লাইক কমেন্টের আশায় আবুল এখন এঞ্জেলা

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৩৪ পিএম, ০৪ অক্টোবর ২০১৯

আবুল হাতের মোবাইলটা একবার মাথার উপর তুলছে আবার নিচে নামাচ্ছে। সে খুব চিন্তিত। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রিমন দাঁড়িয়ে আবুলের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে হেসে উঠল। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে সে আবুলের পাশে এসে দাঁড়ালো। আবুল তাকে দেখেই বলে উঠল,‘ভাই আমি মনে মনে আপনাকেই খুঁজছি।’ রিমন দুই ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে মনে মনে খুঁজছো আর আমি এসে হাজির, আচ্ছা আমাকে কেন খুঁজছো তা না হয় পরেই জানব। আগে বলো তুমি মোবাইল এভাবে উপরে একবার নিচে একবার নামাচ্ছিলে কেন?

আবুল চোখে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল, আর বইলেন না ভাই। আবুল মিয়া নামে ফেসবুক আইডি খুলছি। কোনো ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে না। কেউ আমার ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে না। দেখেন (মোবাইল দেখিয়ে) আমার পোস্টে কোনো লাইক, কমেন্ট পড়ে না। অথচ আমার গার্লফ্রন্ডের যে কোনো পোস্টে হাজার হাজার লাইক, কমেন্ট পড়ছে।

কথাগুলো একদমে বলে আবুল রিমনের দিকে তাকিয়ে রইল। রিমন তার কথা শুনে হাসি থামিয়ে রাখতে পারল না। পরক্ষণে হাসি থামিয়ে চিন্তিত হবার ভান করে গালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে রিমন বলল, ‘পেয়েছি মেয়েরা ফেসবুকে নামের আগে এঞ্জেলা, রাজকন্যা, অপ্সরী লিখে বলেই ওদের এত ফ্রেন্ড আর ফলোয়ার। আর তারা কিছু পোস্ট দিলেই লাইক, কমেন্টে ভরে যায়। তুমি এক কাজ করো, তোমার নামের আগে কিছু অ্যাড করো।’

আবুল বলল, ‘ভাই এঞ্জেলা আর অপন্সীর পুংলিঙ্গ কি? রিমন আবুলের কাঁধে হাত দিয়ে বলল, তোমার এঞ্জেলা আর অপ্সরীর পুংলিঙ্গ দেওয়া লাগবে না। তুমি তোমার নামের আগে এঞ্জেলা আবুল লেখ তাহলে হবে। তারপর দেখ কত ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে। আর তোমার পোস্ট লাইক, কমেন্টে ভরে উঠবে।

আবুল নিজের নাম পরিবর্তন করে এখন এঞ্জেলা আবুল হয়ে গর্বে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরছে। তাকে হাসতে দেখে আকরাম এগিয়ে এসে বলল, ‘কিরে আবুল্যা এত খুশি খুশি কেন? আবুল রাগান্বিত হয়ে জবাব দিলো,’ এই মিয়া কারে আবুল্যা কও, আমার নাম আবুল্যা না। এখন থেকে আমার নাম এঞ্জেলা আবুল।’

আকরাম চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে অবাক হবার ভান করে হাসতে হাসতে বলল, তুই যদি এঞ্জেলা হস, তাহলে এঞ্জেলার কি হবে।’ আবুল কথা না বাড়িয়ে গোফে হাত বুলাতে বুলাতে বুক সোজা করে বীরদর্পে হেটে চলে গেল। পেছন থেকে আকরাম বলল, হায়রে ফেসবুক তুমি আবুল্যার মত পোলারেও দিয়েছো এঞ্জেলার সম্মান। আর কাজের মেয়েকে দিয়েছো অপ্সরী, নীলাঞ্জনা, চাঁদের বুড়ির মতো সম্মান।

রিমন বাসায় এসে এঞ্জেলা আবুলের কাণ্ডকারখানা দেখে হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে আবুল ফেসবুকে কালো চশমা পরে ছবি আপলোড দিয়ে লিখেছে, ‘কেউ লাইক কমেন্ট না করে যাবেন না।’ রিমন হা হা রিএ্যাক্ট দিতেই আবুল মোবাইলে কল দেয়। অনেকক্ষণ পর রিমন ঘুমানোর ভান করে জড়ানো কণ্ঠে জবাব দেয়, হ্যালো। আবুল উত্তেজিত হয়ে জবাব দেয়, ‘ভাই আপনি আমার ছবিতে হাহা রিএ্যাক্ট দিছেন কেন? রিমন হাই তুলে জবাব দেয় এখন ঘুমাচ্ছি যা বলার আগামীকাল সকালে বলিস। আর কিছু না বলে রিমন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে হাহা করে একাকি হাসতে থাকে।

পরের দিন সকালে মোবাইলটা হাতে নিয়ে রিমন আতৎকে উঠে, তার ম্যাসেঞ্জারে শত শত ম্যাসেজ, আর ফেসবুক নোটিফিকেশনে প্রায় দুইশ নোটিফিকেশন দেখাচ্ছে। সে প্রথমে ম্যাসেঞ্জার অন করেই আতৎকে উঠে। আবুল তাকে একশ ভিডিও পাঠিয়েছে। অনেকগুলো ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। ফেসবুক নোটিফিকেশনে গিয়ে দেখে আবুল তার সব পোস্টে হাহা রিএ্যাক্ট দিয়ে বসে আছে। সে উত্তেজিত হয়ে আবুলকে কল দিয়ে বলে ছোট ভাই তুমি কই? এক্ষুনি বাহিরে আস কথা আছে।

আবুল আর রিমন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কারো মুখে কোনো কথা নেই। নীরবতা ভেঙ্গে রিমনই আগে বলল, তুমি আমাকে এত ভিডিও পাঠিয়েছো কেন?
-ভিডিওগুলো শিক্ষণীয় তাই পাঠিয়েছি।
-তুমি কি মনে কর আমি এই ভিডিও এখনো দেখি নাই?
-দেখলে দেখছেন, এখন আবার দেখবেন।
-আচ্ছা আবার যে ম্যাসেজ পাঠিয়েছো, যদি মুসলিম হলে ম্যাসেজগুলো কমপক্ষে বিশজন বন্ধুকে ফরোয়ার্ড কর, এর মানে কি? তাছাড়া অনেকগুলো অন্যান্য ম্যাসেজও পাঠিয়েছো
-এগুলো পাঠালে নেকী হবে, তাই পাঠিয়েছি। আপনিও পাঠিয়ে নেকী কামান।

আবুলের কথা শুনে রিমন উত্তেজিত হয়ে বলল, হারামি তোরে কে হইছে ফেসবুকে নেকী পাওয়া যায়? নেকী পেতে চাইলে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়। তুমি নামাজ বাদ দিয়ে কি করে শুধু ম্যাসেজ পাঠিয়ে নেকী পেতে চাও?

আবুল হাত দুটি কচলাতে কচলাতে মাথা নিচু করে বলল, ভাই আমি মুর্খ মানুষ। কিছু শিক্ষিত লোক আমাকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে বলেছে। ম্যাসেজ ফরোয়ার্ড করে অশেষ নেকী হাসিল করুন তাই আমি নেকী হাসিল করার জন্য।

আবুলকে কথা শেষ করতে দিল না রিমন। সে আবারো উত্তেজিত হয়ে বলল, ওরা শিক্ষিত হয়ে মুর্খের চেয়ে অধম। ফেসবুকে কাউকে কিছু পাঠানোর আগে চিন্তা করবে তারপর পাঠাবে। আচ্ছা বল, তুমি আমার সব পোস্টে হাহা রিএ্যাক্ট দিয়েছো কেন? আবুল নিজের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, আপনিই তো গতকাল আমার ছবিতে হাহা রিএ্যাক্ট দিয়েছেন। তাই ভাবছি হাহা রিএ্যাক্ট বুঝি আপনার খুব পছন্দ তাই আমিও আপনার সব পোস্টে হাহা রিএ্যাক্ট দিয়েছি।

রিমন হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারল না। সে নিজেকে সংযত করে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে বলল, তুমি জানো আমার পোস্টে অনেক দুঃখজনক পোস্টও আছে। যেমন আমার মায়ের মৃত্যুর সংবাদ। কেউ মারা গেলে কি হাহা করা যায়?

আবুল ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল, তওবা তওবা না ভাই তা তো দেওয়া যায় না। আসলে না পড়ে সব পোস্টে গণহারে হা হা রিএ্যাক্ট দিয়েছি। রিমন কিছুক্ষণ চুপ করে নিজের রাগ কমিয়ে বলল, তোমার মত মুর্খরাই ফেসবুকের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছে। কোনোকিছু না বুঝে কমেন্ট বা লাইক দেওয়া দেওয়া ঠিক না।

যাও তুমি ফেসবুক ডিএকটিভ করে দাও। আবুল মোবাইলটা রিমনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, দেখুন ভাই নাম চেঞ্জ করার পর শতশত ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এসেছে। কিন্তু আমি কাউকে অ্যাড করতে পারছি না কেন? রিমন মোবাইলটা হাতে নিয়ে বলল, আরে গাধা এগুলো ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট না এগুলো ফ্রেন্ড সাজেশন তুই ইচ্ছে করলে এদের ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাতে পারবি।

রিমনের কথা শুনে আবুল লজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এমন সময় আকরাম এসে বলল, রিমন ভাই ফারিয়াকে দেখে এসেছি। আবুলের সামনে ফারিয়ার কথা বলায় রিমন লজ্জিত হয়ে ঈশারা করল পরে বলিস, কিন্তু আকরাম ঈশারা না বুঝে বলতে লাগল, ‘ভাই ফারিয়া হলো হামিদ মিয়ার কাজের মেয়ে জরিনা।’

জরিনা নামটি শুনে আবুল, রিমন থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রিমন লজ্জিত হয়ে বলল, বলিস কি আমি এতদিন যাবত আমি ওর সাথেই চ্যাট করে যাচ্ছি। আজকে ওর সাথেই আমার দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল। ধন্যবাদ ভাই তুমি আমার কথামত জরিনার খবর এনে দিলে। আবুল অবাক হয়ে বলল, কি বলেন ভাই জরিনার সাথে আপনি চ্যাট করতেন। জরিনা তো আমার গার্লফ্রেন্ড।

তার কথা শুনে আবুল আর আকরাম হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। আবুলের কি করা উচিৎ বুঝতে না পেরে সেও ওদের সাথে হাসতে লাগল।

ওমর ফারুকী শিপন/এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com