যে কারণে আমার ফরাসি জাতীয়তা নামঞ্জুর

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:১৬ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২০

প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র প্রস্তুত করার সাথে সাথে অনলাইনে ডেট নিলাম। এরপর নির্দিষ্ট দিনে ফাইল জমা দিতে হাজিরও হলাম। অফিসার কাগজপত্র পরীক্ষা করে বললেন তোমার ফাইল জমা নিতে পারব না কারণ জন্মসনদে বাংলাদেশের মিনিস্ট্রি থেকে সত্যায়িত করানো হয়নি। সব ঠিকঠাক করে পুনরায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসো।

কি আর করার। দেশ থেকে জন্মসনদ ফরেন মিনিস্ট্রি করিয়ে তা ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করিয়ে ফাইল রেডি করতে ৩ মাস চলে গেল। এরই মাঝে অনেক কাগজের মেয়াদও চলে গিয়েছিল সেগুলোও নতুন করে মেয়াদ বাড়ি নিই। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে পেতে আরও দেড় মাস চলে গেল। যাইহোক অবশেষে পেলাম আর মনে মনে ভাবলাম কাগজপত্রে মনে হয় আর কোনো সমস্যা নেই। সুতরাং আজ ফাইল জমা দিয়েই ছাড়ব।

এরপর অফিসার জন্মসনদ হাতে নিয়েই বললেন ফ্রান্সে তোমার দেশের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসি থেকে সত্যায়িত করানো হীয়নি। তুমি এবারও ফাইল জমা দিতে পারবে না। ফাইল রেডি করে পুনরায় অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে এসো। কিচ্ছু করার নাই নিয়ম অনুযায়ী চলতেই হবে।

প্যারিসের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসি থেকে জন্মসনদ সত্যায়িত করে পুনায় ফরাসী অনুবাদ করে অবশেষে ফাইল রেডি হলো। অনলাইনে অ্যাপয়েনমেন্ট নিতে পারছিলাম না। অনেক কষ্টে ১ মাস পর পেলাম। নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে অবশেষে ফাইল জমা করতে সক্ষম হলাম।

অফিসার আমাকে ফাইল জমা করতে বললেন এবং এবং মেইলের মাধ্যমে ভাইবার ডেট জানিয়ে দেয়া হবে। জানতে চাইলাম কতদিনের ভেতরে জানতে পারব। ২ থেকে ৩ মাস লাগবে। ভাইবার জন্য (Livre de citoyen français) বই টুকটাক পড়লাম। ফ্রান্সের সামাজিক, রাজনৈতিক, কালচার ইত্যাদিসহ জাতীয় সংগীতের কয়েক লাইনও শিখে নিলাম।

ভাইবার জন্য ডাকা হলো। অফিসার ছিল নারী। তার কম্পিউটারে সাময়িক সমস্যা দেখা দিলো। আমার ফাইল ওপেন করতে পারছিল না। তাই রুম চেঞ্জ করে আমাকে অন্যরুমে নিয়ে গেল। তিনি আমার সাথে নরমাল কথা বলতে শুরু করলেন। যেমন আমার মা এখন কোথায়? ভাইবোন কয়জন। আমি কি কখনো আমেরিকা গিয়েছিলাম নাকি? (আমার মা আমেরিকা তাই জিজ্ঞেস করেছে) এর মধ্যে বাংলাদেশে যাব নাকি ইত্যাদি ইত্যাদি ।

অবশেষে কম্পিউটারে আমার ফাইল ওপেন হলো। তিনি আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন। সাথে সাথে তিনি তা কম্পিউটারে সেভ করতে লাগলেন। আমাকে তেমন কঠিন কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। প্রশ্নগুলো এতই সহজ ছিল যে আমি নার্ভাস হয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেললাম। কারণ আমি কঠিন কঠিন প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলাম। যাইহোক প্রশ্ন পর্ব শেষ করে তিনি ফাইল রেডি করে ফ্রান্সের ফরেন মিনিস্ট্রিতে ট্রান্সফার করবেন জানালেন আর সেখান থেকেই রেজাল্ট হবে আমার ফরাসী জাতীয়তার আবেদন মঞ্জুর হবে কিনা। এজন্য অপেক্ষা করতে হবে ১২ থেকে ১৮ মাস। ভাগ্য ভালো হলে তার আগেও রেজাল্ট পেয়ে যেতে পারি জানালেন।

সময়ের দিক থেকে আমার ভাগ্য ভালোই ছিল। মাত্র ৮ মাসের মাথায় রেজাল্ট হয়ে যায়। কারণ ফ্রান্সে আমার দশ বছরের বেশি হওয়ায় পুলিশ অফিসে ডাকা হয়নি আর বাংলাদেশের বা ফ্রান্সের কোনো দেশেরই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স লাগেনি তাই ওদের প্রসেসিং টাইমও কম লাগায় রেজাল্ট আগে আগেই পেয়ে যাই।

বাসায় রেজিস্ট্রি চিঠি পাঠিয়ে ফলাফল জানানো হলো। খাম খুলে চিঠি পড়লাম। আমার ফরাসি জাতীয়তা না মঞ্জুর করা হলো কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলো ফ্রান্সের কর্ম আইন অনুযায়ী আমি কর্মঘণ্টা লঙ্ঘন করেছি। ফরাসী জাতীয়তা পেতে হলে অমার মতো ইমিগ্রেন্ট যারা যাদের সপ্তাহে কমপক্ষে ৩৫ ঘণ্টা আর সর্বোচ্চ ৪৪ ঘণ্টার বেশি বা কম কাজ করা যাবে না। তাদের হিসেবে আমি সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টার বেশি কাজ করেছি। এও উল্লেখ করলেন যে তুমি ২ বছরের মধ্যে আর নতুন করে ফরাসী জাতীয়তার আবেদন করতে পারবে না।

তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে চাইলে ২ মাসের ভেতর আপিল করার সুযোগ আছে। কর্মঘণ্টার জন্য যেহেতু আমার ফরাসী জাতীয়তা না মঞ্জুর হয়েছে এর বিরুদ্ধে আমি আপিল করব। কারণ, কর্মণ্টার জন্য কোনোভাবেই না মঞ্জুর হওয়ার কথা না।

চলবে...

এমআরএম/লুবনা সাবা, প্যারিস থেকে/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]