লাভ ইন সিঙ্গাপুর

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:২৬ এএম, ১৭ অক্টোবর ২০১৯

তোমার জুতার রংটা চমৎকার। আমার পছন্দ হয়েছে। আমি তরুণীর মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছি। অপরিচিত কারো সাথে এভাবে কথা বলা যায়। তুচ্ছ অথচ কত সুন্দর ভাবেই না সে আলাপচারিতা আরম্ভ করল। এই প্রথম দেখলাম কেউ কারো জুতার প্রশংসা করছে। আমরা সাধারণত কারো চুল, দাঁত, পোশাক কিংবা তার গুণের প্রশংসা করি। কিন্তু আজ প্রথম কেউ আমার জুতার প্রশংসা করল। আমি তরুণীর দিকে তাকাতেই সে মিষ্টি হাসি উপহার দিল।

আহা! কত সুন্দর তার হাসি। কপাল যেন অর্ধচন্দ্র, নাক যেন মোহন বাঁশি। মোহন বাঁশি কখনো দেখিনি তবুও সাহিত্যিকরা কত সুন্দর করে মোহন বাঁশির সাথে তুলনা করে। নাকের নিচে ঠোঁটের উপরিভাগে বিন্দুবিন্দু জল। কোমল কালো চুলগুলো কাঁধে নেমে এসেছে। চোখ দুটি যেন হরিণ শাবকের ন্যায় নিরীহ। সমস্ত মায়া এখানে এসে পুঞ্জিভূত হয়েছে।

আমি তার প্রশংসায় জবাবে বললাম, থ্যাংক ইউ। এই প্রথম কেউ আমার জুতার প্রশংসা করল। আমার মুখে হাসি আর থ্যাংকস শুনে তরুণীটি আমার কাছাকাছি বসে বলল, কত টাকা দিয়ে কিনেছো?

আবারও হাসি দিয়ে বললাম, বারো ডলার। মেয়েটি প্রশ্নের জবাবে কিছু না বলে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আজকাল আমাদের সবচেয়ে আপন মোবাইল। আমাদের সবকিছু মোবাইলকে ঘিরে। আমরা একদিন না খেয়ে থাকতে পারব কিন্তু মোবাইল ছাড়া নয়।

আমি পার্কের এই টুলে বসে একটু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। সিঙ্গাপুরে পার্কগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। আমার মতো একাকী মানুষগুলো পার্কে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে। আমিও মাঝেমাঝে পার্কে বসে কর্মক্লান্ত দেহটাকে একটু প্রশান্তি দিয়ে বাসায় ফিরি।

আমি জুতার দিকে বারবার তাকাচ্ছি। মেয়েটি মোবাইল পাশে রেখে আমার দিকে তাকাইতে বললাম, একই রঙের আরো কয়েক জোড়া জুতা ক্রয় করব। সবসময় একই রঙের জুতা কেমন হবে? এবার মেয়েটি হেসে উঠল, নির্মল ও প্রাণবন্ত হাসি। কান্না করার পর কোনো মজার জোকস শুনলে আমরা যেমনটা হাসি। বুঝতে পারলাম মেয়েটির কোনো কারণে মন খারাপ ছিল। কথা বলার জন্য কোন সঙ্গী খুঁজছিলেন। আমাকে দেখে পাশে বসে তুচ্ছ সামান্য জুতা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

পার্কে আজ যারা আছে বেশিরভাগই জোড়ায় জোড়ায়। আজ রোববার, আর এই দিনেই ভিনদেশি প্রেমিক প্রেমিকাদের মেলা বসে এই পার্কে। আমিই ব্যতিক্রম, আমি এসেছি একটু প্রশান্তির জন্য।

মেয়েটি দেখতে খারাপ না। একে যদি গার্লফ্রেন্ড হিসেবে নেওয়া যায়। তাহলে ভালই হবে। পরিচিত জন দেখলে বলবে ওয়াও নিওনের বান্ধবী খুবই সুন্দরী। আর যদি অসুন্দর কিংবা একটু বয়স্ক বান্ধবী নেই তাহলে পরিচিতজনরা তামাশা করে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলবে কি ব্যাপার এর চেয়ে ভালো মেয়ে কি পেলি না।

অদ্ভুত আমার অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্য হলেও রূপবতী বান্ধবী চাই। আগ্রহী হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি কোথা থেকে এসেছো?
মেয়েটি তার স্বচ্ছ ঝকঝকে সাদা দাঁত দুটি বের করে বলল, আমি বলব না তুমি আন্দাজ করো। আমি কথা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বললাম, আমার আন্দাজ সঠিক হয় না। প্লিজ তুমিই বলো।

এবার মেয়েটি খিলখিল করে হেসে দিলো। আহা কত সুন্দর নির্মম হাসি। এই হাসির দিকে তাকিয়ে নিজেকেও সুখী মনে হয়। ভনিতা করে বললাম, তুমি সিঙ্গাপুরীয়ান।
- উত্তর সঠিক হয়নি
- তুমি মালয়েশিয়ান
- ভুল উত্তর।
আমি সাধারণ অপরিচিত কারো সাথে পরিচয় হলে প্রথমেই বলি আপনি দেখতে সিঙ্গাপুরীয়ানদের মতো। উত্তর যদি ভুল হয় তাহলে বলি মালয়েশিয়ান।

কারণ আমি দেখেছি কাউকে সিঙ্গাপুরীয়ান বা মালয়েশিয়ান বললে যতটা খুশি হয়। অন্য দেশের বললে ততটাই মন খারাপ করে।

এবার সে হাসতে হাসতে বলল আরে আমি সিঙ্গাপুরীয়ান না এমনকি মালয়শিয়ান না। এবার চিন্তিত হবার ভান করে বললাম, তুমি নিশ্চিয় ফিলিপিনো?

এতক্ষণ তার যতটা মন ভালো ছিল এবার ততটাই খারাপ হলো। সে ধমকের স্বরে বলল নো নেভার।
তাহলে নিশ্চয়ই ইন্দোনেশিয়া
এবার তার মুখে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল।

তরুণীটির খানিক আলাপ করার পর তার সাথে বন্ধুত্ব করার লোভ সামলাতে পারলাম না। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা অল্প পরিচয়ে আমার জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দেয়।

আমি তার দিকে তাকিয়ে আছে সে মোবাইল হাতে সেলফি তোলায় ব্যস্ত। এবার আমি চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না। যেমনটা দুর্লভ কোনো কিছু আমরা হাতছাড়া করতে চাই না। তেমনি আমিও তার সাথে বন্ধুত্ব করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না। আমি আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছো?

হুম আমার বসের পরিবারের সাথে এসেছি। তারা ওদিকে হাঁটছে। আমি আর হাঁটতে পারছিলাম না তাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। এরপর কথা বলার মতো কিছু খুঁজে পেলাম না। মস্তিস্ক ফাঁকা মনে হচ্ছে। সেখানে কোনো শব্দ।

তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে?
আগে ছিল এখন নেই।
নেই কেন? কে কাকে ছেড়ে গেল?

আসলে ছেলেটা আমাকে মন থেকে ভালোবাসেনি। সে আমার সাথে সম্পর্কের সময় আরো কয়েকটি মেয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করত।
তাহলে তো তুমি একা?

হুম। একা আছি ভালো আছি। কোনো ঝামেলা নেই।

মনে মনে খুশিই হলাম। এই সুযোগ একজন গার্লফ্রেন্ড জুটিয়ে নেওয়ার। আমি এত বছর যাবত সিঙ্গাপুর আছি অথচ এখনো পর্যন্ত কোনো গার্লফ্রেন্ড জোটাতে পারলাম না। কারো সাথে চ্যাট করার কিছুক্ষণ পরই আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করে। আমি যেন জাতির ভাই। আমার এক বন্ধু বলে মেয়েরা যখন কোনো ছেলের কাছে নিজেকে অনিরাপদ মনে করে তখনই ভাই সম্বোধন করে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। তারা ভাই সম্বোধন করে ইঙ্গিতে বোঝাতে চেষ্টা করে তুমি যা ভাবছো আমি তা নই। তুমি আমার ভাই হবার যোগ্য বয়ফ্রেন্ড না।

আমি মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম, আমরা কি বন্ধু হতে পারি?
হুম অবশ্যই।
তোমার ফেসবুক আইডির নাম কি?
কেন?
ফ্রেন্ডলিস্টে অ্যাড করব।
দরকার নেই। তুমি বরং আমার নম্বর নিয়ে যাও।

এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। আমি খুশিতে গদগদ করে তার নম্বরটি মোবাইলে তুলে বললাম কি নামে সেইভ করব।
মেয়েটি এবার মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, ইরমা।

আমি নম্বর সেইভ করে বললাম আমার নাম নিওন। মেয়েটির মোবাইল নম্বর পেয়ে আমি খুশিতে গদগদ করছি। এতদিন পর নিজেকে একজন সুপুরুষ মনে হচ্ছে। তাকে চা পানের অফার করলাম। সে প্রত্যাখান করে বলল, না অন্য কোনো সময়। আমার বসের পরিবার চলে এসেছে। সে দ্রুত চলে গেল আর আমি মন খারাপ করে বসে রইলাম।

ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর থেকে/এমআরএম/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com