মৃত সাগরে একদিন

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৪২ পিএম, ০৬ আগস্ট ২০২০

আকবর হোসাইন আম্মান, জর্ডান

নবী লূত (আঃ) যখন তার কওমের কাছে সঠিকপথে আসার জন্য দাওয়াত দিয়ে গিয়েছিলেন তখন তার কওম সেই দাওয়াত কবুল না করে অনবরত সবরকম জঘন্য অন্যায় আর পাপ করে যাচ্ছিলেন। সমকামিতা তার মধ্যে অন্যতম ছিল। এমনকি লূত (আ) এর স্ত্রী ও তার কওমের খারাপ মানুষদের সাথে মিশে লূত (আ) এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন।

অনেক চেষ্টার পরও যখন লূত (আ) তাদেরকে হেদায়েতের পথে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন তখন আল্লাহর আদেশে লূত (আ) ওই জায়গাটাকে উল্টিয়ে দিয়ে সেই পাপিষ্ঠ এবং অভিশপ্ত জাতিকে ধ্বংস করে দেন যেখানে তার স্ত্রীও ছিলেন। এ সত্য কাহিনী আমরা সবাই কমবেশ জানি।

জর্ডান, জেরুজালেম, পেলেস্টাইন এবং ইসরায়েলের সন্নিকটে অবস্থিত সে জায়গাটিকে তখন থেকে Symbol of destruction বলা হয় এবং এই স্থানটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার নিচে অবস্থিত। সাধারণ সাগরের চেয়ে ৭ গুণ বেশি লবণাক্ত হওয়ার কারণে কোনো সামুদ্রিক প্রাণী বসবাস করতে পারে না এবং পানির ঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণে মানুষও ডুবে না এখানে। এই সাগরের নাম মৃত সাগর।

স্কুল জীবনেই মৃত সাগরের এই ধর্মীয় কাহিনী জানার পর থেকে মনের মধ্যে একটা সুপ্ত বাসনা ছিল যদি কখনও এই পাপের শহর দেখার সুযোগ হয়। অবশেষে আমার জীবনে সে সুযোগ আসল। অফিসিয়াল কাজে মাত্র ৩ দিনের জন্য আম্মান যাওয়ার নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকেই মনে মনে পরিকল্পনা করে রাখলাম যেভাবেই হোক অন্তত মৃত সাগরে যাবই যাব।

৩০ জুন ইরাক থেকে ভোর ৫টার ফ্লাইট হওয়ার কথা থাকলেও ১ ঘণ্টা দেরী করে যাত্রা শুরু হয়। টিকিট হাতে পাওয়ার পর যখন দেখলাম যে রয়েল জর্ডানিয়ান এয়ারলাইন্সে করে ভ্রমণ করব, তখন থেকেই একটা কৌতূহল ছিল যে মনে হয় সেবাটা রাজকীয় সেবার একটা ভাব হবে যেহেতু বামটা রয়েল।

লেন্ডিং পারমিট পেপার আগেই আামদের কাছে ছিল সেটা নিয়ে ইমিগ্রেশনে গিয়ে ৪০ জর্ডানি দিনার (৪৮০০ টাকা) দিয়ে ভিসা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার করে বের হলাম। আমাদের অফিসের ড্রাইভার লোগো হাতে দাঁড়িয়ে থাকায় খুব দ্রুত তাকে পেয়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই দেখলাম কি সুন্দর একটা দেশ। যতই শহরের দিকে যাচ্ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি! এত্ত সুন্দর রাস্তা ঘাট, সাজানো গোছানো! এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ৪০ কিমি দূরে মূল আম্মান শহরের ৪ তারকা একটা হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো।

jordan

খুবই চমৎকার একটা হোটেল, বিশাল বড়রুম যেখানে একা থাকতে গেলে প্রিয়জনকে মিস না করে উপায় নাই। একটু ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করেই মৃত সাগরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। আমার সাথে আফ্রিকান ২টা মেয়েরও মৃত সাগরে গিয়ে লাফালাফি করার পরিকল্পনা থাকলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তারা শেষ মুহূর্তে যাওয়া বাতিল করলো।

কিন্তু আমি তো যাবই যাব। আম্মান শহর থেকে ৬০ কি.মি. দূরের মৃত সাগরে যেতে ৩০ জর্ডানি দিনার দিয়ে একা একটা প্রাইভেট কার ঠিক করলাম এবং এই প্রথম নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ঘুরতে যাচ্ছি চাকরি জীবনে। কিন্তু খুবই উত্তেজিত আমি। দুপুরের খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে ১২টা ৩০ মিমিটে যাত্রা শুরু করলাম মৃত সাগরের উদ্দেশ্যে। শহরের ভেতর দিয়ে বের হয়ে মৃত সাগরের মূল রাস্তায় যাওয়ার পর লক্ষ্য করলাম গাড়ি শুধু নিচের দিকেই যাচ্ছে।

মনে হচ্ছে যে বিশাল এক গর্তের মধ্যে ঢুকছি আমরা। জেরুজালেম বর্ডারের পাশ দিয়ে গাড়ি যখন যাচ্ছিল তখনই দূর থেকে সাগরটা দেখতে পেলাম। নীল সাগর তপ্ত রোদে উত্তপ্ত হয়ে আছে মনে হচ্ছে। যতই কাছে যাচ্ছি ততই উত্তেজনা বাড়ছে।

মৃত সাগরের পাবলিক বিচ খুবই কম। বেশিরভাগই প্রাইভেট বিচ যেগুলো বিভিন্ন রিসোর্ট পরিচালনা করে। কোনো বিচেই বিনামূল্যে নই। আমি আম্মান রিসোর্টের বিচে ২০ জর্ডানি দিনার (২৪০০ টাকা) দিয়ে এন্ট্রি টিকিট নিয়ে প্রবেশ করি। রিসোর্টের মূল গেট পার হয়ে ভেতরে ঢুকেই চমৎকার সুন্দর একটা সুইমিংপুল চোখে পড়ল যেটার চার পাশে বিকিনি পরিহিত ললনারা শুয়ে রৌদ্র গোছল নিচ্ছেন এবং তখনই বুঝতে পারলাম এই বিচটা একটু বেশিই প্রাইভেট।

জীবনে প্রথম এ ধরনের প্রাইভেট বিচে ঢুকলাম যেটা এর আগে ইংলিশ মুভিতে দেখতাম। ক্যামেরায় অনবরত ছবি তুলতে লাগলাম। আর মোবাইল দিয়ে ভিডিও করতে লাগলাম কিন্তু কারও কোনো কেয়ার নাই বরং যারই চোখ পড়ে ক্যামেরার দিকে সেই হাসি দিয়ে একটা ঢংগি পোজ দেয় ছবি তোলার জন্য। সুইমিংপুল পার হয়ে বিচের দিকে যত আগাচ্ছি ততই মৃত সাগরের সৌন্দর্য চোখে পড়ছে। ওপাড়েই জেরুজালেম দেখা যাচ্ছে।

মাটির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বিচের দিকে যাচ্ছি আর স্বল্প বসনা মানব মানবীদের দিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখ চলে যাচ্ছে। বেশিরভাগই কাপল থাকলেও তাদের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে না রেখে আমিও ওয়েস্টার্ন বিহেবিয়ার শুরু করলাম। প্রথমে কক্সবাজার বিচ স্টাইলে ৩ কোয়ারার প্যান্ট আর সেন্টু গেঞ্জি পরে নামলাম দেখলাম যে সবার মাঝে আমাকে খুব বেমানান লাগতে। সবাই কেমন করে তাকাচ্ছে আমার দিকে। পরে লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে আমিও তাদের মতো একপিচ লেংটি পড়ে মৃত সাগরে নেমে পড়লাম।

jordan

মৃত সাগরে কেউ ডুবে না এটা তো আগেই জানতাম তাই নেমেই আগে সেটা পরীক্ষা করার জন্য আমি আমাকে ভাসিয়ে দিলাম। দেখলাম যে শুধু আমার পিঠটা পানিতে নিমজ্জিত হয়। হাত পা দুটো উপর করে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে ভেসে থাকা যায়। পানিটা খুব থকথকে। পিছলা পিছলা।

লবণাক্ত কিনা সেটা টেস্ট করার জন্য আমার আঙুলের মাথাটা জিহ্বায় শুধু টাচ করলাম! ও মাই গড, মনে হলো যে এসিড মুখে দিলাম। তাড়াতাড়ি পাড়ে এসে পানি দিয়ে অনেক্ক্ষণ কুলি করলাম তার পরেই লবণাক্ততা শেষ হয় না। একবার সামান্য একটু পানি আমার চোখে পড়ল! মনে হলো চোখ পুড়ে যাচ্ছে। চোখে অনেক্ক্ষণ পানি ঢালার পর স্বাভাবিক হলে আবার নামলাম। অনেক্ক্ষণ ভেসে ছিলাম। আমার ড্রাইভার ক্যামেরা দিয়ে মোবাইল দিয়ে অনেক ছবি তুললো, ভিডিও করলো।

এ রকম বিচে জীবনে এই প্রথম নামলাম। প্রথম দিকে অস্বস্তি লাগলেও পরে সহজ হয়ে গেলাম। অনেকের সাথে ছবি তুললাম, মজা করলাম। এ এক অন্য রকম জগৎ যেখানে সবাই খুবই অপেন ইন ড্রেস, অপেন ইন মেনার।

হঠাৎ মনে পড়লো, মৃত সাগর একটা পাপিষ্ঠ জায়গা, অভিসপ্ত জায়গা সেই তখন থেকে, এখনও জায়গাটা পাপিষ্ঠই আছে মনে হলো। এ রকম একটা ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী জায়গাকে মানুষকে ভালো পথে আনার জন্য, পাপের পরিণাম কি হতে পারে সেটা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা যেত কিন্তু এখন ব্যবহার হচ্ছে উদ্দাম বিনোদনের জায়গা হিসেবে। পানি থেকে ওপাড়ে তাকালেই জেরুজালেমের মাটি দেখা যাচ্ছে যেটা আমাদের মুসলমানদের কাছে একটি আবেগীয় জায়গা।

প্রায় ২ ঘণ্টা ভাসাভাসি করার পর উপরে এসে গোসল করলাম, ভদ্র জামা কাপড় পরে আম্মানের দিকে রওয়ানা দিলাম। আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হলো বহুল আকাংখিত মৃত সাগর ভ্রমণ।

জর্ডানে এসে সবাই আরেকটা কমন ঐতিহাসিক জায়গা পেট্রা ভ্রমণ করে বাট আমার টাইট সিডিওলের কারণে পেট্রাতে যেতে পারিনি। পরে আরেকবার চেষ্টা করব। জর্ডানে একটা ওয়ার্কশপে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অনেকের সাথে দেখা হয়। পেলেস্টাইন ও ইয়ামেনের ২ জনের সাথে অনেক কথা হলো, গল্প হলো যেগুলো অন্য একদিন শেয়ার করব।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]