হতভাগা প্রবাসী বলেই বউয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে থাকতে পারিনি

ওমর ফারুকী শিপন
ওমর ফারুকী শিপন ওমর ফারুকী শিপন , সিঙ্গাপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০১:৩৪ পিএম, ২২ নভেম্বর ২০১৯

একাকীত্ব যখন অক্টোপাসের মতো চারপাশ থেকে আমাকে ঘিরে ধরে, তখন কেউ পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে বলে বলে না, তুমি একা নও আমি তো আছি পাশে। কিন্তু এই এমন একজনকে খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। সবাই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ততম দিন পার করে। দিনশেষে তারা উপলব্ধি করে আসলে তারাও আমার মতো একা।

রাত্রীতে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে যখন নির্ঘুম রাত কাটাই, তখন কেউ পাশে বসে আদুরে গলায় বলে না। তুমি ঘুমাও তোমার কষ্টগুলোকে আমি পাহারা দেই। কেউ ভালোবাসার পরশে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না। শুধু আমি না প্রতিটি প্রবাসী হয়ত বিছানায় শুয়ে এমনটাই উপলব্ধি করেন।

তবে কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের প্রথম দর্শনেই খুব আপন মনে হয়, তাদের চেহারার সাথে পরিচিত কারো চেহারার সাথে মিল খোঁজার চেষ্টা করি। ইচ্ছে করে তাদের ডেকে সুখ দু:খের আলাপ করি। বুকের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো মনপ্রাণ উজাড় করে তার সাথে শেয়ার করি।

আমার রুমমেট আক্তার। তারসাথে সবসময় নিজের কষ্টগুলো শেয়ার করতাম, তার সাথে খুব আনন্দঘন মুহূর্ত কাটাতাম। নিজের কষ্ট অন্যের সাথে শেয়ার করলে নিজেকে একটু হালকা মনে হয়। কিন্তু আক্তার ভাই আগের মত মন খুলে কথা বলেন না। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহসও হয় না।

বহুদিন পর গতকাল তিনি মন খুলে আমার সাথে কথা বললেন। আমার পাশে বসে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ওমর ভাই আমি আপনার মতো মনের কষ্টগুলো লিখতে পারি না। তাই বুকের মধ্যে জমে থাকা কষ্টগুলো দিনে দিনে পাহাড়সম ভারী হচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

আমি তার কষ্টগুলোর কথা কিছুটা জানি, কিন্তু আমি তার মত করে উপলব্ধি করতে পারছি না। যার কষ্ট সেই বুঝে তা বহন করা কতটা কষ্টকর। তবুও তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, ভাই আপনার কষ্টগুলো আমার সাথে শেয়ার করুন তাহলে কিছুটা হালকা হবে।

তিন বললেন, দুই বছর আগে বিয়ে করি। বিয়ের পর দিনগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর আমার মা টয়লেটে পা পিছলে পড়ে মারাত্নক আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার এক সাইট প্যারালাইজড হয়ে যায়। চিন্তা ছিল বউকে দুই মাসের জন্য সিঙ্গাপুর নিয়ে আসব কিন্তু মায়ের অসুস্থতার কারনে সে চিন্তা বাদ দেই। বউ দিনরাত মায়ের সেবা করতে থাকে।

কিন্ত তার কিছুদিন পরই মা মারা যান। মায়ের মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়ি। জরুরি ছুটি নিয়ে ছুটে যাই দেশে। বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স ছিল খুবই কম। তাই আমার সমস্ত ভালোবাসা ছিল মাকে ঘিরে। সেই মা যখন চলে গেল তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল এই পৃথিবীতে আমি একা, ভীষন একা।

শোক কাটিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু আমি শোক ছাড়লেও শোক আমাকে ছাড়ল না। তার অল্পদিন পরই আমার ভগ্নিপতি মারা যান। একে একে দুইটা শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চেষ্টা করলাম। কিছুদিন পর শুনি আমার বউ গর্ভবতী।

নিজে সন্তানের পিতা হব এই আনন্দে পুরনো শোকে কিছু প্রলেপ দেওয়া গেল কিন্তু মন থেকে মায়ের স্মৃতি, ভগ্নিপতির স্মৃতি মুছতে পারলাম না।

অনাগত সন্তানকে ঘিরে বিভিন্ন রঙ্গিন স্বপ্ন আঁকতে থাকি। উপলব্ধি করি পৃথিবীতে পিতা হবার আনন্দের চাইতে পুরুষের জীবনে এমন তীব্র আনন্দ আর নাই। সন্তানের পিতা হব ভাবতেই মনের মধ্যে সুখ অনুভব করতাম।

কোম্পানি থেকে ছুটি না দেওয়ায় বউয়ের সন্তান ভুমিষ্ট হবার সময় দেশে যেতে পারলাম না। ভেবেছিলাম সন্তান ভুমিষ্টের পরই দেশে যাব।

বউয়ের প্রসব বেদনা উঠলে তাকে হাসপাতালে শিফট করা হয়। ডাক্তাররা বলল সিজার করাতে হবে। কিন্তু আমার পরিবারের কেউ সিজার করাতে রাজি হলো না। এমনকি আমিও না। নরমালে সন্তান ভুমিষ্টের আশায় আমিও আশায় বুক বেধে আছি৷

সন্তান ভুমিষ্ট হলো তবে সে আমার জীবনে সবচেয়ে কষ্টকর স্মৃতি নিয়ে এলো। একজন পিতার কাছে তার মৃত সন্তানের চেয়ে আর কষ্টকর কি হতে পারে৷ আমার মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে, এই সংবাদ শোনার পর আমি চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি। সন্তানের মৃত্যু সংবাদ পিতামাতার জীবনে সবচেয়ে কষ্টদায়ক৷ জীবনে সব কষ্ট বহন করা যায় কিন্তু সন্তানের মৃত সংবাদ বহন করা যায় না।

আমি আক্তার ভাইয়ের দিকে তাকালাম৷ তার মৃত সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে এই প্রথম শুনলাম। সে এতবড় কষ্টকর সংবাদ কিভাবে বুকে চেপে রেখেছিল!

সে বলতে লাগল, ভাই আমার জীবনে কেন এত কষ্ট বুঝতে পারছি না। একজন মেয়ে সন্তান প্রসবের সময় চায় তার স্বামী তার পাশে থাকুক। তার স্বামীই প্রথম তার সন্তানকে কোলে তুলে নিক। আমি হতভাগা প্রবাসী তাই বউয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার পাশে থাকতে পারিনি। এর চেয়ে কষ্ট জীবনে বুঝি আর নাই। নিজেকে নিজে ক্ষমা করতে পারছি না।

আমি আক্তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি তার দুচোখে নোলা জল গড়িয়ে পড়ছে৷ এতদিন মনে হয়েছিল শুধু আমিই কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছি। এখন তার দিকে তাকিয়ে মনে হয়ে শুধু আমি না প্রতিটি প্রবাসী কষ্টের পাহাড় বুকে চেপে বেড়ায়।

প্রকৃতপক্ষে দিনশেষে আমরা প্রবাসীরা একাকী, পরবাসের এই যাপিত জীবনে সবাই একাকী।

এমআরএম/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]