হায়রে প্রবাস জীবন, শেষবারের মতো মাকেও দেখতে পেলাম না

ওমর ফারুকী শিপন
ওমর ফারুকী শিপন ওমর ফারুকী শিপন , সিঙ্গাপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:০১ এএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৯

ডিউটি থেকে ফিরে রান্না শেষ করে খাবার সামনে নিয়ে বসেছি, এমন সময় মোবাইলে কল বেজে উঠল। আগে খাব নাকি কল রিসিভ করব এই নিয়ে দোটানায় পড়ে গেলাম। খাবার শেষ করে কল রিসিভ করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু রুমমেট একজন চেচিয়ে বলল ‘হয় ফোন রিসিভ করেন, নয়ত রিংটোন বন্ধ করেন, আপনার মোবাইলের রিংটোনে আমার সমস্যা হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই খাবারে হাত না দিয়ে কল রিসিভ করলাম।

-হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।
ফোনের ওপাশ থেকে কোনো কথার শব্দ এল না শুধু কান্নার আর্তনাদ শুনতে পেলাম। আমার বুঝতে বাকি রইল না কি হয়েছে। শুধু করুণ কণ্ঠে বললাম ‘দুলাভাই মা কয়টা বাজে মারা গেছে?

উনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, বিকেল তিনটায়, আপনি ডিউটিতে ছিলেন। তাই বিকেলে জানাইনি। আমি আর কথা বাড়াতে পারলাম না। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। আমার কান্না দেখে রুমমেট সবাই আমার পাশে এসে দাঁড়াল। একজন কাঁধে চাপ দিয়ে জানতে চাইল কি হইছে ভাইয়া ‘আমি কোনো রকমে বললাম, আমার মা মারা গেছেন। কথাটা বলতে গিয়ে মনে হলো গলার ভেতর শক্ত কিছু দলা পাকিয়ে কণ্ঠরোধ করে দিচ্ছে। আমি কাঁদতে চাইছি না কিন্তু হাউমাউ করে কান্না চলে আসছে। কান্নায় এত তৃপ্তি এই প্রথম টের পেলাম।

আমার কান্না দেখে উপস্থিত সবার চোখেও জল ছলছল করছে। মানুষ নাকি অনুকরণীয় প্রাণী কাউকে কাঁদতে দেখলে সেও কাঁদে হাসতে দেখলে সেও হাসে। আমার কেন কান্না আসছে বুঝতে পারছি না, মা দীর্ঘদিন গুরুতর অসুস্থ (কোমায়) ছিলেন তার পুরো শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল। শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক ছিল। স্ট্রোক হবার পর মাকে সুস্থ করার জন্য আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাই করি। পর্যায়ক্রমে মোট ৫টি হাসপাতালে মায়ের চিকিৎসা চলে।

সর্বশেষ চিকিৎসা করানো হয় ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর ডাক্তার যখন বললেন, মায়ের স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। আমাদের চিকিৎসা শেষ, এখন শুধু দোয়া করেন আর মিরাকলের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই।

তখন বাধ্য হয়ে কোমা অবস্থায় মাকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। খাবার দাবার, প্রশাব পায়খানা চলছিল কৃত্রিমভাবে। তাই পরিবারের সবাই মায়ের সেবা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল। সবার চোখে মুখে এক ধরনের বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেছিল। কেউ মুখে মুখেই বিরক্ত প্রকাশ করছে কেউবা আচার ব্যবহার, মুখের ভাবভঙ্গিতে তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মা মরে যাক।

মা মরে গেলেই আমাদের মুক্তি, এই অবর্ণনীয় কষ্টের চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো মনে করেছিলাম। প্রতিদিন মায়ের মৃত্যু কামনা করে, নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করতাম হে আল্লাহ! হয় মাকে সুস্থ করে দাও নয়ত এই কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে নিয়ে যাও। অথচ এখন আমি কাঁদছি। মা নেই, ভাবতেই পারছি না।

কিছুক্ষণ পর সবাই যার যার কাজে চলে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে গ্রামে চলে আসি। কল্পনা শক্তির চেয়ে ক্ষমতাবান কিছু হতে পারে না। কোনো টিকেট ভিসা ছাড়াই কল্পনা শক্তিতে সারা বিশ্ব এমনকি চাঁদের দেশেও ঘুরে বেড়ানো যায়।

গ্রামের প্রবেশ পথে পা দিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। কি আশ্চর্য আমার বুকের ভেতর প্রবল জলোচ্ছ্বাসে সবকিছু লণ্ডভণ্ড। অথচ বাহিরের পৃথিবীতে কোনো পরিবর্তন হয়নি, হাটের ভাসবান দোকানিরা মালপত্র গুছিয়ে হিসেব করছেন। মুদির দোকানিরা আগরবাতি
জ্বালিয়ে সন্ধ্যাকে আগত জানাচ্ছেন।

অদূরে মসজিদে মুসল্লিরা অজু করে নামাজে দাঁড়িয়েছেন। কষ্টে জর্জরিত, রোগী, অনাহারক্লিষ্ট মানুষগুলো সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করছে একটু পরিত্রাণ পাবার জন্য।

মাতালরা মদভর্তি গ্লাস হাতে জ্ঞানগর্ব ভাষণ
দিচ্ছে, জুয়ারিরা লাভক্ষতির হিসেব করছে।
প্রকৃতিপ্রেমিরা সন্ধ্যার অপূর্ব আকাশ দেখে
আনন্দিত হয়ে বলছে আহা! কি অপূর্ব এই
পৃথিবী! কী মনোরম দৃশ্য!

গ্রামের রমনীরা সন্ধ্যা বাতি জ্বালাচ্ছে,
কেউ কেউ রান্না ঘরের পাশে বসে ছাই
দিয়ে মাছ কুটছে, গৃহপালিত পাখি মুরগিগুলো দলবল নিয়ে কিচকিচ শব্দ করে খোয়ারে প্রবেশ করছে। বয়োজ্যেষ্ঠরা প্রার্থনা করছে, ছাত্রছাত্রীরা পড়ার টেবিলে পড়ার আয়োজন করছে।

এই যে সন্ধ্যা, আলো অন্ধকার চলছে স্ব স্ব নিয়মে এত বড় পৃথিবী প্রকৃতির কোথাও কোনো
পরিবর্তন হয়নি, সব চলছে প্রকৃতির নিয়মে
অথচ আমার ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত।

বাড়িতে পা দিয়েই আগরবাতির গন্ধ পেলাম।
যে আগরবাতির গন্ধে মৃতদেহের পাশাপাশি উপস্থিত প্রাণীবাচক সমস্তবস্তু, মৃতদেহের প্রতি নিবেদনচিত্ত হয়। আর যে গন্ধ গোপনে সবাইকে একটি বার্তা দিতে চায় প্রস্তুত থেকো যে কোনো সময় তোমার গৃহেও হানা দিব।

ভাই উঠেন খেয়ে নিন। রুমমেটের গলার আওয়াজে মাত্র এক পলকে স্বস্থানে ফিরে আসি। রুমমেটের প্রতি প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। তার জন্য মায়ের মুখটা দেখা হল না। কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়ে সব অভিমান ভুলে বললাম, ভাই খাব না, আপনারা খেয়ে নিন।

তড়িঘড়ি করে উঠে অজু করে জায়নামাজ নিয়ে বসে পড়ি। নামাজ শেষে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত ধরে ইচ্ছেমতো কান্নাকাটি করে বলি, হে আল্লাহ আমার মাকে জান্নাতবাসী করুন।

ওমর ফারুকী শিপন/সিঙ্গাপুর প্রবাসী/এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com