প্রবাসীর আক্ষেপ

ওমর ফারুকী শিপন
ওমর ফারুকী শিপন ওমর ফারুকী শিপন , সিঙ্গাপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০১:৫৬ পিএম, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

অনেকেই আমাকে আজকাল জিজ্ঞেস করে গ্রাজুয়েশন করে কামলা দিতে সিঙ্গাপুর এলাম কেন? তাদের প্রশ্নের জবাবে লাজুক একটি হাসি দেওয়া ছাড়া কিছুই বলার থাকে না। প্রশ্নটা যথার্থ, তাই পালটা প্রশ্নও করতে পারি না।

তাদের কী করে বলি একটা সময় আমার স্বপ্ন ছিল আমি দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে যোগদান করে দেশের সেবা করব। শুধু আমি না আমার পরিবারের সকলের স্বপ্ন ছিল আমি যেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে যোগাযোগ করি। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজেপি যেকোন একটি বাহিনীতে যোগদান করলেই হবে। আমার ভাইবোনদের মধ্যে আমি একটু লম্বা ছিলাম তাই আমার পরিবার এমনটি চেয়েছিলেন।

আর এই স্বপ্ন পূরণে এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়ার পরপরই শুরু হয় আমার সংগ্রাম। প্রথমে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে ইন্টারভিউ দিই। শারীরিক মাপসহ সকল পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হই কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় গিয়ে অযোগ্য বলে ঘোষণা করে আমাকে।

এরপর আর থেমে থাকি না যেকোন বাহিনীর নিয়োগ বিজ্ঞাপন পেলেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে আগের ব্যর্থতাকে ভুলে নতুন উদ্যোমে ইন্টারভিউ দিতে যাই। সব জায়গায় একই শারীরিক যোগ্যতায় উর্ত্তীণ হই। লিখিত পরীক্ষায়ও উর্ত্তীণ হই কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় আমাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। আমাকে বারবার ব্যর্থ হতে দেখে এক বন্ধু বলল, তোর পরিবারে কি কোনো মুক্তিযোদ্ধা আছে?
আমি বলি না।

তোর পরিবারে কি কোনো সরকারি চাকরিজীবি আছে?
আমি বলি না।

তোর বাবার কি দশ লাখ টাকা দেবার ক্ষমতা আছে?
আমি বলি না। আমার বাবা আমাকে পড়ালেখার খরচ বাবদ একশ টাকা দিতে পারে না। আবার দেবে দশ লাখ। বন্ধু নিরাশ হয়ে বলল তাহলে বাদ দে সরকারি চাকরির চিন্তা। এখন সরকারি চাকরি পেতে হলে কোটা থাকতে হবে নইলে কয়েক লাখ টাকা দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। এ ছাড়া চাকরির জন্য সুপারিশ করার মতো কেউ থাকতে হবে।

বন্ধুর কথায় আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। আমার স্বপ্ন পূরণ হবে না তা কি করে হয়। আমাকে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখে এক বন্ধু বলল, রেলওয়ে লোক নিয়োগ দেবে। তুই যদি পাঁচ লাখ টাকা যোগাড় করতে পারিস তাহলে আমি তোর জন্য কিছু একটা করতে পারব। আমি বাড়িতে এই বাম্পার অফারের কথা জানাই। আমার কথা শুনে মা-বাবা বলেন, ঘুষ দিয়ে চাকরি নিয়ে তুই কি করবি তুইও ঘুষ খাবি। তাহলে তোর আর ঘুষখোরের মধ্যে পার্থক্য রইল কই? নিজেকে অন্যায় কাজ করাও লাগবে না আর আমাদের হারাম উপার্জন খাওয়ানোও লাগব না ।

নিজেকে নিয়ে যত না চিন্তিত হই তাচেয়ে বেশি চিন্তিত হই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। আমার জীবন তো এভাবে কেটে যাবে কিন্তু আমার পরিবর্তী প্রজন্ম তারাও কি কোটা প্রথার কাছে জিম্মি হয়ে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হবে। পৌষ্য কোটা নামে একটা কোটা আছে সরকারি চাকরিজীবির সন্তান সরকারি চাকরি পাবে। তার মানে যে পরিবারে কোনো সরকারি চাকরিজীবি নাই সে পরিবারে সরকারি চাকরি পেতে অর্থের প্রয়োজন হবে।আমাকে তাহলে আমার পরিবর্তী প্রজন্মের জন্য ঘুষের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ রেখে যেতে হবে ।

এরপর পড়ালেখায় পুরোদমে মন দেই। এবার জীবনের লক্ষ্য পরিবর্তন করি।কোন বাহিনীতে নয় কিংবা সরকারি চাকরি নয় এবার লক্ষ্য স্থির করি একজন আইনজীবী হব।কিন্তু সেই স্বপ্নও ভেঙ্গে যায় হঠাৎ মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় ।আমার জন্য চাকরিতে সুপারিশ করার মতো কেউ নেই। আমার জন্য কোনো কোটা নেই। আমার বাবার অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেবার ক্ষমতা নেই, তাই বাধ্য হয়ে প্রবাসের পথে পা বাড়াই।

দেশে কোটা প্রথা কিংবা অর্থের বিনিময়ে সরকারি নিয়োগ যদি না থাকত তাহলে আমি হয়ত দেশেই মোটামুটি একটা কিছু করতে পারতাম। শুধু আমি না আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের হাজার হাজার ছেলেদের গ্রাজুয়েশন করে প্রবাসে এসে কামলা দিতে হত না।আমি যখন প্রবাসে আসি তখন আমার সাথে পঁয়তাল্লিশ জন ছেলে আসে সবাই ডিপ্লোমাধারী কিংবা ডিগ্রীধারী। দেশের মেধাবীদের এত অপচয় দেখে সেদিন ব্যথিত হয়েছিলাম। এখন সেই পঁয়তাল্লিশ জন মেধাবী বিদেশে বিভিন্ন কোম্পানীতে সুনামের সহিত কর্মরত আছে।কিছুদিন পর এরা প্রবাসে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেয়ে যাবে।অথচ এরা দেশে থাকলে দেশ উপকৃত হত ।

দেশে মেধাবীদের সৎ ব্যবহার করতে চাইলে এখনই কোটা প্রথা সংস্কার করা জরুরী তার পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াও বন্ধ করাও জরুরী ।অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে আমার মত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য কোটা সংস্কার কোন কাজে আসবে না ।

কোটা প্রথা কিংবা অর্থের বিনিময়ে এভাবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ অব্যাহত থাকলে একটা সময় দেখা যাবে অযোগ্যরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছে। সুস্থ সুন্দর দেশের জন্য আজই চাই কোটা প্রথার সংস্কার হোক ও পাশাপাশিঅর্থের বিনিময়ে চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হোক।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]