আতঙ্কের মধ্যেও আশ্বস্ত করলো আওয়ামী লীগ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৪০ পিএম, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড়/ছবি: সংগৃহীত

দিনভর আতঙ্ক ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে। কী হচ্ছে, কী হবে? বিএনপি সমাবেশ করতে পারবে কি না, অনুমতি পাবে কি না? আওয়ামী লীগের ভূমিকা কী হবে? এমন সব প্রশ্ন আর জল্পনা-কল্পনার অবসান করে বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে অভয়ও দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা রাজধানীতে এক সমাবেশে বলেছেন, আমরা চলে যাচ্ছি সাভারে। বিএনপিকে দিয়ে গেলাম ঢাকা। ঢাকাবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে তারা সতর্ক পাহারা বসাবেন বলেও জানিয়েছেন।

রাজধানীর গুলিস্তান নাট্যমঞ্চে পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফীর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

jagonews24

বক্তব্য দেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, মির্জা আজম, আফজাল হোসেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ প্রমুখ।

বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে এ সমাবেশ করা হলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বিশাল জনসভায় রূপ নেয়। নাট্যমঞ্চ প্রাঙ্গণ ছাপিয়ে জনসমাগম ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। দলের একাধিক নেতা বলছেন, সমাবেশে লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছে। নবাবপুর থেকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেইট পর্যন্ত চলে গেছে উপস্থিতির একাংশ।

শনিবার (১০ ডিসেম্বর) বিএনপির সমাবেশকে চেক দেওয়ার এ কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তারা (বিএনপি) থাকবে গোলাপবাগে। আমরা চলে যাচ্ছি সাভারে। জনগণের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তাদের ঢাকা দিয়ে গেলাম। আমরা ক্ষমতায়। আমরা কেন অশান্তি চাইবো? আমরা কেন বিশৃঙ্খলা চাইবো?’

আন্দোলনে বিএনপির অর্ধেক পরাজয়
সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘বিএনপি আজ বলে- সরকার নাকি ভয় পেয়ে গেছে। সরকার ভয় পেয়েছে? যারা বলেছিল- নয়াপল্টনে সমাবেশ করবোই। আজ তারা গোলাপবাগে। তাহলে পরাজয় কার হলো? আমাদের না বিএনপির? আন্দোলনে বিএনপির অর্ধেক পরাজয় ওখানেই হয়ে গেছে।’

দুর্নীতি ও লুটপাট এবং হাওয়া ভবনের বিরুদ্ধে ‘খেলা হবে’ বলে ফের ঘোষণা দিয়েছেন কাদের। তিনি বলেন, ‘সবাইকে প্রস্তত থাকতে হবে। সতর্ক পাহারায় থাকতে হবে। কাতারের পাশাপাশি বাংলাদেশেও অপশক্তির বিরুদ্ধে খেলা হবে। লাঠি বা আগুন নিয়ে আসলে খেলা হবে। অনেক ছাড় দিয়েছি, আর ছেড়ে দেবো না।’

বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার মিশনে নেমেছে কিছু মিডিয়া
সমাবেশ থেকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সাংবাদিক বন্ধুরা সত্যটা তুলে ধরুন। কিছু কিছু মিডিয়া বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার জন্য উঠেপড়ে নেমেছে। তারা কারা, সময় মতো জবাব পাবেন। কোনো কোনো মিডিয়া, রাতে ও সকালে দেখলে মনে হয় না এখানে (বাংলাদেশ) আর কোনো রাজনৈতিক দল আছে। বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল আছে?’

মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সতর্ক করলেন দুই মন্ত্রী
কূটনৈতিকদের উদ্দেশে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি যারা আমাদের দেশে আছেন। বন্ধু দেশের প্রতিনিধিরা কারও পক্ষ নেবেন না। আমাদের ঘরের ভেতরে হস্তক্ষেপ করবেন না। আমরা জানি, কীভাবে গণতন্ত্র রক্ষা করতে হয়। আমি বলেছিলাম, মেঘ চলে যাবে, সমাধানও হয়ে যাবে, হয়নি? হয়েছে..। বাঙলা কলেজ হয়ে অবশেষে গোলাপবাগ। তাদের (বিএনপি) শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে।’

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘কানাডার আদালত বলেছে, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল। বিএনপির কোনো সদস্যকে কানাডায় আশ্রয় দিতে পারি না। গতকাল সেই সন্ত্রাসীদের বিষয়ে একজন রাষ্ট্রদূত বিবৃতি দিয়েছেন। আমি জিজ্ঞাসা করি রাষ্ট্রদূতকে, কোন কূটনৈতিক আচার-আচরণে, রীতি-নীতিতে আপনারা একটি দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিবৃতি দিলেন? এটি আপনারা দিতে পারেন না। এ ধরনের বিবৃতি ভবিষ্যতে দেবেন না।’

বিএনপি পাগল হয়ে গেছে
সমাবেশে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শাজাহান খান বলেন, ‘বিএনপি নেতারা ক্ষমতা হারিয়ে পাগল হয়ে গেছে। পাগলের মতো কথা বলে। তারা বলেন, আওয়ামী লীগকে নাকি টেনে নামিয়ে ফেলবেন। আওয়ামী লীগের শেকড় মানুষে হৃদয়ে, টেনে উপড়ে ফেলা যায় না। তারা নাকি আবার মুক্তিযুদ্ধ করবেন, কাদের নিয়ে করবেন? আমরা মুক্তিযোদ্ধারা প্রস্তুত আছি, আপনাদের প্রতিহত করতে। তারা বলে- খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ও তারেক নাকি শিশু মুক্তিযোদ্ধা। উন্মাদের মতো যারা কথা বলে, তারা কী দেশ চালাতে পারে?’

ঢাকাবাসীর আতঙ্কের কিছু নেই, আমরা আছি: নানক

ঢাকাবাসীকে অভয় দিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি বলেছেন, ‘প্রিয় ঢাকাবাসী, আতঙ্কের কারণ নেই। আপনাদের সঙ্গে আমরা আছি।’

তিনি বলেন, ‘ওরা (বিএনপি) যদি কোনো জায়গায় হাত দেয়, সেই হাত ভেঙে দিতে হবে, গুড়িয়ে দিতে হবে। ফজরের নামাজ পড়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাহারা দিতে হবে। কোথাও যেন ওরা উচ্চবাচ্য করতে না পারে।’

জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘আ স ম আব্দুর রব, জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মান্না, নূরও বিএনপির সঙ্গে মিলেছে। তারা একদলের এক নেতা। তাদের বিষয়ে আপনাদের সজাগ থাকতে হবে। ওদের একটা মাইর পেন্ডিং আছে। বাড়াবাড়ি করলে সেই মাইর শুরু হয়ে যাবে।’

‘সময় আছে, সোজা পথে আসেন’
বিএনপিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ‘এখনো সময় আছে, সোজা পথে আসেন। আঙুল বাঁকা করতে হলে আপনাদের পাকিস্তানে চলে যেতে হবে বা কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারে পাঠানো হবে।’

তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য এদেশে হাজার হাজার মায়ের সন্তান জীবন দিয়েছেন। প্রয়োজন হলে নতুন দেলোয়ার-সেলিমরা রক্ত দেবেন। অন্য রাজনৈতিক শক্তির জায়গা এদেশে হতে দেবো না।

আবদুর রহমান আরও বলেন, ‘একটা রাজনৈতিক অশুভ শক্তি ভিন্ন ভিন্ন কথা বলে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যেতে চায়। একবার বলে শেখ হাসিনার পতন ছাড়া দাবি নাই, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না, তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন চায়। ওদের মধ্যে একটা রাজনৈতিক সংকট আছে। তাদের খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান নির্বাচন করতে পারবেন না, এজন্য তারা দলকে নির্বাচনমুখী করবে না। ওরা চায়, অন্ধকার গলিপথ দিয়ে একটা অশুভ শক্তি ক্ষমতায় আসুক, তাদের দণ্ড মওকুফ হোক। তারপর তারা নির্বাচনে যাবে।’

‘যেখানে যাকে পাইবো মুড়াইয়া ঠিক কইরা হালামু’
বিএনপির সমাবেশের দিন শনিবার (১০ ডিসেম্বর) আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা রাজপথে থাকবেন বলে জানিয়েছেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।

তিনি বলেন, ‘কালকে রাজপথে থাকবো আমরা। আজকে যারা হুঙ্কার দেয়, শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়া করবে, সরকারের পতন করে ফেলবে। আজকে ৯ তারিখ, কাল ১০। এদিন আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নেতাকর্মী যেন রাস্তায় না থাকে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় পাহারা দিতে হবে। কাল যে রাস্তায় নামবে, আর সন্ত্রাস করবে, যেখানে যাকে পাইবো মুড়াইয়া ঠিক কইরা হালামু।’

‘দেশি-বিদেশি চক্র সক্রিয়, প্রয়োজন প্রতিরোধের’
দলের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাদেশের অর্জনকে নস্যাৎ করার জন্য যেমনি বিএনপি আগুন সন্ত্রাস করতে চায়, নির্বাচন বানচাল করতে চায়। তেমনি আন্তর্জাতিক চক্রও বাংলাদেশের অর্জন নষ্ট করতে আমাদের বিরুদ্ধে নেমেছে। আমরা সেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবো, এটাই আমাদের শপথ।’

‘বিশৃঙ্খলা করলেই কঠোর শাস্তি’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘বিএনপি বুধবার নয়াপল্টনে পুলিশের ওপর হামলা করে আবার প্রমাণ করেছে, তারা সন্ত্রাসী দল। দেশের আইন মানে না, শান্তিতে বিশ্বাস করে না। তাদের নেত্রী সাজাপ্রাপ্ত আসামি নাকি আসবেন সমাবেশে। পলাতক তারেক রহমানও নাকি বীরের বেশে ফিরে আসবেন। কেন রে ভাই? দেশে সরকার আছে, আইন আছে, সংবিধান আছে। আপনারা যা খুশি বলবেন, তাই হবে?’

তিনি বলেন, ‘তারা জোসে হুশ হারিয়ে ফেলছেন। এভাবে হুশ হারালে শিশুবক্তা রফিকুল ইসলাম মাদানী মতো পরিণতি হবে, হয়েছেও। এখনই অনেকে হাত-পা ধরা শুরু করেছে। স্পষ্ট বলতে চাই, এ দেশ চলবে শেখ হাসিনা নেতৃত্বে। বিশৃঙ্খলা করলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।’

‘যে লাঠি দিয়ে আঘাত করবে, সেটি দিয়েই কুপোকাত করা হবে’
দলের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা আবারও নৈরাজ্য শুরু করেছে। তাদের প্রতিবাদ নয়, প্রতিহত করতে হবে। যে লাঠি দিয়ে আঘাত করবে, সেটি দিয়েই তাদের কুপোকাত করতে হবে। যেই হাতে আগুন দিতে আসবে, সেই হাত পুড়িয়ে দিতে হবে। প্রমাণ করতে হবে এ বাংলাদেশ শেখ মুজিবের আদর্শের সন্তানদের বাংলাদেশ।’

তিনি বলেন, ‘যারা আমাদের বলেছেন, পালাবার পথ খুঁজে পাবেন না। যারা সন্ত্রাসীদের ভাষায় কথা বলেন। যারা সংবিধানকে পদদলিত করেছে। সেই বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশে আবার নৈরাজ্য শুরু করেছে। তাদের প্রতিবাদ নয়, প্রতিহত করতে হবে।’

সবশেষ সভাপতির বক্তব্যে আবু আহমেদ মন্নাফী বলেন, ‘কালকে আমরা পার্টি অফিসে থাকবো। সবাই নিজ নিজ পাড়া-মহল্লায় সতর্ক পাহারায় থাকবেন।’

সাভারে আওয়ামী লীগের সমাবেশ শনিবার
এদিকে, শনিবার (১০ ডিসেম্বর) ঢাকার সাভারের রেডিও কলোনী মাঠে সমাবেশ করবে আওয়ামী লীগ। সাভার উপজেলা, ধামরাই উপজেলা, সাভার পৌরসভা ও আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগ এ সমাবেশের আয়োজন করেছে।

সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করবেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কামরুল ইসলাম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজীর আহমদ, সাধারণ সম্পাদক পনিরুজ্জামান তরুন।

এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিসেস হাসিনা দৌলা।

এসইউজে/এএএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।