‘গবেষণা’ যেখানে প্রকাশ করবেন

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:১৩ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২০

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণ। গবেষণা কার্যক্রম থেকে আসে জ্ঞান, অন্যদিকে জ্ঞান বিতরণ হলো, বই, পত্রিকা, জার্নাল ইত্যাদিতে প্রাপ্ত উপলব্ধ অথবা তথ্য স্থানান্তর। দুর্ভাগ্যক্রমে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র জ্ঞান বিতরণে নিযুক্ত রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, জ্ঞান বিতরণ পদ্ধতিতে বাংলাদেশে একটি মধ্যবর্তী স্তরের কলেজ এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদিও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একদল প্রভাষক এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা ‘গবেষণা ও প্রকাশনা’ কাজে জড়িত থাকার চেষ্টা করছেন।

দুর্ভাগ্যক্রমে, সিনিয়র শিক্ষকদের যথাযথ দিক-নির্দেশনা না থাকা, বিশ্ববিদ্যালয় অনুদান কমিশনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা/গাইডেন্স, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে পুরনো সরকারি নীতি ইত্যাদির মতো বিভিন্ন কারণে সেসব গবেষকরা গবেষণার ফলাফল ফেইক জার্নালে প্রকাশ করে থাকে। ফেইক জার্নালে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে একজন গবেষক তার সিভিতে ‘আবর্জনা’ বা ‘অতিরিক্ত বোঝা’ যোগ করা ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কিছুই অর্জন করতে পারে না।

যখন কোনো জার্নালকে ‘Web of Science (Clarivate Analytics)’ or ‘Scopus (Elsevier)’ দ্বারা সূচিযুক্ত না করা হয় তাকে ফেইক জার্নাল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ‘Web of Science’ ইনডেক্সিং প্ল্যাটফর্মটি ‘Science Citation Index (SCI)’ এবং ‘Science Citation Index Expanded (SCIE)’ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল জার্নালের জন্য, এবং ‘Social Science Citation Index (SSCI)’ সামাজিক বিজ্ঞান জার্নালের জন্য।

সংক্ষেপে, ‘SCI, SCIE এবং SSCI’ সূচিত যে কোনো জার্নালকে ‘Institute of Scientific Information (ISI)’ উদ্ধৃত জার্নাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দ্রষ্টব্য, সকল ‘ISI’ উদ্ধৃত জার্নালগুলি ‘Scopus’ দ্বারা সূচিযুক্ত করা হয় তবে সব ‘Scopus’ উদ্ধৃত জার্নালগুলি ‘ISI’ দ্বারা সূচিত হয় না। তবে, সমস্ত ‘ISI’ উদ্ধৃত জার্নালের সাধারণত একটি ন্যুনতম ‘Impact Factor’ থাকে এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

‘ISI’ উদ্ধৃত জার্নালে প্রকাশনা রয়েছে এমন লেখকরা খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম থেকে একাডেমিক চাকরি, পদোন্নতি, বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি ইত্যাদির জন্য অফার পাওয়ার যোগ্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বছরে প্রকাশিত ‘ISI’/‘Scopus’ উদ্ধৃত প্রকাশনার মোট সংখ্যা সেই নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র‌্যাংকিং নির্ধারণের জন্য ব্যারোমিটার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

মনে রাখবেন, ‘Web of Science’ এর আওতায় ‘Emerging Source Citation Index (ESCI)’ তে সূচিত জার্নালকেও ফেইক জার্নাল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নির্দিষ্ট জার্নালের হোমপেজে গিয়ে যে কোনোও জার্নালের সূচকের স্থিতি সহজেই পরীক্ষা করা যায়। যেমন CrossRef, CrossMark, DOI, SAO/NASA.ADS, INSPEC, Google Scholar, Georgetown University (USA), WorldCat libraries, WZB Electronic Journals ইত্যাদি সূচি প্ল্যাটফর্ম যে সকল জার্নালের হোম পৃষ্ঠায় লিখিত রয়েছে তাদেরকে ফেইক জার্নাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উপরন্ত, অনেক ফেইক জার্নালের হোম পৃষ্ঠাতে ‘Impact Factor’ দেখায়। এই ধরনের ‘Impact Factor’ হলো ‘বোগাস’ বা ‘মিথ্যা’। মনে রাখতে হবে, ফেইক জার্নালের মালিকেরা সাধারণত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির গবেষকদের লক্ষ্য করে অগ্রসর হয়। তারা পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার জন্য ব্যক্তিদের কাছে প্রায়শই ই-মেইল প্রেরণ করে এবং প্রকাশনার ফিসহ বা ছাড়াই অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ের মধ্যে গবেষণা পত্র প্রকাশের আশ্বাস দেয়।

মনে রাখা দরকার, কোনো ‘ISI’ জার্নাল কখনই কোনোও পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তিকে ই-মেইল প্রেরণ করে না (আন্তর্জাতিক স্তরের একজন প্রতিষ্ঠিত এবং শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী ব্যতীত)। সম্ভাব্য ফেইক জার্নাল প্রকাশকদের একটি তালিকা এখানে খুঁজে পাবেন

বই প্রকাশের ক্ষেত্রে Nova, Lambert, InTech Open প্রভৃতি বেশ কয়েকটি প্রকাশককে ফেইক প্রকাশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতএব, আপনার কাজগুলি প্রেরণের জন্য বা তাদের অর্থ প্রদানের মাধ্যমে আপনার সময় নষ্ট করবেন না। ফেইক প্রকাশকদের একটি তালিকা এখানে খুঁজে পাবে। এই জাতীয় প্ল্যাটফর্মে আপনার কাজের প্রকাশও সিভিতে ‘আবর্জনা’ বা ‘অতিরিক্ত বোঝা’ যুক্ত করে।

Conference এর ক্ষেত্রে, এখানে সেখানে অনেকগুলি ‘অর্থোপার্জনকারী’ সম্মেলন প্রায়শই অনুষ্ঠিত হয়। এই জাতীয় সম্মেলনের আয়োজকরা তুলনামূলকভাবে খুবই চালাক। তারা সাধারণত বড় শহরগুলিতে, পর্যটকদের জায়গা, হোটেল ইত্যাদিতে এ জাতীয় সম্মেলনের ব্যবস্থা করে থাকে, তাদের মূল উদ্দেশ্য নিবন্ধন ফির নামে ভালো পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা।

সাধারণত WASET, Conference Series, OMICS ইত্যাদি আয়োজকদের সম্মেলনগুলি অর্থোপার্জনকারী সম্মেলন হিসেবে বিবেচিত হয়। সম্ভাব্য অর্থোপার্জনকারী Conference সংগঠকদের একটি তালিকা এখানে খুঁজে পাবেন-

এই জাতীয় সম্মেলনে অংশ নিয়ে কিছু জায়গায় ভ্রমণ ছাড়া আর কোনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করা যায় না এবং এই জাতীয় সম্মেলনে অংশ নেওয়ার রেকর্ড, সিভিতে ‘আবর্জনা’ বা ‘অতিরিক্ত ব্যাগেজ’ যুক্ত করে।

সুপরিচিত বৈজ্ঞানিক সমিতি/শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়/আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি ইত্যাদির দ্বারা যৌথভাবে আয়োজিত সম্মেলনগুলিই ভালো কনফারেন্স এবং এই জাতীয় সম্মেলনে অংশ নিয়ে যে কোনো ব্যক্তি আরও ভালো জ্ঞান অর্জন করতে পারে, একই সাথে যৌথ গবেষণার, চাকরির অফার ইত্যাদির সুযোগ সৃষ্টি হয়।

লিখেছেন, প্রফেসর ডঃ মাঈন উদ্দিন খন্দকার, অধ্যাপক, সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া। সহযোগী সম্পাদক, বিকিরণ পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়ন (এলসিভিয়ার) হ্যান্ডলিং এডিটর, ফিজিক্স ওপেন (এলসিভিয়ার)

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]