হৃদয়ে যার বসবাস

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:২৯ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মিষ্টির প্যাকেটটা ফ্রিজে রেখে রুম থেকে বের হলাম। নিচে নেমে দেখি বাসা সংলগ্ন চায়ের দোকানের একজন পাগল টাইপের লোক শুকনো রুটি চিবোচ্ছে। তার পোশাক দেখে মনে হয় না, সে রুটি কিনেছে। হয়তো কোনো দয়ালু ব্যক্তি তাকে দেখে দয়াপরবশ হয়ে একটি রুটি খেতে দিয়েছে। তার চোখ দুটি উজ্জ্বল, চেহারায় আভিজাত্যের ভাব। এই লোক পাগল হয় কেমনে! তার পরনে ছেড়া প্যান্ট আর ময়লা জামা। তার একহাতে রুটি অন্য হাতে মাথা চুলকাচ্ছে। তার চোখে চোখ পড়তেই আমার মায়া হলো। তাকে চায়ের জন্য প্রস্তাব দিতেই রাজি হয়ে গেল।

আনমনে কি যেন ভাবছি। এই মানুষটা এমন হওয়ার কারণ কি? নিশ্চয় সে জন্ম থেকে পাগল নয়। কিংবা সে পাগলের বেশ ধরেছে। তার প্রতি কৌতূহলী হলাম।

এরই মধ্যে ছোট শিশুরা পাগলকে ঘিরে উৎসুকভাবে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। কেউবা তার প্রতি পাথর ছুড়ে মারছে। শিশুদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে পাগল দেখার মতো আনন্দদায়ক পৃথিবীতে বুঝি কিছুই নেই। আমি শিশুদের সরিয়ে তাকে পাশে বসালাম।

আসলে মানবজাতি অস্বাভাবিক কিছু দেখতে অভ্যস্ত নয়। তাই হঠাৎ সুস্থ মানুষদের মাঝে একজন ছেড়া পোশাক পরিধানকারী অস্বাভাবিক মানুষকে দেখে উৎসুকভাবে তাকিয়ে আছে। মানবজাতি সেই শুরু থেকে মানসিক অসুস্থ লোকদের সমাজ থেকে আলাদা করে রাখে। সুস্থ মানুষদের মাঝে মানসিক অসুস্থ লোকদের স্থান নেই। এই আধুনিক যুগেও মানসিক অসুস্থদের সমাজে স্থান নেই৷ তাই মানসিক অসুস্থদের পাবনা কিংবা বিভিন্ন মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

দোকানদার বলে উঠল, ভাই এদের থেকে সাবধান থাকবেন। এরা পাগল না পাগলের বেশ ধরেছে। আমার মনে হয় ভারতের গুপ্তচর। শুনেছি অনেক ভারতীয় পাগল বেশে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। এদের প্রশ্রয় দিবেন না। আমি তার কথা গুরুত্ব দিলাম না। দোকানদারের কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য আমি লোকটিকে সূক্ষ্মভাবে নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, পাগল হোক আর যাই হোক আমি তার কথা শুনব।

এই ব্যাটা নিশ্চয় গোয়েন্দা টাইপের কেউ। আমি বাসায় যেতে প্রস্তাব দিতেই সে এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল। মনে হলো আমার সাথে যাবার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল।

বাসায় এসে তাকে চেয়ারে বসতে দিয়ে আমি তার সামনে বসলাম। তার নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল, তার নাম লিয়ন। কিছুক্ষণ লিয়নের সাথে আলাপ করে বুঝতে পারলাম সে পুরোপুরি পাগল নয়। তবে আর কিছুদিন এভাবে থাকবে নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যাবে।

তার এই অবস্থায় কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে আমার কাছে সিগারেট চেয়ে নিয়ে আগুন ধরিয়ে মুখ ভর্তি ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, এ এক করুণ কাহিনি। আমার ভালবাসার কাহিনি। মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিলাম কুলখানি অনুষ্ঠানে, যেখানে সবাই শোক ভুলে খাবারে নিমগ্ন ছিল। হঠাৎ তার দিকে দৃষ্টি পড়ে আমার, এযেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কোন সৈনিকের অনুপ্রেরণাকারী নারী কিংবা কোন উপন্যাস কবিতার লেখকের কাল্পনিক নায়িকা।

আমার সমস্ত অনুভূতি দিয়ে তাকে দেখছিলাম তার আঁখি, নাসিকা ওষ্ঠ যেন কোন চিত্রশিল্পীর তুলির ছোঁয়া। চারপাশে ভালো-লাগার স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছিলো। একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলাম, সেও আড়চোখে আমাকে দেখছে আমার চোখে চোখ পড়তে আমি বিদ্যুৎস্পটের ন্যায় ছিটকে পড়লাম।

তার উপস্থিতিতে চারপাশের লোকগুলোকে অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। চাঁদের উপস্থিতিতে নক্ষত্ররাজির যেমনটা হয়। খাবার শেষে সে প্যান্ডেল থেকে বের হয়; আমিও তার পিছু নেই, আমি অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব ভুলে তাকে অনুসরণ করতে থাকি মনে হয় এই রূপবতী রমনী ছাড়া আমার জীবনে আর কিছুই নেই।

এরপর সে একটি বাড়ির ভেতর প্রবেশ কর, আমি হতাশা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেই। সেদিনটা আমার ঘোরের মধ্যে কেটে যায়।

রাতে ঘুম হয় না। আধোঘুম আধো জাগরণের মাঝে কাটিয়ে দেই। সেদিন মনে হয়েছিল ঘুম ও জাগরণের মাঝেও আরেকটি জগত আছে। সে জগত বিষাদময়।

এরপর তার অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। অদূর থেকে যখন তার আগমন টের পেতাম তখন শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হতো। সে যখন সামনে দিয়ে ছুটে যেতো তখন একধরনের ভালোলাগায় ঢুকে যেতাম। আমি যতক্ষণ ওর অস্তিত্ব টের পেতাম ততক্ষণ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তার চলে যাওয়া মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখতাম। যখন সে দৃষ্টির আড়াল হতো তখন একরাশ বেদনা সঙ্গী করে রুমে ফিরতাম।

সারাটা দিন তাকে দেখার সুখ স্মৃতি নিয়ে কাটিয়ে দিতাম। বিকেলে আবারো তাকে দেখার অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়াতাম।

সে তখন ক্লান্ত হয়ে রিকশার এককোনে বসে থাকত। তখন তার এই মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে ব্যথিত হতাম। তবুও তাকে দেখেও কিছু বলতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে বাসায় ফিরতাম।

এভাবে কেটে যায় বছর খানেক এরপর প্রেমিক হিসেবে আমার প্রমোশন হয়। হাতে ফুল নিয়ে তার বাসার আশপাশে ঘুরঘুর করি। তাকে বলার জন্য কথামালা সাজাই। বাগানের তাজা ফুল কথামালা কিছুই করা হয় না। হাতের ফুল হাতেই থাকে মনের কথামালা মনেই থাকে।

ফুলগুলোর স্থান হয় ডায়েরির পাতায়। কথাগুলোও হয়ে যায় অতীত। নিত্যদিন নতুন কথার মালা সাজাই।

এরপর প্রতিদিন কথামালা সাজিয়ে সদ্য ফোটা গোলাপ নিয়ে ছুটি তার পিছু মনে কথা তাকে বলা হয় না, ফুল তার হাতে,
দেবার সাহস হয় না। তীব্র আর্তনাদ নিয়ে বাসায় ফিরতাম। সিগারেটে ধোয়ায় ব্যর্থতা ঢেকে রাখি সারারাত জেগে রই বিছানায় এপাশ-ওপাশ করি কল্পনার ফুল দেই মনের কথা বলি।

অবশেষে বুকে সাহস সঞ্চয় করে তার সামনে যেদিন তার সামনে দাঁড়ালাম, ততদিনে আমার হাতের গোলাপ শুকিয়ে গেছে কথামালা এলোমেলো হয়ে গেছে।

সেদিন তাকে আমার মনে কথা জানাতেই সে বলেছিল, আমাকে তার পক্ষে ভালোবাসা সম্ভব নয়। আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ে ঠিক না হলে আমাকে ভালবাসত। সেদিন খুব হতাশা নিয়ে বাসায় ফিরে আসি। এরপর আর তার সামনে যাইনি। এরই মধ্যে তার বিয়ে হয়। শুনেছি সে বিয়ে করে সুখেই আছে। ভেবেছিলাম জীবনে আর কোনদিন তার সামনে যাব না। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে তাকে একনজর দেখার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। তাই তাকে একনজর দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠি।

তাকে একনজর দেখার জন্যই পাগলের বেশে রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। কিন্তু তার দেখা পাচ্ছি না।

আমি তার কথা শুনে মুখটা মলিন করে বললাম, যে আপনাকে ভালবাসে না আপনি তারজন্য এত ত্যাগ কেন করছেন? আর তাকে দেখেই বা কি লাভ! এমন তো না যে সে আপনাকে ভালবাসবে?

‘ভালবাসার আপনি কি বোঝেন? আপনি কি কখনো কাউকে ভালবেসেছেন?’

‘না৷ সে সুযোগ হয়নি। কাউকে ভালবাসার আগেই মা-বাবা আমার বিয়ে দেন। তবে আমি বউকে অনেক ভালবাসি৷।
টের পেলাম আমি সত্যিই রেহেনাকে খুব ভালবাসি। আমি যে তাকে ভালবাসি সেটাই আমার স্বার্থকতা কিন্তু সে আমাকে ভালবাসে না এটা তার ব্যর্থতা। আমাকে ভালবাসলে এভাবে সে ঘর যেতে পারত না৷

আগের পর্ব পড়ুন

চলবে…

ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর থেকে/এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]