পরবাসে কোথায় পাব আপনজন

ওমর ফারুকী শিপন
ওমর ফারুকী শিপন ওমর ফারুকী শিপন , সিঙ্গাপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৯:৫৪ এএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৯

বিকেল থেকে মাথাটা ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে অসুখে পড়ব। ঝড় আসার আগে যেমন পূর্বাভাস পাওয়া যায় ঠিক তেমনি হচ্ছে। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে কিন্তু ফ্যানের বাতাস বরফ কুচির মতো শরীরে বিঁধছে। লাইটের আলোও অসহ্য লাগছে। আলোর দিকে তাকাতেই পারছি না। তাই কম্বল মুড়িয়ে কুঁজো হয়ে মায়ের গর্ভে যেভাবে ছিলাম, ঠিক সেভাবেই শুয়ে আছি।

আগের পর্ব পড়ুন

তবুও ফ্যানের বাতাস গায়ে কাটা হয়ে বিঁধছে। শীতে শরীর থরথর করে কাঁপছি। একজন রুমমেটকে বললাম, ভাই ফ্যানটা অফ করা যাবে? আমার খুব শীত করছে। রুমমেট ব্যঙ্গ করে বলল, আপনার শীত করে তাতে আমার কি! আমার তো গরম লাগছে। ফ্যান বন্ধ করা যাবে না। শীত করলে ভারি কম্বল গায়ে জড়িয়ে ঘুমান। আমি চুপ করে রইলাম। কিছু বলার মতো অধিকার আমার নেই।

এই রুমে আমরা ১৬ জন সদস্য থাকি, সবার সমান অধিকার। একজনের জন্য আরেকজন কষ্ট করবে কেন! আমি অসুস্থ তাই ফ্যানের বাতাস শরীরে লাগছে কিন্তু যারা সুস্থ তাদের গরম লাগছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর, আরেকজনকে বললাম, ভাই রুমের বাতিটি অফ করে দিন। বাতির কারণে আমার মাথা ব্যথা করছে। পাশ থেকে একজন চিৎকার করে বলল, এই ভাই বাতি নেভাবেন না, আমি এখন পড়ছি। বাতি নেভানোর সময় হলেই বাতি নেভানো হবে।

রুমের সব সদস্য মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, রাত ১১টায় বাতি নেভানো হবে এবং ভোর সাড়ে পাঁচটায় বাতি জ্বালানো হবে। তাই এখন আমাকে রাত ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, রাত এগারটা আগে বাতি নেভানো যাবে না। এখন মাত্র রাত নয়টা বাজে। কি আর করার! নিয়ম যেহেতু সবাই মিলে করেছি, তাই পালন করতে বাধ্য।

চোখের উপর ভারি তোয়ালে পেঁচিয়ে আলো থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছি। আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার চোখের সামনে ভেঁসে উঠছে আলো। চোখ বন্ধ করলে আলোটা আরো বেশি করে মস্তিষ্কে আঘাত করছে।

এই আজকে কার হাউজকিপিং (রুম পরিষ্কার) এখনো হাউজকিপিং করা হল না কেন? একজন রুমমেট চিৎকার করে কাকে যেন উদ্দ্যেশ্যে করে বলছে। তার গলার আওয়াজে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারলাম না। একজন তাকে বলল, হাউজ কিপিং রোস্টার দেখলেই তো বুঝা যায়, কার হাউজকিপিং।

আমার পাশের বেডের একজন বলল, রোস্টার দেখার কি আছে, গতকাল আমি হাউজকিপিং করেছি। আজকে ওমর ভাইয়ের। আমি চুপ করে শুয়ে আছি। তাদের কথা শুনেও না শোনার ভান করছি। নিজের অসুস্থতার কারণে কোনো কিছুই ভালো লাগছে না। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। এ সময় একজন আপনজনের সাহচার্য্য খুবই প্রয়োজন। কিন্তু বিভুঁইয়ে কোথায় পাব আপনজন?

কে যেন আমার শরীরে ধাক্কা দিয়ে বলল, এই ভাই আপনি হাউজকিপিং না করে ঘুমাচ্ছেন কেন? উঠুন হাউজকিপিং করে ঘুমান। ইচ্ছে করছিল তার টুঁটি চেপে ধরি। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে ঠাণ্ডা করে বললাম, আচ্ছা করছি।

প্রথম যখন আমরা সিঙ্গাপুর আসি। তখন কেউ রুম পরিষ্কার করতাম না। নিজেদের রুম নিজেদের পরিষ্কার করতে হবে, জানতামই না। সবাই যেখানে সেখানে ময়লা ফেলতাম। একদিন সিকিউরিটি এসে বলল, তোমরা প্রতিদিন নিজেদের রুম পরিষ্কার করবে। নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা ফেলবে। মাসে একবার আমরা তোমাদের রুম পরিদর্শন করব। যদি ময়লা পাওয়া যায়, তাহলে আমরা নিজেদের লোক দিয়ে পরিষ্কার করাব, কিন্তু তার বিনিময়ে তোমাদের বেতন থেকে টাকা কেটে রাখা হবে।

সিকিউরিটির কথা শুনে আমাদের টনক নড়ল। আমরা প্রথম বুঝিনি নিজেদের রুম নিজেদের পরিষ্কার করতে হবে। এখানে আমাদের জন্য কাজের লোক নেই, যে আমাদের জন্য রুম পরিষ্কার করবে। রুমের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রতিদিন একজন করে রুম পরিষ্কার করবে। রুমে ১৬ জন সদস্য, তাই ষোলদিন পর পর একবার হাউজকিপিং (রুম পরিষ্কার) করতে হবে। আর সিকিউরিটি রুম পরিদর্শন করতে আসার আগের দিন সবাই মিলে রুম পরিষ্কার করব। সেভাবেই রুটিনমাফিক চলছে রুম পরিষ্কারের কাজ৷

রুটিনমাফিক আজ আমার হাউজকিপিং, তাই বাধ্যতামূলকভাবে আমাকে হাউজকিপিং করতেই হবে। নিয়ম হল, কেউ যদি কোনো কারণবশত হাউজকিপিং করতে না পারে, তাহলে তাকে অন্য কারো সাথে এক্সচেঞ্জ করে নিতে হবে। আমি যেহেতু কারো সাথে এক্সচেঞ্জ করিনি, তাই আমাকে হাউজকিপিং করতে হবে।

অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। গা থেকে কম্বল সরাতেই শীতে গা ছমছম করে উঠল। কম্বল জড়িয়ে বসে রইলাম। আমাকে বসে থাকতে দেখে রুম লিডার এগিয়ে এসে বললেন, ভাই আপনি কি অসুস্থ? আমি কিছু বলতে পারলাম না। তার দিকে তাকিয়ে আছি। সে এগিয়ে এসে কপালে হাত দিয়ে বললেন, গা গরম। আপনার শরীরে তো জ্বর। আপনি ওষুধ খেয়ে রেস্ট নিন। আমি আপনার হাউজকিপিং করে দিচ্ছি। তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভাই শীত করছে, ফ্যানটা কি বন্ধ করা যাবে?

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের কম্বল এনে আমাকে দিয়ে বললেন, আপনি এবার দুটি কম্বল জড়িয়ে শুয়ে থাকুন। আশা করি এবার শীত কম করবে। আপনার জন্য ফ্যান বন্ধ করে অন্য সবাইকে তো গরমে কষ্ট দিতে পারি না। আমি আর কথা বাড়ালাম না। আমি চাই না আমার জন্য অন্যরা কষ্ট করুক। কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। রুম লিডার আমার হাউজকিপিং করছে, আর আমি কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছি।

ওমর ফারুকী শিপন/সিঙ্গাপুর প্রবাসী/এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com