লাভ ইন সিঙ্গাপুর

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৫৬ পিএম, ২০ অক্টোবর ২০১৯

কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, তোমার পুরো কাহিনি বলো। ইরমা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার জীবনের গল্প বলতে আরম্ভ করল। আমি নীরব দর্শক হয়ে তার কথা শুনছি।

আমার বয়স যখন ৫ বছর তখন আমার বাবা মাকে ছেড়ে চলে যায়। এর কিছুদিন পর মা অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান। আমাকে তিনি নানা নানির কাছে রেখে যান। তখন কি যে কষ্ট করেছি তা বলে বোঝানো যাবে না। আমার মা আমাকে একটু ভালোবাসতেন না। তিনি চলে যাওয়ার সময় আমার ছোট বোনকে তার সঙ্গে করে নিয়ে যান। অথচ তিনি আমাকে তার সঙ্গে নেবার কথা একবারও চিন্তা করেননি।

নানির বাড়ি এসে আমার কপালে নেমে আসে আরও দুর্যোগ। স্কুল থেকে ফেরার পর আমাকে কাজ করতে হত। কাজ না করলে নানি আমার ওপর অত্যাচার করতেন। তার অত্যাচারে মনে হত আমি তাদের কেউ না। আমি একা, ভীষণ একা। তবে তখন আমার নানা মাঝেমধ্যে আমার পাশে দাঁড়াতেন, শান্ত্বনা দিতেন। নানা তো সারাক্ষণ বাসায় থাকতেন না। উনি না থাকলেই আমার উপর নেমে আসত অত্যাচার।

এমনও দিন গেছে সারাদিন না খেয়ে থেকেছি। রাতে ক্ষুধার জ্বালায় ঘুম আসত না। কেঁদে বালিশ ভেজাতাম। মাঝেমাঝে বাবা আমাকে দেখতে আসতেন। আমি কান্না করে বলতাম বাবা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও। বাবা বলতেন, আচ্ছা নিয়ে যাব। আর কয়েকটা দিন যাক।

আমি নানির অত্যাচার সহ্য করে বড় হতে থাকি। একদিন বাবা বললেন আমাকে নিয়ে যাবেন। আমিও যেতে প্রস্তুত। ঠিক তখনই মা এসে উপস্থিত সেখানে। তিনি বেঁকে বসলেন। আমাকে বাবার কাছে দিবেন না। বাবা যদি একজন সন্তান নিতে চায় তবে সে যেন আমার ছোট বোনকে নিয়ে যান।

মা খুবই চালাক প্রকৃতির নারী। তিনি জানতেন আমি বাবার ভক্ত বাবার সাথে থাকব। কিন্তু আমার ছোট বোন মায়ের ভক্ত সে কখনো মাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। বাবা ছোট বোনকে নিতে চাইলে ছোট বোন বাবার সাথে যেতে রাজি হয়নি। বাবা তখন হতাশ হয়ে ফিরে যান।

এরপর আমি মায়ের সাথেই থাকতে শুরু করি। নানার বাড়ি থাকতে সকাল-বিকেল নানি আমার উপর রীতিমতো অত্যাচার করতেন। তার আচরণ ও অত্যাচারে আমার কান্না করা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। ভেবেছিলাম মায়ের কাছে অন্তত সুখ পাব। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আগের সব কষ্ট ভুলে যাব।

কিন্তু কিছুদিন পর মা আমার উপর অত্যাচার শুরু করেন। উনিশ থেকে বিশ হলে গালাগালি মারধর করতেন। কোনো মা তার সন্তানের উপর এমন নির্যাতন করতে পারে আমার আগে তা জানা ছিল না।

ইরমার চোখ গড়িয়ে অশ্রুজল পড়ছে। সে আর কিছু বলতে পারছে না। আমি টিসু পেপার এগিয়ে দিলাম, সে হাত বাড়িয়ে টিসু পেপার নিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, জানো জীবনের প্রথম আমি কারো কাছে আমার ভেতরের সব কষ্টগুলো শেয়ার করছি।
-আমার সাথে শেয়ার করার মানে?
-তোমার সাথে কথা বলার পর মনে হয়েছিল তুমি একজন বিশ্বস্ত যাকে আমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারি। যার সাথে আমার কষ্টগুলো শেয়ার করতে পারি।
-আমাকে এমন মনে হবার কারণ?
-আমার ফেসবুকে অনেক ছেলে বন্ধু আছে। যারা প্রায় ম্যাসেজ দিয়ে উত্যক্ত করে। আকার ইঙ্গিতে বিছানায় আহ্বান করে। একমাত্র তুমি একজন যার সাথে গত একমাস যাবত চ্যাট করছি। তুমি ভালোবাসি ছাড়া কোনো খারাপ কথা বলনি।

মুখে হাসি ফুটিয়ে বললাম, তোমাকে ধন্যবাদ। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, মেয়েরা ছেলেদের চোখের দৃষ্টি দেখলেই বুঝতে পারে তার মনে কি? ভালো ছেলেরা মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে আর বদ ছেলেরা মেয়েদের শরীরের দিকে তাকিয়ে কথা বলে।
মনে মনে বলি বোকা মেয়ে তুমি আমাকে চিনতে পারনি। আমি কথার মোড় ঘোরানোর জন্য বললাম, আচ্ছা বলো তারপর কি হলো?

দিনের পর দিন মায়ের অত্যাচার বাড়তে থাকে। একদিন মা আমার হাত পা বেঁধে রান্না ঘরের পিলারে সাথে বাঁধে। আমার হাত পা এমনভাবে বেঁধেছিল আমি একটু নড়তেও পারছিলাম না। আমাকে শক্ত করে বাধার পর সে আমার শরীরে কেরোসিন ঢেলে দিয়েছিল। আমি তখন বেঁচে থাকার জন্য হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। বেঁচে থাকার কি যে আঁকুতি কিন্তু মায়ের মনে কোন মায়া জন্ম হয়নি। সে দিয়াশলাই জ্বালিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। ঠিক তখন আমার সৎ বাবা এসে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন।

সেদিন বেঁচে যাওয়ার পর মায়ের সাথে তেমন কথা বলতাম না। আশ্চর্য, মা আমার ছোট বোনকে আদর করতেন আর যত অত্যাচার সব আমার উপর করতেন। একদিন নানা এসে বলল, ইরমা তুই দেখতে তোর বাবার মতো। তাই তোর মা তোকে সহ্য করতে পারে না।

এভাবে কাটছিল দিন। বয়স যখন পনের হয় তখন নিজে বেঁচে থাকার জন্য দেশে কাজে যোগদান করি। এর কিছুদিন পর কাজের সন্ধানে মালয়েশিয়া যাই। সেখানে ভালোই কাটছিল দিন। মাস শেষে টাকা পাই। টাকা হাতে পেলে সব কষ্ট ভুলে যাই। পৃথিবীতে টাকাই একমাত্র ওষুধ যা মানুষের মুখে হাসি ফোটায়।

কিন্তু আমার কপালে সুখ সইল না। কিছুদিন পর মালিক কৌশলে আমাকে বিছানায় আহ্বান করতে শুরু করে। আমি তাকে এড়িয়ে চলি। একদিন সে জোরপূর্বক আমাকে ধর্ষণ করতে চায়। তখন সেখান থেকে পালিয়ে দেশে চলে যাই।

দেশে আসার কিছুদিন পর আমার বিয়ে হয়। ভেবেছিলাম বিয়ের পর স্বামীকে পেয়ে সব কষ্ট ভুলে যাব। স্বামী আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দেবে। কিন্তু আফসোস তা হলো না। সৃষ্টিকর্তা হয়ত আমার মতো অসহায় মানুষকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পান। সেখানেও শ্বশুর শাশুড়ি আমার উপর অত্যাচার করে। তারা আমাকে কাজের মেয়ের মতো আচরণ করে। আমি যেন সে বাড়ির কাজের মেয়ে। তাদের বাড়ির বউ হবার যোগ্যতা আমার নেই।

নানির অত্যাচার, মায়ের অত্যাচার, পিতৃহীন সব মিলিয়ে আমি যেন বেঁচে থেকেও নরকে বাস করছিলাম। এতকিছুর পরও আমার গর্ভে দুটি সন্তান আসে। ভেবেছিলাম সন্তান ভুমিষ্টের পর সুখ পাব। কিন্তু ভুল সবই ভুল।

একটা সময় তাদের ছেড়ে সিঙ্গাপুরে আসতে বাধ্য হই। সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানই এখন আমার প্রধান লক্ষ্য। সিঙ্গাপুর আসার পর কিছুটা সুখে আছি। দুই ছেলেকে মাস শেষে টাকা দেই। সেই টাকায় তাদের পড়ালেখা হচ্ছে। আমি জানি ছেলেরা বড় হলে আমার স্বামী তার সন্তানদের নিয়ে যাবেন, তবুও সন্তানদের মুখে হাসি দেখেই আমি তৃপ্ত হই।

ইরমার কথা শোনার পর নিজের অজান্তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে তার গর্ভের সন্তানের সুখের জন্য কত কি না করছে। তার সংগ্রামী জীবনের গল্প আমাকে অনেককিছু শিক্ষা দিলো। একজন মা ছোট ছোট সন্তানদের ছেড়ে থাকতে যে কতটা কষ্টকর তা আমি উপলব্ধি করতে পারছি।

আশ্চর্য হলেও সত্য ইরমার কাহিনি শোনার পর তার প্রতি আমার যে ভালোবাসা ছিল সব আস্তে আস্তে উবে গেল। আমি অবিবাহিত, সন্তানহীনা ইরমাকে ভালোবাসি। কিন্তু বিবাহিতা, সন্তানের মা হওয়াতে তাকে ভালোবাসতে রাজি নই। অথচ মানুষ কিন্তু একজনই। তার মানে আমি তাকে ভালোবাসিনি। ইরমার প্রতি ভালোবাসা থাকলে সবকিছু শোনার পরও তাকেই ভালোবাসতাম।

চলবে....

ওমর ফারুকী শিপন/সিঙ্গাপুর থেকে/এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com