লাভ ইন সিঙ্গাপুর

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:০৪ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০১৯

বাসায় ফেরার পর সারাক্ষণ ইরমার কথাই ভাবছি। এই দূর পরবাসে আমার আপনজন বলতে কেউ নেই। এখানে একাকী থাকাটা বড়ই কষ্টকর। যদি একজন বান্ধবী থাকে তার সাথে অন্ততপক্ষে অবসর সময় ব্যয় করতে পারব। ছুটির দিনে দু’জনে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরে বেড়াব। রেস্টুরেন্টে স্বস্বাদু খাবার খাব। ভাবতেই আমি শিহরিত হই। আমার কপালে কি এত সুখ আছে! সে যদি আমাকে ফিরিয়ে দেয়।

অতিরিক্ত ভাবনায় মস্তিষ্কের নিউরন সেলগুলো উত্তেজিত। দু’চোখের ঘুম উধাও। মোবাইলটা হাতে নিলাম তাকে কল দেওয়ার জন্য। কিন্তু ওপাশ থেকে বলল, এই নম্বরটি সঠিক নয়। এভাবে কয়েকবার চেষ্টা করলাম। প্রত্যেকবার একই কথা বলল। তারমানে ইরমা আমাকে ভুল নম্বর দিয়েছে। আমাকে ভুল নম্বর দেওয়ার মানে কি সে দ্বিতীয়বার আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায় না। তাহলে আমি বোকা, মিথ্যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম।

বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম। আকাশে মেঘ জমেছে। যেকোন সময় ঝুম বৃষ্টি নামবে। প্রকৃতি যেন আমার মনের অবস্থা অনুধাবন করেই এমনভাবে সেজেছে। আমার ভেতরটা এখন মেঘাচ্ছন্ন যেকোন সময় কান্না করে দেব। রুমের সবাই ঘুমাচ্ছে। তাদেরকে এমনভাবে ঘুমাতে দেখে হিংসে হচ্ছে। আমার বুকে ঝড় বয়ে যাচ্ছে অথচ ওরা কেউ টের পেল না।

মোবাইলটা অফ করে বিছানায় উবু হয়ে শুয়ে পড়লাম। একজন রুমমেটের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। বিছানায় বসে ভাবছি আর আর অফিসে যাব না। এমন ভগ্ন হৃদয়ে অফিসে গিয়ে কাজে মন বসাতে পারব না। পরক্ষণে ভাবলাম শুধু শুধু একটা ছুটি নষ্ট করার মানে হয় না।

এরপর যেখানে যাই সেখানেই ইরমাকে খুঁজি। ফেসবুকে তার নাম লিখে সার্চ দেই সেখানে শতশত ইরমাকে পাই কিন্তু আমার সেই ইরমাকে পাই না।

প্রায় মাসখানেক পর ফেসবুকে ব্লাক কুইন নামের একটি আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে। ব্লাক কুইন নাম দেখে অ্যাড করব কি করব না দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। একদিন ব্লাক কুইন আইডি থেকে ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেজ এলো, হ্যালো নিওন আমি ইরমা।

ইরমা নাম শুনে কোনকিছু না ভেবে তাকে ফ্রেন্ডলিস্টে অ্যাড করে নেই। ভাগ্যিস সে ম্যাসেজ দিয়েছিল নইলে তো ফ্রেন্ডলিস্টে অ্যাড করার কোনো প্রশ্নই উঠে না। কেন যে মানুষ নিজের প্রকৃত নাম হাইড করে আজগুবি নামে আইডি খুলে। তার প্রতি আমার অনেক অভিমান ছিল। ভেবেছিলাম ভুল নম্বর দেওয়ার জন্য তাকে ইচ্ছেমতো বকা দেব। কিন্তু তাকে পেয়ে সব ভুলে গেলাম। তাকে আর জিজ্ঞেস করা হলো না কেন ভুল নম্বর দিয়েছিল। রূপবতী মেয়েদের এমন আচরণ স্বাভাবিক।

এরপর দু’জনার কথাবার্তা চলতে থাকে। তার সাথে কথার বলার দিনগুলো ভালোই কাটছিল। কেউ কাউকে বলিনি ভালোবাসি তবুও কথাবার্তায় অনুভব করতে পারি দু’জন দু’জনাকে ভালোবাসি। প্রতিদিন ভাবি তাকে বলব, আই লাভ ইউ। কিন্তু বলতে পারি না। তাকে ভালোবাসি বলার পর যদি ফিরিয়ে দেয় তাহলে হয়ত আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হবে। সরাসরি আই লাভ ইউ না বললেও আকার ঈঙ্গিতে বুঝাতে চেষ্টা করি তার প্রতি আমার দুর্বলতা।

একদিন বললাম, জানো আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি। আমার দেখা তুমি সেরা নারী। তোমাকে যে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাবে সে খুবই ভাগ্যবান। সে ম্যাসেজ সিন করে রিপ্লাই দিল না। তার কাছ থেকে জবাব না পেয়ে আমি ঘামতে লাগলাম। আমার কপালে শিশিরবিন্দুর মতো ঘাম জমেছে। কেন যে তাকে এই কথা বলতে গেলাম। এখন হয়ত সে আমার সাথে আর কোন কথাই বলবে না।

কিছুক্ষণ পর সে রিপ্লাই দিলো। কি বলতে চাও সরাসরি বলো? তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?
আমি দ্রুত জবাব দেই, হ্যাঁ।

প্রথম পর্ব পড়ুন

ভেবেছিলাম তুমি অন্যরকম ছেলে। এখন দেখি আমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তুমি অন্য সব পুরুষদের মতই। পুরুষের ভালোবাসার মানে আমার জানা আছে। তাদের ভালোবাসা মানে ছলেবলে কৌশলে বিছানায় নেওয়া। একবার বিছানায় নিতে পারলে তাদের ভালোবাসা উবে যায়।

-দেখো আমি অন্যসব পুরুষদের মতো নই।
-সব পুরুষই এই কথা বলে। আসলে তুমি আমাকে নয় আমার দেহকে ভালবাসো।
-মিথ্যে আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি।
-আমার সম্পর্কে তুমি কিছু জানো না। আমার সম্পর্কে জানলে আমার প্রতি তোমার যে মোহ তা থাকবে না।
-আচ্ছা তোমার সম্পর্কে বলো।
-এভাবে হবে না। চলো একদিন দেখা করি আমরা।

আমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই। তার সাথে দেখা করার আনন্দে আমি দিশেহারা। যেখানেই যাই সেখানেই মনে হয় আমি ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে আছি। আমার চারপাশে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। ফুলের সৌরভ আমাকে বিমোহিত করছে। ভোমর এক ফুল থেকে আরেক ফুলে উড়ে মধু সংগ্রহ করছে। পাখিরা গান গাইছে। আমাকে এমন আনমনে দেখে সহকর্মী একদিন জানতে চাইল কি হয়েছে।

আমি তাকে বিস্তারিত খুলে বললাম। সব শুনে সে সহাস্যে বলল, সিঙ্গাপুরে ভালোবাসা বলতে কিছুই নাই। এখানে ছেলে মেয়ে একে অপরের কাছে আসে শুধু ইনজয় করার জন্য। তুমিও ইনজয় কর। তাকে সিরিয়াসলি ভালোবাসার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি তাকে সিরিয়াসলি ভালেবাসবে আর সে তোমার সাথে অভিনয় করবে। আর বিদেশি মেয়েকে সিরিয়াসলি ভালোবাসার কি আছে? তুমি তাকে বিয়ে করবে?
আমি একবাক্যে বললাম হুম তাকে বিয়ে করার জন্যই ভালোবেসেছি।

এসব বিয়েটিয়ের চিন্তা বাদ দাও। একজন বিদেশি মেয়েকে বউ করে বাড়ি নিলে তোমার পরিবার মেনে নিতে পারবে না। আমাদের পরিবার চায় একজন দেশী সংস্কৃতির মেয়েকে বউ হিসেবে ঘরে আনতে। তার ভাষা সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। তাকে তুমি কিভাবে বউ হিসেবে বাড়ি নেওয়ার কথা চিন্তা কর। এত আবেগী হইও না। তার চেয়ে বরং প্রবাস জীবনের একাকীত্ব দূর করতে তাকে জাস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে নাও। কয়দিন মজা করে ছেড়ে দিবে।

আমি তার কথা মানতে পারলাম না। বিরোধিতা করলাম। ভালোবাসা মানেই দেহ উপভোগ নয়। তাকে সারাজীবন সঙ্গী হিসেবে নেওয়া।

সে বলল, আচ্ছা শোন সে তোমার সাথে দেখা করতে চায় মানে তোমার সাথে ‘এইটি ওয়ানে’ যেতে চায়। আমার কথা বিশ্বাস না হলে তুমি গিয়েই দেখ।

আমি তার কথা বিশ্বাস করতে না পারলেও মস্তিষ্কে ‘এইটি ওয়ানের’ কথা স্থায়ী হয়ে রইল। ইরমা যদি আমাকে ‘এইটে ওয়ানে’ যাওয়ার প্রস্তাব করে আমি তার প্রস্তাবে না করতে পারব না। তাই সবধরনের প্রস্তুতি নিয়েই বের হই।

আমরা একটি এমআরটি স্টেশনে মিলিত হই। ইরমা আমার দেখে কাছাকাছি এসে বলল,...বলো কোথায় যাবে?
-তুমি বলো?
-না তুমি যেখানে নিয়ে যাবে আমি সেখানেই যাব। তার কথা শুনে সহকর্মীর কথা মনে পড়ে গেল। সহকর্মী বলে দিয়েছে মেয়ে যদি বলি তুমি যেখানে বলো সেখানেই যাব। তা রমানে সে তোমার সাথে ‘এইটি ওয়ানে’ যেতে প্রস্তুত।

আমি তাকে নিয়ে এইটে ওয়ানে যেতে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলে আর্থিকভাবে অপ্রস্তুত ছিলাম না। আমার পকেটে মাত্র ৫০ ডলার আছে। এই টাকা দিয়ে আর যাই হোক ‘এইটে ওয়ানে’ যাওয়ার জন্য যথেষ্ট না।

আমি একটু বেহিসেবী মানুষ, হাতে টাকা এলেই খরচের জন্য সামান্য রেখে সব দেশে পাঠিয়ে দেই। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার কোনো চিন্তাভাবনা নেই। পরিবারের সবার মুখে হাসি দেখাতেই আমার আনন্দ। এরাই আমার ভবিষ্যৎ। যদিও একসাথে সবাইকে খুশি করতে পারি না। একজনকে খুশি করতে গেলে আরেকজন অখুশি হয়।

আমি ইরমাকে তা বুঝতে দিলাম না। তাকে কাছাকাছি একটি পার্কে নিয়ে গেলাম। সেখানে প্রেমিক প্রেমিকা জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে। আমি লজ্জা শরম ভুলে তাকে নিয়ে একটু নির্জন স্থানে বসলাম। ইরমা আমাকে দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টি বলছে সে আমাকে ভালোবাসে। তাহলে আমি ভালোবাসি বলার পর সে ফিরিয়ে দিলো কেন? সে আমার কাছাকাছি বসে বলল, নিওন তুমি খুব ভালো ছেলে। কিন্তু আমি খুবই বাজে মেয়ে। আমার কথা শুনলে আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা থাকবে না।

আমি আকুলভাবে বললাম, এমনভাবে বলো না। আমি সত্যি তোমাকে ভালবাসি।
-তুমি কি জানো আমি বিবাহিত আমার দুটো ছেলে আছে।
আমি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি। সে নিশ্চয়ই মজা করছে। তার বয়স সর্বোচ্চ পঁচিশ হবে। আর সে বলছে বিবাহিত দুই সন্তান আছে।
-আমি জানতাম তুমি বিশ্বাস করবে না।
-কেমনে বিশ্বাস করি, তোমার বয়স ২৫ কিংবা ২৬ আর তুমি বলছো দুই সন্তানের জননী।
-তোমার ধারণা ভুল আমার বয়স ৩২।
এবার আমি বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে আছি। তার চেহারা দেখে কোনভাবেই বোঝা যাচ্ছে না সে বিবাহিত। আমি আর কথা বলতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমি আকাশ থেকে দমকা হাওয়ায় উড়ে নর্দমায় পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।

*এইটি ওয়ান সিঙ্গাপুরের জনপ্রিয় হোটেলের নাম।

চলবে....

ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর থেকে/এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com