ৩০ হাজার নেতা-কর্মী, তাদের আত্মীয়-স্বজনরা আহাজারি করছেন।

তিনি বলেন, আর জিয়াউর রহমানের সময়ের বিষয়ে যে কথা উনারা বলছেন, সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান। সামরিক আইনে মার্শাল কোর্টে তাদের বিচার হয়েছিল। অভিযোগগুলো ছিল ৭ নভেম্বরের সময়ে এবং পরে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার অভিযোগ। আপনাদের নিশ্চয় মনে থাকার কথা সেগুলো। কোর্ট মার্শাল করে এর বিচার হয়েছিল। এখানে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল না, থাকতেই পারে না।

কেএইচ/এমকেআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]