উপলব্ধি

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২০ পিএম, ১০ অক্টোবর ২০১৯

পরবাসে যদিও তেমন অবসর সময় পাওয়া যায় না, তবুও যতটুকু সময় পাই সেটুকু চাইনিজ গার্ডেন কিংবা ওয়েস্ট কোস্ট পার্কে পার করতাম। এখন সেদিকে আর যাওয়া হয় না। ইদানিং ডরমিটরির পাশে অবস্থিত পানদান দিঘীরপাড়ের প্রেমে পড়ে গেছি। সেদিন আমার খুব মন খারাপ ছিল।

দিঘীরপাড়ের যেখানে একাকী বসে আনমনে নানা বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম। চোখ দুটি বন্ধ করতেই পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আমাকে স্বাগত জানাল। পানির এই শব্দটা এতই শ্রুতিমধুর লেগেছিল যে আজও চোখ বন্ধ করলে কানের কাছে পানির সেই চঞ্চল ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শুনতে পাই।

এরপর দিঘীরপাড় আমার লেখালেখি ও অবসর যাপনের স্থান হয়ে গেল। সন্ধ্যায় দিঘীরপাড়ের দৃশ্য থাকে অন্যরকম। স্থানীয়রা এমনকি সব বয়সী অভিবাসীরা হাঁটতে বের হন। স্বাস্থ্য সচেতন লোকদের এই হাঁটাহাঁটি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। কিছু কিছু পৌঢ় লোকদের হাঁটতে দেখে নিজেও হাঁটতে অনুপ্রাণিত হই।

সেদিন সত্তর ঊর্ধ্ব এক পৌঢ়কে দৌঁড়াতে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। লোকটি আমার সামনে এসে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটিয়ে বললেন, হে ইয়ং ম্যান লেটস টুগেদার রান। আমি তার কথা শুনে ভেতর থেকে হেসে উঠলাম। এই বুড়ো এসেছে আমার সাথে দৌঁড় প্রতিযোগিতা দিতে। তাকে তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিলাম। কিন্তু তার বারবার অনুরোধে রাজি না হয়ে পারলাম না। হয়ত এটা তার শেষ ইচ্ছেও হতে পারে। আমি চাই না আমার জন্য কারো শেষ ইচ্ছেটা অপূর্ণ থেকে যাক।

কোনো কিছু না ভেবে তার সাথে দৌঁড় দিলাম। পাঁচ মিনিট দৌঁড়ানোর পর আমার হার্টবিট বেড়ে গেল। কিন্তু লোকটাকে দেখি মৃদু হাসছে আর দৌঁড়াচ্ছে। আমি হারবার পাত্র নই জানপ্রাণ দিয়ে দৌঁড়াচ্ছি। দশ মিনিট পর আমার পক্ষে আর দৌঁড়ানো সম্ভব হলো না। আমি দিঘীরপাড় টুলে বসে হাফাচ্ছি। আর উনি আমাকে লজ্জায় ফেলে মুচকি মুচকি হেসে দৌঁড়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। পেছন ফিরে আমাকে হাত নেড়ে বলল, ইয়ং ম্যান ইউ হ্যাভ টু মোর প্র্যাকটিস।

লোকটার কর্মকাণ্ড দেখে আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। আমাদের দেশে এই বয়সের লোকগুলো হাসপাতালের বেডে অথবা বিছানায় শায়িত হয়ে মৃত্যু কামনা করে। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর তারা আর বাঁচতে চায় না। মানসিকভাবে তাদের মৃত্যু হয়। তারা শুধু শারীরিকভাবে বেঁচে থাকে। অথচ এদেশে বেঁচে থাকার মানুষের অদম্য চেষ্টা আমাকে মুগ্ধ না করে পারে না।

এরপর আমি প্রতিদিন রুটিন করে হাঁটতে বের হই। কিন্তু সেই পৌঢ় লোকটা দেখতে পাই না। তার সাথে সাক্ষাৎ করা জরুরি। তার কাছে জানতে চাইব এই বয়সেও সুস্থাস্থ্যের রহস্য কি? অনেক পৌঢ়দের দৌঁড়াতে দেখলেও তাকে দেখতে পাই না।

প্রতিদিন হতাশ হয়ে বাসায় ফিরি। একটা সময় উপলব্ধি করি লোকটার জন্য আমার কোমল হৃদয়ে মায়া জন্মে গেছে। মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রাণী অচেনা অজানা ব্যক্তির জন্য মায়া জন্মে যায় অথচ পরম আত্মীয়র সাথেও সামান্য স্বার্থের জন্য দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়।

একদিন হঠাৎ এক বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম সে এক পা খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছে। একবার মনে হলো আমি যাকে খুঁজছি এই সে বৃদ্ধ হবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো না এই সে নয়। সে পৌঢ়ের শারীরিক গঠন আরও শক্তিশালী ও মজবুত।

বৃদ্ধ লোকটি আমাকে লক্ষ্য করে হাত তুলে জানান দিলো কি খবর? সিঙ্গাপুরে একে অপরকে দেখলে হাত তুলে জানান দেয়। পৌঢ় লোকটি আমার কাছাকাছি আসতেই চিনতে পারলাম এই সেই ব্যক্তি যাকে আমি খুঁজছি।

একি অবস্থা তার। এই কয়দিনে একটা মানুষ কীভাবে এত বদলাতে পারে। এ যেন আমার সামনে বার্তা নিয়ে এলো। স্বাস্থ্যের বড়াই কর না। এই পৃথিবীতে কিছুই স্থায়ী না। সবকিছুই অস্থায়ী। এমনকি এই দেহটাও।

আমি তাকে আংকেল সম্বোধন করে জিজ্ঞেস করলাম কাকা আপনার এই অবস্থা কেন? আমরা বাংলাদেশিরা একে অপরকে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করে সম্বোধন করতেই বেশি পছন্দ করি। যেমন বয়স অনুসারে অপরিচিত ব্যক্তিদেরও আমরা সম্বোধন করি। চাচা, মামা, ভাই, বন্ধু, আপা, খালা নানা আত্মীয়কে সম্বোধন করে কথা বলা আমাদের সংস্কৃতি। কিন্তু সিঙ্গাপুরে নাম ধরে সম্বোধন করাই সংস্কৃতি। বেশিরভাগ লোককে দেখি একে অপরকে নাম ধরেই সম্বোধন করে।

চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, তিনি একটি রেস্টুরেন্টে ক্লিনিংয়ের কাজ করেন। এদেশে বৃদ্ধরা চায়ের দোকানে বসে সংবাদ গল্পগুজব করে সময় নষ্ট করে না। এরা সুস্থ থাকা অবস্থায় জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাজ করে যাবার চেষ্টা করে। এটাই এদেশের সংস্কৃতি।

চাচা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, সেদিন কাজ করার সময় পিছিল ফ্লোরে পা ফসকে পড়ে যাই। হাসপাতাল নেওয়ার পর হাড়ে ফাটল ধরা পড়ে। তাই এতদিন দৌঁড়াতে আসিনি।

এই পা নিয়ে তার হাঁটাহাঁটির প্রতি ভালোবাসা দেখে মনে হলো এরা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ থেকে মুক্ত থাকবে না তো আমরা থাকব। চাচার বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছেটা আমাকে অনুপ্রাণিত করল। আসলে আমরা সবাই দীর্ঘ আয়ু চাই। এমনকি মৃত্যুর পরও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করি।

আর এই বেঁচে থাকার চেষ্টা হলো মৃত্যুর পর কবর পাকা করে কবরের পাশে নামফলকে নিজের পরিচয় লিখে রাখা। কিন্তু আমি এদের মতো হতে চাই না। যেখানে আমিই থাকব না সেখানে আমার নাম দিয়ে কি হবে। আমার বন্ধু সেদিন বলল, আমি মৃত্যুর পর আর বেঁচে থাকতে চাই না। এমনকি আমি বৃদ্ধ বয়সে পরিবারের বোঝা হতে চাই না।

আমি আমার পুরো দেহ দান করে যাব। আমার চোখ অন্ধকে আলো দেবে, আমার কিডনি মৃত্যু পথযাত্রী একজনকে বাঁচিয়ে দেবে। আমার যা ব্যবহার করা যায় তা তাদের ব্যবহার করতে বলব। এমনকি আমার কঙ্কাল মেডিকেল স্টুডেন্টদের জন্য দান করে দিয়ে যাব। তার সাহসী কথা শুনে আমি ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম। আমি ভাবতেই পারি না আমার দেহ অন্যজন ব্যবহার করবে।

আমার কাছে মৃত্যু মানে আমার লাশকে ঘিরে আত্মীয়দের কান্নাকাটি। প্রিয়জনরা লাশ কবরে নামিয়ে দাফন করবে। আমার জন্য জানাজায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোয়া করবে। চারদিন ও চল্লিশ দিনে লোক ডেকে খাওয়াবে। আমার কবরের পাশে নিকটাত্মীয়রা দাঁড়িয়ে দোয়া করবে। যদিও আমি মৃত্যুর পর এসবের কিছু আমি উপলব্ধি করতে পারব না। তবুও মানুষ হিসেবে এগুলো থেকে বঞ্চিত হতে চাই না।

বন্ধু আমার কথা শুনে বলেছিল, তোর জীবন তোর সিদ্ধান্ত। আমি তোকে বলব না যে দেহ দান করতে হবে। তবে আমি এখনও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি। জানি না কবে এই জীবন প্রদীপ নিভে যাবে তবুও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার এই স্বপ্নই দেখে যাব।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com