নিজের প্রেম স্বর্গীয়, অন্যের হলে সমাজবিরোধী

ওমর ফারুকী শিপন
ওমর ফারুকী শিপন ওমর ফারুকী শিপন , সিঙ্গাপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:১৮ এএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২০

রাত দশটায় ভিজে জবুথবু হয়ে বোনের বাসায় হাজির হই। থরথর করে কাঁপছি। বোন তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে দিচ্ছে আর বকাঝকা করছে। আমি মুখে কোনো কথা বলতে পারছি না। কিছুক্ষণ পর শরীর গরম হলে বোনকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ি। বোন ভগ্নিপতি আমার মুখে মাহফুজার কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারা কোনোমতেই বাবার সামনে আমার বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারবে না। এবার আমি বোন ও ভগ্নিপতির পায়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লে দু’জনের সম্মতি দেয়।

তাদের নিয়ে বাড়িতে হাজির হই। মা-বাবা সব শুনে আমাকে গালাগাল দিতে থাকে। বাবা রেগে ঘর থেকে বের হয়ে যান। আমি কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। আমি শুধু মাহফুজাকে চাই। দুই বোন আর ভগ্নিপতিদের অনুরোধে মা-বাবা রাজি হলেন। তারা আমার সুখের জন্য মাহফুজার সাথে বিয়ে দেবেন।

বিকেলে মাহফুজাদের বাড়ি গিয়ে হাজির হই। আমি সবাইকে মাহফুজার মা-বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমার রুমে চলে আসি। মুরুব্বীরা আমার বিয়ের কথা বলবে সেখানে আমার না থাকাই ভালো। কিন্তু রুমে আমার মন টিকছে না। তাদের মাঝে কী আলাপ হচ্ছে তা শোনার জন্য আড়ালে দাঁড়ালাম।

আমি ভেবেছিলাম মাহফুজার মা-বাবা বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করে তাদের কন্যাকে আমার হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু না তারা আমার সাথে তাদের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাবের কথা শুনে রেগে গেলেন। শুধু তাই নয়, মা-বাবা ও দুই বোনসহ সবাইকে অপমান করতে শুরু করলেন। আমি মা-বাবার অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজের রুমে চলে আসি। একটু পর মাহফুজার বড় ভাই আমার রুমে এসে বলল, তোর সাহস তো কম না আমার বোনকে বিয়ে করতে চাস? তোর এতবড় সাহস হলো কী করে?

এতদিন সে আমাকে ভাই ছাড়া কথায় বলতো না। আজ সে তুই বলে সম্বোধন করছে। ভালোবাসা আজ আমাকে কোথায় থেকে কোথায় এনে দাঁড় করাল। ছিলাম রাজকীয়ভাবে আর এখন কীটপতঙ্গ হয়ে গেলাম। সে দুই হাতের তালুতে আমাকে পিষিয়ে ফেলবে এমনটা মনে হচ্ছে।

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে এবার গালি দিয়ে বলল, কিছু বলিস না কেন। এভাবে তাকিয়ে কি বুঝাতে চাস? মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে তবুও আমি তার আচরণে ঘেমে একাকার। আমি তাকে কী বলব বুঝে উঠতে না পেরে আকুতি করে বললাম, ভাই আমি মাহফুজাকে ভালোবাসি তাকে ছাড়া বাঁচব না।

আমার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে সে ধমক দিয়ে বলল, তুই এখন রুম থেকে বের হবি। এ জীবনে আর এদিকে আসবি না। এই বাড়ির আশপাশে তোকে দেখলে হাত পা ভেঙে ফেলব। আমি তার দিকে তাকিয়ে মাথানত করি দাঁড়িয়ে আছি। কি অদ্ভুত আমরা। আজ যদি সে আমার জায়গায় হতো তাহলে সে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য নানা যুক্তি হাজির করত। ভালোবাসাকে মহান বলে ব্যাখ্যা করত অথচ আজ তাদের চোখে ভালোবাসা অপরাধ ও গর্হিত কাজ। নিজেরা করলে পবিত্র কাজ।

মানুষ যখন নিজে প্রেম করে তখন প্রেম স্বর্গ থেকে আসে। ভাগ্যের লিখন। প্রেম পবিত্র, প্রেম মহান আরও নানা কথা বলে। আবার এই একই প্রেম যখন অন্যেরা করে বা নিজের বোন আত্মীয়র সাথে করে তখন প্রেমটা হয়ে যায় নরক। সমাজবিরোধী কাজ।

এক পর্যায়ে সে আমার গালে চড় বসিয়ে দেয়। গতকাল থেমে ঘুমাতে পারিনি। ঠিকমতো খেতে পারিনি। তাই শরীর খুবই দুর্বল ছিল। তার চড় খেয়ে নিচে পড়ে যাই।

ঠিক সে সময় বোন আর ভগ্নিপতিরা এসে আমাকে বাসায় নিয়ে আসে। বাসায় ফেরার পরও আমি আমার পক্ষে সাফাই গাই। তাদের সাফ জানিয়ে দেই আমি মাহফুজাকে চাই।

এবার বাবা রেগে যান। আমার হাত বা বেঁধে ঘরে ঝুঁলিয়ে ইচ্ছেমতো মারধর করতে থাকেন। তার মারের আঘাতেও মাহফুজাকে ভুলতে পারিনি। আমার সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে শুধু মাহফুজা। মা এসে আমাকে বলে, তোর কথামতো আমরা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়ে অপমানিত হলাম তবুও তোর মন ভরেনি। আমরা তোর সুখের কথা চিন্তা করে বিয়ে করাতে রাজি আছি। তোর সামনে তারা আমাদের অপমান করল। তবুও কোন মুখে তুই এই মেয়ের নাম মুখে আনিস! তোর উচিত এই মেয়েকে ভুলে যাওয়া। যে মেয়ের জন্য তোর মা-বাবাকে অপমানিত হতে হয়। সে মেয়েকে তুই কীভাবে এই বাড়িতে বউ করে আনবি?

আমি তাদের কোনো যুক্তি মানতে রাজি নই। আমার এক কথা আমি মাহফুজাকে চাই। এবার বাবা ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে ঘরে বন্দি করে রাখলেন।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]