ঠাকুরবাড়ির রাস্তা

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৫৭ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৯

 

ঠাকুরবাড়ি থেকে রফিকুলের মেজ ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌঁড়ে এসে বলল, ও আপা ঘটনা এটটা ঘটিছে!
কি ঘটেছে তাড়াতাড়ি ক,
আরে ওই ঠাকুরবাড়ি!
ঠাকুর বাড়ি কি হয়েছে?

ঠাকুরবাড়ির নতুন জামাই পরিমল আছে না?
হ, আছে তো!
ওই পরিমল বাবু, কাবু হয়ে গেছে।
সিডা আবার কেমন করে হলো? শুনিছি বিটাই নাকি ভালো মানুষ।

বিচারা পরিমল বাবু খিয়াঘাটের কাদার মধ্যে পড়ে পায়ের একখান জুতো হারায় গেইছে! এই নিয়েতো কি এক হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটিছে।
বেচারা এত খোঁজা খুঁজিছে যে কোনো জাগায় জুতোর হোদিস পাইনি!

তারপর কি হলো?
কি আর হোবে! একখান জুতো নিয়ে নতুন জামাই শ্বশুর বাড়ি হাজির আইছে!
তা-ই দেইহে ঠাকুরবাড়ির বউরা হাসে আর হাসে। লজ্জায় একজনে আরেকজোনের দিক তাকায়, কেউ কিছু কয় না!

পরিমল বাবুর শাউড়ি লজ্জায় রান্নাঘরেত্তে বাইর হোতিছে না। গ্রামের মানুষ জানে ওই মহিলার লাজলজ্জা এট্টু বেশি, তারপরে জামাইর এই লেজেগোবরে অবস্থা দেহে এ্যাহেবারে চুপসে গেইছে।

পরিমল বাবু যেই লজ্জা-শরম পাইছে তাচ্ছে তার শাউড়ি বেশি লজ্জা-সরম পাইছে।
আমার মনে হয় কি আপা!
কি?
এই বর্ষা বিদায় হলি আরেটটা বর্ষা আসলিও বেচারা পরিমল বাবুর শাউড়ি, পরিমল বাবুর সামনে দেহা-ট্যাহা মনে হয় দেবে নানে!

বেচারা পরিমল বাবুর নতুন বউ, জামাইর কাদামাখা শোরিল দেইয়ে চিন্তি না পাইরে ঘরের মধ্যি শুয়ে শুয়ে কান্তিছে!
বাড়ির বউঝিরা তারে অনেক বুঝাতিছে সে কারোর কথা শুন্তিছে না। শুধু কান্তিছে আর কান্তিছে!

দেহা না দিলি তুই পরিমল বাবুরে সাথে নিয়ে ওই বিটিরে ঘরেত্তে ‘শাউড়িবরণ’ কইরে বাইর করিস।
ও আপা, তোরে এমন এটটা জ্যান্ত খবর দিলাম আর তুই এমন কোতিছিস কেন?
আচ্ছা, তোরে আর কিছু কবো না।
আমরা হাসাহাসি কোত্তিছি দাদী শুনলি ঘরবাড়ি মাথায় উঠোবানে। এহন তুই আমার সাম্নেত্তে দূর হ।

ভাইয়ের মুখে ঠাকুরবাড়ির নতুন জামাইয়ের জুতা হারানোর কথা শুনে ভানু ওড়নার আঁচলে মুখ ঢেকে হেসেই কুটিকুটি। ভানুও যেন হাসি থামাতেই পারছে না। হাসতে হাসতে একবার ঘরে ঢোকে আরেকবার বাহিরে যায়।

ভানুর হাসির শব্দ রান্নাঘরের চাটাই-এর ফাঁক গলে তহুরা বেগমের কর্ণকুহরে পৌছানোর সাথে-সাথেই তহুরা বেগম রেগেমেগে বজ্রকণ্ঠে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল।

ফাজিল ছিমড়ি কুয়ানকার! বয়েস কি তোর দিনদিন কোমতিছে? খালি ফ্যাল-ফ্যালায়ে হাসিস!
এ্যাতো যদি গতরে বিগেড় ওঠে তাইলি; থাল-বাটি কয়ডা ধুয়ে দে।

দাদির কথায় ভানুর কিচ্ছু যায় আসে না। হাসি যেন থামাতেই পারছে না। বাবার খুব আদরের মেয়ে ভানু। ভানুর বাবা ভানুকে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলে শাসন করেনি।

রফিকুল্লাহ কখনো মেয়েটাকে নিজের চোখের নজর এড়িয়ে থাকতে পারেনি। মেয়েটা হলো তার প্রাণ। ভানুকে একপলক দেখলে প্রাণটা যেন তার ঠাণ্ডা হয়।

ভানুর জন্মের পর থেকে এগারো-বার বছর বয়স পর্যন্ত রোগব্যাধিতে কম ভোগান ভোগায়নি। ফকির, কবিরাজও কম দেখায়নি। ঝড়-বৃষ্টি কাদা ভরা রাস্তা কোনকিছুতেই থামাতে পারেনি। যে যেখানে ডাক্তার কবিরাজের কথা বলেছে, সেখানে ভানুকে নিয়ে গেছে। রোগা-পাতলা ভানুও আর কম জ্বালায়নি।

সব রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পেয়ে ভানু এখন পূর্ণ যৌবনবতী।

রজব আলী নিশিকান্তকে বলল, রাস্তাঘাটের যা অবস্থা দেখতিছি তাতে গরু বাছুর কি কোইরে হাঁটে নেব!
দুধের গরুডা বেইচে দিয়ে বড়ো এটটা ভুল কোরিছি; এ্যাহোন যে কয়ডা আছে এটটাও জাতের গরু না! হাতে কোনো টাহা-পয়সা নেই,। ভাবতিছি এটটা গরু বেইচে দেবো...!

এভাবে আর কয়দিন চোলতি পারে? শিল পইড়ে ক্ষ্যাতের ফসলের ক্ষতিডা হইছে তা পুশাবানি কইরে। চিন্তাভাবনা কোরিছি এবার ফসলটসল হবানে! ঝড়ে যে ক্ষ্যাতিডা কোরিছে তাতে ফসল দূরি থাক, খ্যাড় পাবানি কি-না চিন্তা হতিছে।

গিরামের যা অবস্তা, রিক্সা-ভ্যান কিছুই গিরামে ঢুকতি পাত্তিছে না।
শুনিছি গুদারা ঘাটের রফিকুল্লার ছল মিজান নাহি বাড়িতে আইছে...তা খবরটবর কিছু আছে নাহি? রফিকুল্লাহ্ কতো...খাটা খাইটে ছলডারে শহরে পাঠাইছে লিয়াপড়া শিখাতি
হ রজব, ছোলডা শুনিছি ভালো মানুষ।
ওরা শহরে মানুষ হতি পাল্লিই ভালো। এই গিরামে আইসে কাদার মদ্দি আছাড় খাওয়ার দরকারডা কি!

ওসব কথা থোও রফিক,
কী এক কাণ্ড ঘটিছে সেইডা শোনো!
আমিও কেমোন য্যানো এটটু শুনিছি! ঠিকমোতো কোতি পাত্তিছিনে।
কী হইছে এটটু খুইলে কওদি!
গিরামের মানুষ সবাই শুনিছে আর তুমি শোনোনি!
আমি শুনতি পাল্লি তুমার কাছে জানতি চাতাম নাকি!
কি হইছে কও!

ঠাকুরবাড়ির নোতুন জামাই কাদার মোধ্যি পইড়ে গেইছে! গিরামের মানুষ বলাকওয়া কোরতিছে সেহেন্দ শুনে আসলাম।
কাদায় পোড়িছে পড় তাতে তো কিছু হোইনি!

আরে ওই রাস্তায় কাদার মদ্দি পোড়িনি এমন কেউ আছে নাহি? এইডে নোতুন কিছু নাহি। পুরোনো হয়ে গেইছে।

কাদার মোধ্যি পড়বি পড় তাতে কিছু না। বোলে পার একখান জুতো হারাই গেইছে! এই নিয়ে গিরামের মানুষ সেকি হাসাহাসি কোত্তিছে।

শোন রফিক, তোরা কি ভাবিছিস? ঠাকুরবাড়ির কাদার মোধ্যি পইড়ে যা কি থাইমে গেইছে! কাদার ধারে নোতুন জামাই আর পুরোনো জামাই একরহম। আরো কতোকিছু হারায়ে জাবানে সেই কথা ভাবতি থাহো।

আরো কতো ভুগান্তি হবানে এই রাস্তাডা নিয়ে তার কোনো শ্যাষ কোতি পাত্তিছি নে! রাস্তাডা কবে আর ভালো হোতি পারবে? ঠাকুরবাড়ির রাস্তাডা মোনে হয় আর পাকা হবে নানে! পাকা যোদি হতো তার ভাবটাব কিছু বুছত্তি পাত্তাম। তুমি-আমি কতো ধন্না দিছি মেমবরের ধারে। ঝড়-বর্ষায় কোচুর পাতা মাতায় দিয়ে ভিজতি ভিজতি গেইছি। সেই কথা মোনে পোল্লি দুঃখু বাড়ে!

রাস্তার চিন্তা-টিন্তা ছাড়ান দিছি। রাস্তাডা পাকা হওয়া বাঁইচে থাকতি মোনে হয় আর দেখতি-টেকতি পারবোনানে!

রজব আলীর হাটে যাওয়ার বেলা বয়ে যাচ্ছে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘলা আকাশে ছেয়ে গেছে চারিদিক। ঠাকুরবাড়ির রাস্তা হাটু-কাদায় ভরে গেছে। বাজারের ব্যাগ হাতে রজব আলী উঠানে দাঁড়িয়ে রইল।

সাইফ তমাল, সিঙ্গাপুর থেকে/এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com