করোনাকালীন নাইজেরিয়া টু বাংলাদেশ

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫২ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

মো. আকবর হোসেন

২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ এ ৬ মাসের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার হয়ে নাইজেরিয়ায় গেছিলাম। ২৬ জুন বাংলাদেশে ফেরত আসার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের কারণে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফিরতে পারিনি। আরও ৬ মাসের জন্য মেয়াদ বাড়ালাম দেশটিতে।

নাইজেরিয়াতে যাওয়ার আগেই এক বাংলাদেশির কাছ থেকে দেশটি সম্পর্কে ভালো রিভিও না পেলেও, মানবিক কর্মী হিসেবে সেসব মাথায় না নিয়ে শেষমেশ নাইজেরিয়ায় যাত্রা করি। যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেই ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হই। এরপর টানা ৪-৫ মাস সুস্থ শরীরে নাইজেরিয়ার তিনটা স্টেটে মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখলাম।

জুন মাস থেকে আগস্ট পর্যন্ত পরপর ৩ বার ম্যালেরিয়া এবং ৩ বার টাইফয়েডে একদম শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। বারবার অসুস্থতার কারণে অফিস থেকে দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নাইজেরিয়াতে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় কোনো ফ্লাইট পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার কিছু জরুরি ইভাকুয়েশন ফ্লাইট চলত।

কিন্তু ২ বার তারাও বাতিল করাতে আসা হয়নি। অবশেষে সেপ্টেম্বরের ২ তারিখে লাগোজ, ঘানা আর ইস্তাম্বুল হয়ে তিনদিনে বাংলাদেশে আসার ফ্লাইট পেলাম। কিন্তু সেটাও আবার বাতিল। ৭ সেপ্টেম্বর আবার ফ্লাইট পেলাম। সে হিসাবে বাংলাদেশি প্রায় ১০ হাজার টাকা দিয়ে করোনা টেস্ট করে ৭ তারিখে আবুজা থেকে রওয়ানা দেই লাগোজের উদ্দেশ্যে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যেই ক্ষোভ বিদ্যমান। কিন্তু নাইজেরিয়ার এয়ারপোর্টের কথা শুনলে মনে হবে আমাদের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অনেক ভালো। এয়ারো এয়ারলাইন্সের টিকিট কাউন্টারে চেক ইন করে বোর্ডিং টিকিট নেয়ার পর তারা আমাকেসহ লাগেজ চেকিং বেল্টে নিয়ে যায়।

চেকিংয়ে আমার লাগেজে ২টা মশার রিফিলেন্ট জেল পায়। ওটার নাকি অনুমতি নেই। অনেক বুঝিয়ে বলার পর বলেছে Give Naira... মানে টাকা দিতাম। আমি বললাম যে না আমি টাকা দেব না, তখন ওই লোকটা বললো তাহলে লাগেজ যাবে না, আমি বললাম যে লাগেজ অলরেডি আমি এয়ারলাইন্সকে দিয়েছি, এটা এখন তাদের দায়িত্ব।

এরপর সময় শেষ হয়ে আসছে, আমি দ্রুত চেক ইন গেট পার হয়ে নিচে নেমে আসলাম। আমিই সম্ভবত শেষ যাত্রী ছিলাম। বের হয়ে দেখি যে প্রচণ্ড বৃষ্টি। প্রায় ৩০০ মিটারের মতো দূরত্বে বিমান। হেঁটে যেতে হবে এই বৃষ্টিতে। কি আর করার, বৃষ্টির মধ্যে দৌড় দিয়ে ভিজে বিমানে ঢুকলাম। ঢোকার সময়ে এক বোতল পানি আর একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিল।

এতক্ষণ সামাজিক দূরত্ব মেনে চললেও বিমানে দেখি সব সিটে যাত্রী। তিন সিটের মাঝেরটায় আমার সিট। দু’পাশে দুই নাইজেরিয়ান কৃষ্ণ সুন্দরী। আমি একটা জিনিস বুঝি না, আফ্রিকায় যে কোনো ভ্রমণের সময় আমার পাশে কৃষ্ণ সুন্দরী পড়বেই। অন্য কোনো ফ্লাইটে এটা হয় না। যাইহোক লক্ষ্মী ছেলের মতো ২ জনের মাঝে জড়োসড়ো হয়ে বসলাম।

খুবই অস্বস্তি লাগছিল, কিন্তু কিছুই করার নেই। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে বিমান ৯০ মিনিট দেরিতে ফ্লাই করলো। ৭৫ মিনিট ফ্লাই করে লাগোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালাম। লাগেজ সংগ্রহ করে অফিসের ঠিক করা গাড়িতে করে ইবিস হোটেলে পৌঁছালাম। পরের দিন ১১টা ৩০ মিনিটে ঘানার ফ্লাইট। লাগোসে অনেক বাংলাদেশি আছে কিন্তু কারও সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না, রাত হয়ে গেছে। ৩৫০০ নায়রা দিয়ে একটা বার্গার কিনে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

১১টা ৩০ মিনিটে ঘানার রাজধানী আক্রাতে ফ্লাইট। অফিসের ঠিক করা গাড়ি ৮টায় চলে আসলো। হোটেলের কম্পিমেন্ট নাস্তা করে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ১৫ মিনিটে এয়ারপোর্টে পৌঁছে ঢুকতে গেলে পুলিশ জানালো যে এয়ারলাইন্স চেক ইন শুরু করলে তারা যাত্রীদের ঢুকতে দেবেন। আমি অপেক্ষা করছি। ৯টা বাজে, ১০টা বাজে কিন্তু আমার ফ্লাইটের ডাক আসে না।

আফ্রিকান ওয়ার্ল্ড এয়ারলাইন্সে করে যাওয়ার কথা। ১০টা বেজে গেল, আমাকে ঢুকতেই দিচ্ছে না, প্রচণ্ড টেনশন হচ্ছে। পরে একটা পুলিশকে খুব অনুরোধ করে ভেতরে ঢুকলাম। এরপর আমার বিমানের কাউন্টার খুঁজছি। কিন্তু কোথাও নাই। অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। একজনকে জিজ্ঞেস করার পর সে ওই বিমানের অফিসে যোগাযোগ করতে বললো।

আমি অফিসে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে আজকে আক্রার ফ্লাইট কখন। ওরা আমার প্রশ্ন শুনে যেন আকাশ থেকে বললো। এক কৃষ্ণ সুন্দরী আপা মুখকে আরও কৃষ্ণকায় করে বিরক্ত নিয়ে আমাকে জানালো যে আজকে তাদের কোনো ফ্লাইটই নেই। তাদের ফ্লাইট শুরু হবে ১১ সেপ্টেম্বর। মানে! কি শুনলাম।

আমার মাথায় যেন পাকা বেল পড়লো। আমি টিকিট দেখালাম, দেখে বললো এটা ভুল টিকিট। আমাদের অফিসের সব টিকিট আমস্টারডাম থেকেই নিশ্চিত করা হয়। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমার হাতের অফিসের দেয়া টিকিট ভুয়া। বারবার তাদেরকে জিজ্ঞেস করছি, তারাও ধৈর্যের চূড়ান্ত রকম পরীক্ষা দিয়ে আমার কথা শুনছে আর ঈষৎ হাসি মুখ করে উত্তর দিচ্ছে।

সাধারণত দেশে ফেরত যাওয়ার সময় আমরা ওই দেশের অফিসিয়াল মোবাইল সিম ফেরত দিয়ে দিই। কিন্তু এবার আমি একটা সিম নিয়েই আসলাম। সঙ্গে সঙ্গে অফিসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে কল করে খবরটা জানালাম এবং সেও খুবই আশ্চর্য হলো। সাথে সাথেই সে আমস্টারডামে ইমেল করলো এবং তখন তারা চেক করে দেখে যে এটা ভুল টিকিট ছিল।

নির্দেশনা আসলো আমার জন্য যে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করতে, তারা বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে। প্রায় ২ আড়াই ঘণ্টা পর ২টা বিকল্প সিডিউল দিল। একটা ওইদিন রাতেই আবুজা থেকে তারকিশ এয়ারলাইন্সে করে। আরেকটা লাগোস থেকেই এমিরেটসে পরের দিন সন্ধ্যায়। শেষমেশ অনেক চিন্তা করে এমিরেটসে করে দুবাই হয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঘানা যাওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করে মনটা খারাপ হলেও একটা দিন লাগোস ঘুরতে পারব জেনে ভালই লাগলো।

সময় ২টা, এয়ারপোর্টেই বসে আছি। অফিসের ঠিক করা গাড়ি আসতে ৪টা বাজবে। এতক্ষণ কেমনে বসে থাকি। ওই এয়ারপোর্টেই ডোমেস্টিক এক এয়ারলাইন্সে বাংলাদেশি এক ভাই চাকরি করেন। তিনি সব শুনে আমাকে তার অফিসের গাড়ি দিয়ে আরেক বাংলাদেশি ভাইসহ হোটেলে পৌঁছে দিয়েছেন। তিন বাংলাদেশি ভাই অনেকক্ষণ গল্প করলাম। আমার সব নাইজেরিয়ান টাকা এয়ারপোর্টে বিক্রি করে ডলার কিনছিলাম তখন। সেই টাকা আবার বাংলাদেশি ভাই থেকে পরিবর্তন করে নিলাম।

এই দুই ভাই চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশি আরেক ভাই এসে আমাকে নিয়ে বের হলেন। কামাল ভাই, বাড়ি লাকশাম। তিনি আমাকে নিয়ে লাগোজ আইল্যান্ড, ভিক্টোরিয়া আইল্যান্ড এবং প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়ে গেলেন। ফ্লাইট বাতিল হয়ে মন খারাপ হলেও এখন অনেক ভালো লাগছে। কি যে বিশাল মহাসাগর!

কয়েকবার প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে নামলাম, ছবি তুললাম। ভিডিও করলাম! মানে মহা আনন্দে কাটছে সময়টা। ওখানেই আরেক বাংলাদেশি ভাই স্পিড বোর্টের ইঞ্জিনের ব্যবসা করে, সেখানে নিয়ে গেলেন। ওটা ট্যুরিস্ট স্পট ছিল। কি যে সুন্দর লিখে প্রকাশ করতে পারব না। ভাই শর্মা খাওয়ালেন, অনেক মজা করে ফেরত আসার সময় বাংলাদেশি আরেক ভাই, মাসুদ ভাইয়ের বাসায় নিয়ে গেলেন।

আমি যে নাইজেরিয়াতেও এত পরিচিত সবার কাছে, জানতাম না, আমাকে দেখে উনারা স্বামী-স্ত্রী অনেক খুশি হলেন। আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছে ছিল তাদের, সেটা বলে দেখা করতে পেরে খুব খুশি হলেন। আপা দ্রুত ডিনার রেডি করলেন। শিমের তরকারি, কদু, আর গরম গরম মাছ ভাজা দিয়ে তৃপ্তি করে খেয়ে রাত ১০টায় বের হয়ে আসলাম। কামাল ভাই আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে বাসায় গেলেন যদিও তিনি অনেক চাপাচাপি করছিলেন বাসায় যাওয়ার জন্য।

পরদিন সকাল আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে আবার কামাল ভাই হঠাৎ হোটেলে এসে উপস্থিত। দেখলাম যে তিনি আমার জন্য সকাল আর দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম এত আন্তরিকতা দেখে। আসলে নাইজেরিয়াতে বাংলাদেশি সম্প্রদায় সবাই অনেক ভালো। সবাই প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি এবং সরকারি জব করেন।

আবুজাতে বাংলাদেশ দূতাবাস পরিচালিত একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রপের মাধ্যমে সবাই সবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। করোনাকালীন দূতাবাস জুম মিটিং করে সবার সাথে কুশল বিনিময় করতেন। এ এক অন্যরকম সম্পর্ক দূতাবাস কর্মকর্তা বাংলাদেশিদের মধ্যে। এর আগে বরিশালের এক ভাইয়ের বাসায় ২ বার আমি গিয়েছিলাম। নিকটাত্মীয়দের ও কেউ এত আন্তরিকতা দেখায় না। যেটা আমি অনুভব করলাম।

যাইহোক সন্ধ্যা ৬টায় এমিরেটসে দুবাইতে ফ্লাইট। ৩টার মধ্যে আমি এয়ারপোর্টে ঢুকে কাউন্টার থেকে বোর্ডিং টিকিট নিলাম। এবং এখানেই করোনা রেজাল্টের সার্টিফিকেট খুব ভালোভাবে চেক করলো। সামাজিক দূরত্ব সঠিকভাবে পালন করলো সবাই। আমার কাছে নাইজেরিয়ান যে টাকা ছিল তা আবার বিক্রি করে ডলার কিনলাম। ইমিগ্রেশনের জন্য ছোট একটা ফরম ফিলআপ করতে হয়।

আমি ওটা হাতে নিয়ে পকেট থেকে কলম বের করতে যেতেই একটা মেয়ে পুলিশ তার কলমটা আমাকে দিল সুন্দর একটা হাসি দিয়ে। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে আমি ফরমটা পূরণ করে তার কলমটা তাকে ফেরত দিয়ে আবারও সুন্দর করে ধন্যবাদ দিলাম। কিন্তু ধন্যবাদ সে খাবে না গায়ে দেবে এ চিন্তা করে সে আমাকে বললো Give me Naira! আমি বললাম নায়রা নাই, সব বিক্রি করে দিয়েছি! Give me doller, I will exchange it।

ইমিগ্রেশন কাউন্টারের আগে আরেকটা জায়গায় পুলিশ বোর্ডিং কার্ড চেক করে, সেও সরাসরি বলছে, Naira, Naira। No naira বলে আমি আবারও সামনে চলে গেলাম। ইমিগ্রেশন পার হয়ে আরেকজন। পাসপোর্ট চেক করে বলছে Naira, Naria! কোথায় আসলাম’ সবাই খোলামেলা টাকা চাচ্ছে। বিমান কাউন্টারে ঢোকার সময় আরেকটা চেকিং বেল্ট।

সেটা পার হয়ে ল্যাপটপ গোছাচ্ছিলাম, ওখানকার মহিলা পুলিশ ও Naira Naira... মেইন ইমিগ্রেশন পুলিশ ছাড়া প্রতিটি জায়গায় টাকা খুঁজছিল। এয়ারপোর্টের বাহিরে ট্রলি নিতে চাইলাম আমি, ৫০০ নায়রা চাইলো আমার কাছে। চিন্তা করে দেখলাম, আমাদের এয়ারপোর্টে অনেক অনিয়ম হলেও অন্তত বিদেশিদের থেকে এভাবে টাকা কেউ চায় না বলে আমার বিশ্বাস।

সব সময় জানালার পাশের সিটই চেয়ে নিই আমি। কিন্তু ওইদিন দুবাই পর্যন্ত আমি ভেতরে পাশের সিটটা পেয়েছি। এবারও আমার বাকি ২ সহযাত্রী কৃষ্ণ সুন্দরী। মাঝের জনের আবার ধারণা করছি রোগ আছে। ৭ ঘণ্টার ভ্রমণে অন্তত ১২-১৫ বার সে বের হয়েছে। বের হওয়ার সময় আমাকে উঠে দাঁড়াতে হয়। সারারাত একটা ফোঁটা ঘুমাতে পারিনি।

এ বিমানেও প্রতিটি সিটে যাত্রী ছিল। আগে বিমান ভ্রমণের একটা আনন্দদায়ক বিষয় ছিল সুন্দরী ললনা বিমানবালাদের হাস্যোজ্জল চেহারা আর রংঢং। কিন্তু করোনার জন্য এখন আর তাদের হাসি মুখ দেখা যায় না। বোরিং সময় এখন। কাঁচা মরিচ দিয়ে বিমানের খাবার খেয়ে ৩টা হিন্দি ছবি দেখতে দেখতে দুবাই পৌঁছে গেলাম।

মাত্র ৪ ঘণ্টা ট্রানজিট দুবাইতে। ফ্লাই দুবাই এয়ারলাইন্সে করে ঢাকার ফ্লাইট। বাসে করে টার্মিনাল ২ এর ফ্লাই দুবাইয়ের গেটে আসতে হলো। প্রায় ২০ মিনিটে বিশাল দুবাই এয়ারপোর্টটা গ্রাউন্ড থেকে দেখার সৌভাগ্যও হয়ে গেল। দুবাই এয়ারপোর্ট যে কত বড়, তা সেদিন বুঝতে পারলাম। এখানে এসে দেখি সব বাংলাদেশি লোকজন।

যথা সময়ে বোর্ড ইন শুরু হলো। আমি সব সময়ই একদম শেষের দিকেই বিমানে ঢুকি। আর এখন করোনার কারণে একদম যতটা আলাদা থাকা যায় তাই থাকি। এখানে এয়ারপোর্টে সামাজিক দূরত্বের চমৎকার প্রয়োগ থাকলেও বিমানে কোন সিট খালি নেই।

গতরাতে ঘুমাতে পারিনি। জানালার পাশে সিট হওয়ায় উঠেই ঘুম দিলাম। প্রায় ২ ঘণ্টা পর ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার মোবাইল নেই। ব্যাগ, পকেট সব জায়গায় খুঁজেও মোবাইলটা পেলাম না। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম। কাকে জিজ্ঞেস করব। হঠাৎ করে আমি দাঁড়িয়ে একটা অ্যালার্ম দিলাম যে একটা মোবাইল হারিয়ে গেছে, হৃদয়বান ব্যক্তি মোবাইলটা দিয়ে দেন দয়া করে। এটা শোনার পর আমার এক সিট পেছনের পরের সিটের একটা লোক আমাকে মোবাইলটা দিল। তার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে বসে পড়লাম।

বিকেল ৫টার দিকে বাংলাদেশের আকাশ সীমানায় প্রবেশ করেই মনটা ভালো হয়ে গেল। জানালা দিয়ে ঢাকা শহর দেখে মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। ৯ মাস পর প্রিয় জন্মভূমিতে ফেরত আসলাম। এয়ারপোর্টে নেমেই বুঝলাম করোনা ইস্যু নিয়ে সবাই খুবই সতর্ক। দূরত্ব নিশ্চিত করে সবাই স্বাস্থ্য ডেস্ক থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ইমিগ্রেশনে যাচ্ছে।

আমাকেও হোম কোয়ারান্টাইনে পাঠালেও অফিসিয়াল নিয়মের জন্য বনানীতে একটা হোটেলে ১৪ দিনের জন্য উঠলাম। বাংলাদেশের আমার অর্গানাইজেশানের পক্ষ থেকে আগেই আমার জন্য হোটেল বুকিং দেয়া হয়েছিল। অফিসের গাড়ি পিক করে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেল।

সাধারণত আমার চাকরিতে ৩-৪ মাস পরপরই ছুটি। কিন্তু এবার করানোর জন্য টানা ৯ মাস পর দেশে এসে ১৪ দিন হোটেলে থাকা আসলেই কষ্টকর। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা মার কথা চিন্তা করে থেকেই গেলাম হোটেলে। চিকিৎসা শেষ করতে দেরি হলে হয়তবা আর নাইজেরিয়াতে ফেরত যাব না। সেক্ষেত্রে জানুয়ারি থেকে অন্যকোনো দেশে মানবিক সেবায় আবার যাত্রা শুরু করবো।

মো. আকবর হোসেন
মেন্টাল হেলথ এক্সপাট (চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী)
এমএসএফ-হল্যান্ড

এমআরএম/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]