‘২১ আগস্টের নৃশংসতা প্রতিহিংসার রাজনীতিকে উসকে দিয়েছে’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:১৬ পিএম, ২১ আগস্ট ২০২২

ভয়াবহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দেড় যুগ পেরিয়েছে। দিনের আলোয় কোনো বিরোধীদলীয় নেত্রীর জনসভায় এমন নৃশংসতা রাজনীতির ইতিহাসে বিরল ঘটনা। সন্ত্রাসীদের উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলায় সেদিন আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান। আহত হন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো না কোনোভাবে রক্তাক্ত। ২১ আগস্টের সেই ঘটনা রাজনীতির জন্য কী বার্তা দিলো, এর প্রভাব কী, প্রতিহিংসার রাজনীতি আরও উসকে দিলো কি না, তা নিয়ে কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

ড. শাহদীন মালিক তার মতামত জানিয়ে বলেন, ‘ওইদিন (২১ আগস্ট) আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়, তা ইতিহাসের জঘন্য ও নৃশংসতম অপরাধমূলক কাজ। তৎকালীন সরকার এই ঘটনার সঠিক তদন্ত না করে ‘জজ মিয়া’ নাটক এবং আলামত নষ্ট করে আরও বড় অন্যায় করেছে। এই ঘটনা আমাদের রাজনীতিতে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে এবং এটি অবশ্যম্ভাবী ছিল। শেষ পর্যন্ত এই ঘটনার বিচার হয়েছে, যদিও রায়ের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন।’

২১ আগস্টের ঘটনা রাজনৈতিকভাবেই স্মরণ রাখতে হবে উল্লেখ করে ড. মালিক বলেন, ২১ আগস্টের মতো নারকীয় ঘটনা প্রায় কম-বেশি সব দেশেই ঘটে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই ক্ষতগুলো দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও ঘটে থাকে। আমরা এই ঘটনাগুলো স্মরণ করতে পারি। অবশ্যই স্মরণ করবো। কিন্তু আমরা এমন নৃশংসতা কোনোভাবেই ধারণ করতে পারি না। এমন প্রতিহিংসা ধারণ করলে রাজনীতিতে সমাঝোতার পথ সারাজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

২১ আগস্টের নিষ্ঠুরতা আর এখনকার রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা আসলে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে চাই না। এমন ঘটনা থেকে একদিনে শিক্ষা নেওয়াও যায় না। এমন ঘটনা কেউ ভুলে যেতেও পারে না।’
‘সংকট উত্তরণের পথ অবশ্যই মন্থর হবে। কিন্তু আমাদের নজর দেওয়ার কথা ছিল। স্মরণ করার মধ্য থেকেই সংকট উত্তরণের পথ বের করা সম্ভব। বছরের পর বছর ধরে ধারণ করতে থাকলে এমন ঘটনার আরও জন্ম দেবে। প্রতিহিংসা থেকেই তো এমন ঘটনা ঘটে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমরা এই প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বের হতে পারছি না। বের হওয়ার চেষ্টাও করছি না।’

‘২১ আগস্টের ঘটনা আমাদের বারবার মনে হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিহিংসা থেকে বের হওয়াও তো জরুরি। মানুষ আসলে কোনো প্রকার সহিংসতা চায় না। এই বিশ্বাস সমাজে প্রতিষ্ঠা করা সবার দায়। এই দায় উপলব্দি করতে পারি না বলেই আমরা এগিয়ে যেতে পারি না।’ বলেন ড. শাহদীন মালিক।

২১ আগস্টে নৃশংসতা এবং রাজনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে প্রায় একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেন ড. বদিউল আলম মজুমদারও। তিনি বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং তৎকালীন সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। আমরা দেখেছি, ওই সময় ঘটনা ধামাচাপা দিতে সরকার ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজায়। আলামত নষ্ট করে। সঠিক তদন্ত না করে অপরাধীদের বাঁচাতে সরকার পক্ষ নানা কৌশল অবলম্বন করে। ২১ আগস্টের ঘটনা ছিল বিরোধী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি।’
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘২১ আগস্টের নৃশংসতা প্রতিহিংসার রাজনীতিকে উসকে দিয়েছে। আমরা আসলে রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে সুখী নই। নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি এখনো বিরাজমান। আমরা ভিন্ন কোনো মতকে মানতে পারি না। সব পথ-মত রুদ্ধ করে দিচ্ছি যে যার জায়গা থেকেই। আজকের এই পরিস্থিতির জন্য ২১ আগস্টের ওই ঘটনাও দায়ী। সহনশীলতার পথ সংকুচিত করেছে সেই নিষ্ঠুরতা।’

তিনি বলেন, ‘এই ঘটনাগুলোর বিচার-সাজা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। নিরপেক্ষ জায়গা থেকে সঠিক বিচার ও সাজা দিতে পারলে বারবার এমন হত্যাকাণ্ড দেখতে হয় না।’

রাজনীতি হচ্ছে সমাঝোতা ও আলোচনার প্রক্রিয়া। যারা রাজনীতি করেন তারা সমাজের উঁচু স্তরের মানুষ। তাদের প্রতি মানুষ চেয়ে থাকে। সমাজের অসঙ্গতি, হিংসা দূরীকরণে তারা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। কিন্তু এখন আর তা দেখতে পাবেন না। কে কত বড় হিংসা ছড়াতে পারে, সেই বড় নেতা। প্রতিহিংসা বা নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি আসলে কোনো সমাধান দিতে পারে না। বরং সমস্যা আরও তৈরি করে। চলমান রাজনীতি নিয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার কিছু নেই। আমরা একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। ভয় ঠিক এখানেই।

এএসএস/এএসএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।