গ্রিস সমাচার ও করোনাকালের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

রাকিব হাসান রাফি
রাকিব হাসান রাফি রাকিব হাসান রাফি , স্লোভেনিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৩:১৪ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২০

থেসালোনিকি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি বিরোধপূর্ণ শহর। যদিও ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত লুজার্ন চুক্তির ফলে থেসালোনিকিসহ সমগ্র পশ্চিম থ্রেসের ওপর গ্রিসের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ শহরটি এখনও গ্রিস, তুরস্ক, মেসিডোনিয়া ও বুলগেরিয়ার বিবাদের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে অবশ্য বুলগেরিয়া গ্রিসের সঙ্গে তাদের বিবাদ অনেকটা মিটিয়ে ফেলেছে। গ্রিসের মতো বুলগেরিয়াও বর্তমানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য। আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের জনক মোস্তফা কামালের জন্ম এ থেসালুনিকি শহরে।

এশিয়া এবং ইউরোপ মহাদেশের প্রায় সমঙ্গস্থলে অবস্থিত এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নাম থ্রেস। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত এ অঞ্চলটির উত্তরে রয়েছে বলকান পর্বতমালা, দক্ষিণে রয়েছে এজিয়ান সাগর এবং পূর্বদিক বরাবর রয়েছে ব্ল্যাক সি বা কৃষ্ণ সাগর। ১৩৫২ সালে সমগ্র থ্রেসের ওপর তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে অটোমান সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। বিশেষ করে এ সময়কার অটোমান সুলতানদের মাঝে সঠিক নেতৃত্বের অভাবে একে একে অনেক অঞ্চল তাদের অধিকার থেকে আলাদা হয়ে যায়। থ্রেস এ সময় এসে বুলগেরিয়া ও গ্রিসের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।

তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধে আনোতালিয়ার পর তুর্কিরা মনোযোগ দেয় থ্রেসের ওপর পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। সমগ্র পূর্ব থ্রেসের ওপর পুনরায় তুরস্কের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলেও পশ্চিম থ্রেসের মালিকানা থেকে যায় গ্রিসের হাতে। আর উত্তর থ্রেস বর্তমানে বুলগেরিয়ার মানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে গ্রিসের অন্তর্গত একটি প্রদেশ হচ্ছে ম্যাকাডোনিয়া। ইংরেজিতে বলা হয় মেসিডোনিয়া। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের জন্মস্থান ম্যাকাডোনিয়াতে। ম্যাকাডোনিয়া বা মেসিডোনিয়া নামে একটি রাষ্ট্র রয়েছে যেটি গ্রিসের উত্তরে অবস্থিত। মেসিডোনিয়া এক সময় লিবারেল কমিউনিজমের ভিত্তিভূমি হিসেবে পরিচিত যুগোস্লাভিয়ার অংশ ছিল।

১৯৯২ সালে মেসিডোনিয়া এক গণভোটের মধ্য দিয়ে যুগোস্লাভিয়ার ফেডারেশন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে। ‘মেসিডোনিয়া’ এ নামটির প্রতি সব সময় গ্রিকরা আপত্তি জানিয়ে এসেছিল। গ্রিকদের দাবি হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে সমগ্র মেসিডোনিয়া হচ্ছে গ্রিসের অংশ, অন্যদিকে মেসিডোনিয়ার অধিবাসীরা মনে করে গ্রিসের অধীনে মেসিডোনিয়া নামক যে অংশটি রয়েছে সেটিও তাদের অংশ।

jagonews24

মেসিডোনিয়ার অনেক মানুষ বিশ্বাস করে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট আদৌতে কোনো গ্রিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন মেসিডোনিয়ান স্লাভিক। এমনকি মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কুপিয়েতে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের স্মরণে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।

‘মেসিডোনিয়া’ এ নামটি নিয়ে গ্রিস এবং মেসিডোনিয়া এ দুই দেশ অনেকবার বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়েছে। সম্প্রতি ২০১৮ সালে গ্রিসের চাপে অবশ্য মেসিডোনিয়া বাধ্য হয়ে তার নাম পরিবর্তন করে উত্তর মেসিডোনিয়া রেখেছে।

গ্রিসের অধীনস্ত মেসিডোনিয়া নামক প্রদেশটির রাজধানী এ থেসালোনিকি। এমনকি পশ্চিম থ্রেসসহ গোটা গ্রিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক শহর হচ্ছে থেসালোনিকি। এজিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত এ শহরটি গ্রিসের অন্যতম প্রধান বন্দর নগরী এবং রাজধানী এথেন্সের পর এটি দেশটির বৃহত্তম নগরী।

থেসালোনিকি এক সময় ইউরোপের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল। গ্রিক, তুর্কি এবং বুলগেরিয়ান- তিনটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পদচারণায় মুখর থাকতো এ শহরটি। পাশাপাশি আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত অনেক মানুষও এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। শহরটির অধিবাসীরা অর্থোডক্স খ্রিস্টান, ইসলাম ও ইয়াহুদি এ তিনটি ভিন্ন ধর্মে বিভক্ত ছিল।

একইসঙ্গে এতগুলো ভিন্ন জাতি ও ভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষের সহাবস্থান সে সময় ইউরোপে খুব কম শহরে দেখা যেত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত লুজার্ন চুক্তির ফলে থেসালুনিকিসহ গোটা পশ্চিম থ্রেসের ওপর গ্রিসের একক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় থেসালোনিকিসহ গোটা গ্রিসে বসবাস করা মুসলিম ধর্মালম্বী মানুষদেরকে তুরস্কে চলে যেতে বাধ্য করা হয়।

এ সকল মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের মাঝে যেমন তুর্কি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ছিল, ঠিক তেমনি অনেক গ্রিক ও বুলগেরিয়ান মুসলিমকে এ অঞ্চল ছেড়ে তুরস্কে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। তবে উত্তর-পূর্ব গ্রিস বিশেষ করে তুরস্কের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে এখনও ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস রয়েছে, যারা গ্রিসের মোট জনসংখ্যার ১.২ শতাংশ।

এদের অনেকে আবার জাতিগতভাবে তুর্কি। অন্যদিকে সে সময় তুরস্কে বসবাস করা অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বেশির ভাগই চলে আসেন গ্রিসে। এমনকি এক সময় থেসালুনিকিসহ গোটা পশ্চিম থ্রেসে যে সকল ইয়াহুদির বসবাস ছিল তাদেরকে লুজার্ন চুক্তির পর গ্রিস ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। আর বুলগেরিয়ান জাতিগোষ্ঠীর যে সকল মানুষের বসবাস ছিলও এ অঞ্চলে তারাও গ্রিস ছেড়ে বুলগেরিয়াতে পাড়ি জমান।

jagonews24

কথিত আছে, লুজার্ন চুক্তির পর গ্রিক ছাড়া অন্য জাতিগোষ্ঠীর যে সকল মানুষ এখানে থেকে গিয়েছিলেন তাদের সবাইকে সে সময়কার গ্রিক সরকার তাদের পরিচয় পরিবর্তনে বাধ্য করেছিল। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এমনকি তাদের মধ্যে যারা অন্য ধর্মাবলম্বী ছিলেন তাদের সবাইকে বলপূর্বক অর্থোডক্স খ্রিস্টানে দীক্ষিত করা হয়। যদিও এ সকল দাবির সত্যতা যাচাই করা কঠিন।

থেসালোনিকির সিটি সেন্টারের মূল চত্বরভূমিটি ‘অ্যারিস্টোটেলাস স্কয়ার’ নামে পরিচিত। থেসালোনিকির অন্যান্য অংশের তুলনায় এ অংশটি অপেক্ষাকৃতভাবে নতুন। পুরো শহরের মধ্যে বলতে গেলে কেবল এ অংশেই চাকচিক্যময় দালানের দেখা মিলে। ১৯১৮ সালে বিখ্যাত ফরাসি স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আর্নেস্ট হাবরার্ড এ স্কয়ারটির নকশা প্রণয়ন করেন।

যদিও তার প্রণীত নকশা অনুযায়ী পুরো অ্যারিস্টোটেলাস স্কয়ারকে আজকের রূপ দিতে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ১৯১৭ সালের দিকে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে এ শহরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৩২ ঘণ্টা সময়ব্যাপী স্থায়ী হওয়া এ অগ্নিকাণ্ডের ফলে সাড়ে নয় হাজারের মতো ঘরবাড়ি ধ্বংসপ্রাপ্ত। থেসালোনিকির বসবাসরত ইয়াহুদিদের একটা বড় অংশের স্থানচ্যুতির কারণ হিসেবে এ ঘটনাকে দায়ী করা হয়।

১৯১৭ সালের এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সে সময়কার গ্রিস সরকার থেসালোনিকিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেয়। এরই প্রেক্ষিতে ডাক পড়ে আর্নেস্ট হাবরার্ডের। ২০০০ সালের পর আরও একবার অ্যারিস্টোটেলাস স্কয়ারকে সংস্কার করা হয়। একটু আগে বলেছি যে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় গ্রিস এবং বলকান অঞ্চলে যে সকল দেশ রয়েছে সেগুলো অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেকটা রুগ্ন প্রকৃতির।

থেসালোনিকিও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই পুরো শহরটি একবার ঘুরে আসার পর যখন কেউ এ অ্যারিস্টোটেলাস স্কয়ারে এসে দাঁড়াবে তখন তার কাছে হয়তো বা মনে হবে আশপাশের সমগ্র শহরতলী থেকে জোঁকের মতো রক্ত শোষণ করে এ অংশটি ফুলেফেঁপে এ রকম জৌলুসতা অর্জন করেছে।

অ্যারিস্টোটেলাস স্কয়ার থেকে উত্তর-পশ্চিম বরাবর এজিয়ান সাগরের তীর ঘেঁষে কয়েকশো মিটার হাঁটার পর চোখে পড়বে হোয়াইট টাওয়ার। এ হোয়াইট টাওয়ারটি থেসালুনিকির ল্যান্ডমার্ক হিসেবে পরিচিত। বাইজেনটাইন শাসন আমলে এ টাওয়ারের স্থানটিতে একটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়। মূলত সে সময় স্থানীয়ভাবে প্রতিরক্ষার কাজে এ দুর্গটি ব্যবহার করা হত।

১৪৩০ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের নেতৃত্বে অটোমানরা থেসালোনিকি জয় করেন। অটোমান শাসন আমলে এ দুর্গটিকে কিছুটা সংস্কার করে লাল রঙের একটি টাওয়ারের আকৃতি দেওয়া হয়। অটোমান শাসন আমলে মূলত একটি কারাগার হিসেবে এ টাওয়ারটিকে ব্যবহার করা হতো। সে সময় মৃত্যুদণ্ডের সাজা পাওয়া অনেক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হত এ টাওয়ারে।

jagonews24

১৯১২ সালে প্রথম বলকান যুদ্ধের পর এ টাওয়ারটির লাল থেকে পরিবর্তন করে সাদা করা হয়। তখন থেকেই এ টাওয়ারটি হোয়াইট টাওয়ার নামে পরিচিত। বর্তমানে এ হোয়াইট টাওয়ারটি একটি মিউজিয়াম এবং একই সঙ্গে আর্ট গ্যালারি। সাধারণত এ টাওয়ারের ভেতরে প্রবেশ করতে ছয় ইউরো প্রয়োজন হয়। হোয়াইট টাওয়ার থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক বরাবর কয়েক গজ হাঁটলে চোখে পড়বে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য।

ইতিহাসের পাতায় তার চেয়ে মহাপরাক্রমশালী রাজা দুই একজন খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। গ্রিসের থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিম ভারত এমনকি উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট। থেসালোনিকির আরও একটি পর্যটন নিদর্শন হচ্ছে রটোন্ডা। রটোন্ডা হচ্ছে এক ধরনের বেলনাকৃতি স্থাপনা যেটি আনুমানিক ৩০৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল।

এটি মূলত একটি রোমান স্থাপনা। প্রথমে সমাধি হিসেবে এ স্থাপনাটির নির্মাণ করা হলেও পরবর্তীতে ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে এ স্থাপনাটি ব্যবহার করা হত। পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রথম কন্সটান্টিন একে অর্থোডক্স চার্চে রূপান্তর করে। রটোন্ডা থেকে সিটি সেন্টার বরাবর দেড়-দু মিনিট হাঁটার পর ডান দিকে লক্ষ্য করলে চোখের সামনে একটি তোরণ ভেসে উঠবে।

এ তোরণটি ‘আর্ক অব গ্যালারিয়াস’ নামে পরিচিতি। মূলত চতুর্থ শতাব্দীতে যখন থেসালোনিকি রোমানদের অধীনে আসে তখন তারা তাদের এ বিজয়কে স্মরণ করতে এ তোরণটির নির্মাণ করে। যেহেতু থেসালোনিকি এক সময় রোমান শাসনের অধীনে ছিলও তাই শহরটির বিভিন্ন স্থানে রোমান শাসনামলের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।

থেসালোনিকির যে বাসভবনে মোস্তফা কামালের জন্ম হয়েছিল সেটি বর্তমানে তুরস্কের কনস্যুলেট ভবন এবং একই সঙ্গে একটি জাদুঘর। আমরা চেষ্টা করেছিলাম সে জাদুঘরটির ভেতরে প্রবেশ করার জন্য কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে এবং এ মুহূর্তে যেহেতু গ্রিসের সাথে তুরস্কের উত্তেজনা চলছে তাই আমাদেরকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

পুরো ভবনের সামনে সবসময় স্পেশাল পুলিশ ফোর্স পাহারায় নিয়োজিত থাকে। এছাড়াও থেসালোনিকির অন্যান্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে জিউস মিউজিয়াম এবং বাইজেন্টাইন মিউজিয়ামসহ বেশ কিছু জাদুঘর ও অর্থোডক্স গির্জা।

পুরো থেসালুনিকি ভ্রমণে আমাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন মনিউর রহমান সুমন ভাই। থেসালুনিকিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেমন আছেন এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, রাজধানী এথেন্সের তুলনায় থেসালুনিকিতে জীবন-যাত্রা অনেকটা সহজ। এছাড়াও এথেন্সে প্রায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে পাকিস্তানি কিংবা আফগানি অথবা আরবদের দ্বারা হামলার শিকার হন।

jagonews24

থেসালোনিকিতে এ সমস্যা খুব বেশি একটা প্রকট নয়। বর্তমানে তাই এথেন্সের পাশপাশি অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাসের জন্য থেসালোনিকিকে বেছে নিচ্ছেন। থেসালুনিকিতে বর্তমানে বাংলাদেশি মালিকানাধীন বেশ কিছু দোকান রয়েছে, এমনকি বাংলাদেশিদের পরিচালিত একটি মসজিদও রয়েছে। আমরা দুপুরে সে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করলাম।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মাঝে গ্রিস এবং স্লোভাকিয়া দুইটি দেশ যেখানে অফিসিয়াল কোনও মসজিদ নেই। কয়েকজন মুসল্লি একত্রিত হয়ে কোনও একটা বিল্ডিং এর নিচের অংশ ভাড়া নিয়ে মসজিদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেও থেসালোনিকিসহ বর্তমান গ্রিসের বিভিন্ন অংশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ধর্ম ছিলও ইসলাম।

প্রায় ৫০০ বছর গ্রিস শাসন করেছিল তুরস্কের অটোমান সুলতানেরা। অটোমান শাসন আমলে গ্রিসের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয়েছিল অসংখ্য মসজিদ। আজকের দিন গ্রিসে গেলে এ সকল মসজিদ খুঁজে বের করাটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। বলকান যুদ্ধের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক গ্রিস রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটলে এ সকল মসজিদ তো বটে এমনকি অটোমানদের স্মৃতি বহন করে এমন সব নিদর্শন সে সময় গ্রিসের সরকার ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করে।

অনেক মসজিদকে চার্চে রূপান্তর করা হয়, অনেক মসজিদকে আবার জাদুঘর কিংবা পানশালা অথবা থিয়েটারে পরিণত করা হয়। গ্রিক জাতীয়তাবাদে তুরস্ক এক চিরবৈরির প্রতিশব্দ। গত শতাব্দীর আশির দশকের পর গ্রিসে পাড়ি জমানো আফ্রিকান ও আরব অভিবাসী মুসলমানদের অনেকে চেষ্টা করে আসছে অন্তত রাজধানী এথেন্সে নিজেদের ইবাদাতের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করার জন্য, বিভিন্ন সময়ে গ্রিসের সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাদের আশ্বাস দেওয়া হলেও দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদ নির্মাণের বিষয়টি এখনও ঝুলে আছে।

গ্রিসের সাধারণ মানুষের অনেকে মসজিদের সঙ্গে তুরস্ক এবং অটোমান সাম্রাজ্যের সম্পর্ক খুঁজে বেড়ায় এবং এ কারণে হয়তো বা স্বাধীনতা অর্জনের একশো বছরের মধ্যে দেশটিতে কোনও মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এক সময় যে দেশের আকাশ-বাতাস আজানের সুরে ধ্বনিত হতো; আজকে দিনে সে দেশে এগুলো নিছক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় গ্রিসের সমাজ ব্যবস্থা অনেকটা রক্ষণশীল। দেশটির মানুষের জীবনে এমনকি গ্রিসের রাজনীতিতেও ধর্মের বড় প্রভাব রয়েছে যেটা সচরাচর পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে দেখা যায় না। প্রত্যেক বাসা-বাড়ি কিংবা দোকান-রেস্তোরাঁ যেখানেই যান না কেনও দেখা মিলবে যিশুখ্রিস্টের ছবির।
চলবে...

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]