কতবার বলেছি বিদেশে এত সুখ নেই

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫৭ পিএম, ০৭ নভেম্বর ২০১৯

সকাল সাড়ে সাতটায় গেটের ভেতরে নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। অজানা অচেনা জায়গায় নিজেকে অসহায় ও তুচ্ছ মনে হচ্ছে। চারপাশে বাংলাদেশি লোকদের বাংলা ভাষায় কথা বলতে দেখে আনন্দিত হলাম। যাক এখানেও তাহলে অনেক বাংলাদেশি আছেন।

কোম্পানির এইচআর এসে ব্রিফিং দিয়ে বললেন, আমাদের সবাইকে এখন মেডিকেল চেকআপ করার জন্য পাঠানো হবে। মেডিকেলে ফিট হলেই কাজে যোগ দেওয়া যাবে। নইলে ফিরতি টিকিটে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তার কথা শুনে ক্ষুধা ভুলে গেলাম। অজানা আশঙ্কা ভয় আমাকে গ্রাস করে ফেলল। মনে মনে বললাম, হে আল্লাহ তুমি আমাকে মেডিকেলে ফিট করে দাও, জীবনে তোমার কাছে আর কিছু চাইব না।

মেডিকেল চেকআপ করতে করতে দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেল। নিজের কাছে টাকা নেই কি খাব চিন্তায় পড়ে গেলাম। গতকাল থেকে ভাত খাইনি। আমার মনে হচ্ছে কয়েক বছর যাবত আমি কিছু খাই না। এইচআরকে বললাম, খাবার কিনে খাওয়ার মতো আমাদের কাছে টাকা নেই। এইচআর বলল, ঠিক আছে আমি সবাইকে খাবার কিনে খাওয়াব সবাই আমাকে আগামীকাল টাকা ফেরত দিয়ে দিবে। আমরা সবাই এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম।

কিছুক্ষণ পর তিনি সবার জন্য দুপুরের খাবার কিনে আনলেন। খাবার দেখে আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। সবার জন্য দুই পিচ রুটি আর সামান্য তরকারির ঝল নিয়ে এসেছেন।

সবাই রাস্তার পাশে ঘাসের উপর বসে রুটি খেলাম। ক্ষুধার্ত পেটে গপাগপ রুটি খেয়ে পেটপুরে পানি খেলাম। খাওয়া শেষ করে সবাই রাস্তার পাশেই শুয়ে বিশ্রাম নিতে লাগলাম। আমি ঘাসের উপর শুয়ে আবারও বিওসি এর ট্রেইনার আকবর আলীর কথা ভাবছি। আকবর আলি আমাদের কয়েক দিনের ওয়েল্ডিং ট্রেনিং করিয়েছেন। আমরা ট্রেনিংয়ে অমনোযোগী ছিলাম বলে তিনি কথায় কথায় উচ্চস্বরে বলতেন, ‘বিদেশ যাবি, বিদেশ এত সুখকর নয়। মনে রাখিস তোরা রাস্তায় খাবি আর রাস্তায় ঘুমাবি।’ তার কথা শুনে সবাই হাসতাম। অনেকে তো তার সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়তাম।

মেডিকেল চেকআপের দুইদিন পর রুমে দেখি দুইজন রুমমেট পায়জামা, পাঞ্জাবি পড়ে নামাজ আদায় করে তসবিহ হাতে বসে আছে। একজন মনযোগ সহকারে কুরআন পড়ছে। রুমে আগের মত চাঞ্চল্যতা নেই। সবাই কেমন যেন মনমরা মনমরা ভাব নিয়ে বসে আছে। রুমের এ রকম গুমোট ভাব দেখে কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। আর তাদের হঠাৎ ধার্মিক হয়ে যাওয়ার বিষয়টাও বুঝতে পারলাম না।

একজনকে ঈশারায় রুমের বাহিরে নিয়ে কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এই দুইজন মেডিকেল আনফিট। দুইজনের হাইপ্রেশার। ডাক্তার তিনদিন সময় দিয়েছে। তিনদিন পর আমার মেডিকেল করা হবে। যদি আবারো আনফিট হয় তাহলে তাদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তার কথা শুনে চিন্তিত হলাম। অনেক টাকা খরচ করে এরা প্রবাসে এসেছে এখন যদি দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাহলে এদের রাস্তায় বসতে হবে। এদের মধ্যে একজন আবার সব টাকা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এসেছে।

মানুষ বিপদে পড়লে কিংবা তাদের মনে মৃত্যু ভয় নাড়াচাড়া দিয়ে উঠলে, যেভাবে ধর্মে-কর্মে মনোনিবেশ করে সবসময় যদি তা করত তাহলে দেশের মসজিদগুলো মুসল্লি শূন্য থাকত না। বরং আরো মসজিদ নির্মাণ করা লাগত। তাদের মেডিকেল আনফিটের কথা শুনে আমি জিজ্ঞেস করলাম ভাই আমাদের কি খবর? তিনি বললেন তারা দুইজন ছাড়া আমরা সবাই ফিট।

আমরা দু’জন আলাপ করছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে একজন এসে বলল, ওমর ভাই আপনার বড় ভাই নিচে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। বড় ভাইয়ের কথা শুনে আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেলাম। নিজের কাছে মোবাইল না থাকাতে বড় ভাইকে কল দিয়ে বলতে পারিনি আমি কোথায় আছি। বড় ভাই তিন বছর যাবত সিঙ্গাপুরে আছেন। সিঙ্গাপুর আসার আগে ভাই বলেছিল, তুই এখানে এসে আমাকে কল দিস আমি এসে তোকে কিছু টাকা দিয়ে যাব।

এখন ভাই এখানে এসেছে শুনে মনে হচ্ছে তপ্ত মরুভূমিতে আমি এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল হাতে পেলাম। তাই আনন্দে দিশেহারা হয়ে দ্রুত নিচে নেমে গেলাম।

সিকিউরিটি গেট পাড় হতেই দেখি ভাই দুই হাতে দুটি প্লাস্টিক ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে। ভাইয়ের ক্লান্ত চেহারা দেখে আমার মায়া হলো। মনে হচ্ছে ভাই খুব ক্লান্ত।

আমাকে গেট থেকে বের হতে দেখে ভাইয়ের মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠল, তিনি ব্যাগ দুটি পাশে রেখে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। ভাইকে দেখে আমিও আনন্দে দিশেহারা। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে এতক্ষণ নিজেকে অসহায়, তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। ভাইকে দেখে মনে হচ্ছে আমার ভাই আছে আমার আর কিছু লাগবে না। মনে হচ্ছিল সারা পৃথিবীকে চিৎকার করে বলি, তোমরা দেখ আমার বড় ভাই এসেছে আমাকে দেখার জন্য।

ভাই এগিয়ে এসে কিরে কেমন আছিস? আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তার বুকে জড়িয়ে নিলেন। আমি ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে স্বর্গীয় সুখ অনুভব করলাম, ভাই যে পৃথিবীর সেরা ধন তা এই প্রথম অনুধাবন করতে পারলাম। ভাইয়ের মতো আপন বুঝি পৃথিবীতে কেউ নাই। আনন্দে আমার চোখে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। হাতের তালুতে চোখের পানি মুছে দুই ঠোটে হাসি ফুটিয়ে ভাইয়ের গলা ছেড়ে বললাম, ভাই আমি ভালো আছি। আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

ডিউটি থেকে সরাসরি তোর এখানে আসছি, তাই এমন দেখাচ্ছে। দুই ভাই রাস্তার পাশেই বসে পড়লাম। আমার সাথে দেখা করতে দেরি হবার কারণ ভাই কৈফিয়ত দিয়ে বলল, গত চারদিন যাবত আমি রাত এগারটা পর্যন্ত ডিউটি করেছি, তাই তোকে খুঁজে পেতে দেরি হয়ে গেল। তবুও ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে অনেকের কাছে জিজ্ঞেস করেছি নতুন লোকগুলোকে কোন ডরমিটরিতে তুলেছে। আজ কনফার্ম হয়ে ডিউটি থেকে সরাসরি তোর সাথে দেখা করতে চলে এলাম।

আমি বললাম, ভাই আমার মোবাইলটা আনিনি তাই আপনাকে কল দিতে পারিনি। তারপর দু’জনের অনেক জমানো কথা বলতে লাগলাম। দু’জনেই মায়ের অসুস্থতা আর কোমায় চলে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে করতে ব্যথিত হলাম।

ভাই ব্যাগ দুটি আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এখানে আঙুর, কলা, আপেল, ডিম, দুধ, পাউরুটি আর বিস্কুট আছে তুই প্রতিদিন অল্প অল্প করে খাবি। আমি ব্যাগ দুটি হাতে নিয়ে মনে মনে ভাবলাম, পৃথিবীতে কে আছে এমন আপনজন ভাই ছাড়া, যে এই প্রবাসে আমার এতটা যত্ন নেবে? ভাই পকেট থেকে মোবাইল আর একটি সিম বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, এই নে মোবাইল আর সিম।

আমি সিমে টাকা টপআপ করে দিয়েছি। এখন যত খুশি সবার সাথে কথা বলবি। আনন্দে ইচ্ছে করছে আমি কেঁদে ফেলি। কিন্তু আমার কান্না শোভা পায় না। তাই ভাইয়ের দিকে কৃতজ্ঞতায় তাকিয়ে রইলাম।

আরো কিছুক্ষণ গল্প গুজব করার পর ভাই আমার হাতে ৫০ ডলারের নোট একটি হাতে ধরিয়ে বললেন এটা রাখ যা খুশি খাবি। আমি বললাম, লাগবে না কোম্পানি থেকে অ্যাডভান্স কিছু টাকা দিয়েছে। ভাই জোর করে টাকাটা আমার পকেটে গুঁজে চলে গেলেন।

আমি কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে মিজান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

ওমর ফারুকী শিপন/সিঙ্গাপুর থেকে/এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com