এখনও হৃদয়জুড়ে বাংলাদেশ

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৫১ এএম, ২২ অক্টোবর ২০২০

ঢাকার মিরপুরের পাইকপাড়া থেকে নিউইয়র্ক, মণিপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির সমাপনী শেষ করার আগেই পরিবারের সঙ্গে মাত্র সাত বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসতে হয়েছিল।

এখনও পুরো হৃদয়জুড়েই রয়েছে মাতৃভূমি বাংলাদেশ। নিউইয়র্কে পড়াশোনা করতে করতে যতই উপরের ক্লাসে উঠেছি, বাংলাদেশের বিষয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ আমাকে ততো বেশি করে পেয়ে বসেছে।

তবে এই আগ্রহকে শুধুমাত্র ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং একজন ইয়াং লিডার হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় নিয়ে অবশেষে ২০১৮ সালে ‘ইফোর্টস ইন ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ’ (ইওয়াইডিবি) নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছি। পথশিশু এবং এতিমদের মানসম্মত শিক্ষা ও উন্নয়নে কাজ করে চলেছি।

আশার কথা, বিগত দুই বছরে ইওয়াইডিবির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সবকটি অঙ্গরাজ্যসহ পৃথিবীর সাতটি দেশের তিন শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক ইতোমধ্যেই এ সংস্থায় যোগদান করেছে।

ইওয়াইডিবি মূলত হাইস্কুল লেভেলের ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা পরিচালিত। তারা এখানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে। ‘কোয়ালিট এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অপরচুনিটিজ ফর ইনলাইটিং দ্য ফিউচার অব মারজিনাইলজড বাংলাদেশ ইয়ুথ’। এই উদ্দেশ্য নিয়ে বর্তমানে এগিয়ে চলছে ইওয়াইডিবি কার্যক্রম।

পথে পথে ঘোরে এমন হাজারখানেক শিশু-কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে চায় ইওয়াইডিবি। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এবং বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। এমনকি করোনাকালীনও নিছক দর্শকের ভূমিকায় না থেকে ইওয়াইডিবি ছিন্নমূল-বস্তিবাসী জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে।

নিউইয়র্ক থেকে ফান্ড সংগ্রহ করে এবং ঢাকাস্থ ‘বিকন পয়েন্ট ইনক্’ সংস্থার সহযোগে ঢাকা ও আশপাশের ক্ষতিগ্রস্ত বেশকিছু পরিবারকে ঈদের আগে দু’সপ্তাহব্যাপী খাবার (চাল, ডাল, তেল সেমাই, চিনি ইত্যাদি) সরবরাহ করা হয়েছে।

এছাড়াও করোনা মোকাবিলার বিষয়টি সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রসহ পাঁচটি দেশ থেকে একশত দুইজন স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করা হয়েছে এবং জুম অ্যাপের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এই স্বেচ্ছাসেবকরাই অনলাইনে দরিদ্র শিশুদের প্রশিক্ষণ দেবে।

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার জন্য ওর্য়াকশিট, মডিউল, লেকচার ইত্যাদি উপকরণ তৈরি করা হয়েছে। ইওয়াইডিবি কাজ করবে ব্র্যাকসহ আরও কয়েকটি সংস্থার এসব স্কুলে। পাশাপাশি কম্পিউটার ও আইটি সরঞ্জামাদি দেয়া হবে।

মহামারির আক্রমণ হয়তো কমে যাবে। তবে অনেক শিশুই আর স্কুলে নাম লেখাতে পারবে না। তবে আমরা আশাবাদী বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে গিয়ে এমন প্রায় পাঁচ হাজার বস্তিবাসী শিশুর মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে আসতে পারব।

ইওয়াইডিবি গৃহীত উদ্যোগগুলো ইতোমধ্যেই মনোযোগ কেড়েছে সুধীজনদের। এসেছে বেশকিছু সাফল্যও। ‘ওয়ার্ল্ড সিরিজ অব ইনোভেশন’ (ডব্লিউএসআই) নামের প্রতিযোগিতায় ইআইডিবি ইনোভেটিভ আইডিয়ায় প্রথম হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেটওয়ার্ক ফর টিচিং এন্টারপ্রিনিউরশিপ’ (এনএফটিই) থেকে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। পৃথিবীর ৬৪টি দেশ থেকে কয়েক হাজার প্রতিযোগী এতে অংশগ্রহণ করে। এ বছর ‘সাস্টেইনবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ (এসডিজি) এর নয়টি বিষয়ের যে কোনো একটিতে ইনোভেটিভ আইডিয়া উপস্থাপন করতে বলা হয়েছিল।

ইওয়াইডিবি টিম জেন্ডার ইকুয়্যালিটি বিষয়ে ‘এডুকেশন অব ফিমেল ডোমেস্টিক চাইল্ড লেবার ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে তাদের আইডিয়াটি উপস্থাপন করে। বাংলাদেশের শিশুশ্রম নির্মূলে তাদের উদ্যোগ সবার বেশ প্রশংসা অর্জন করে।

ইওয়াইডিবির প্রতিষ্ঠাতা জাহিন রহমান রাইসা জানান, এ বছর ‘গ্লোবাল এন্টারপ্রিনিউরশিপ’ সপ্তাহে জাতিসংঘ (ইএন) সদর দফতরে ইওয়াইডিবি নির্মিত এক মিনিটের একটি ভিডিও কমার্শিয়াল দেখানো হবে। ইওয়াইডিবি তাদের আইডিয়া নিয়ে কথা বলার সুযোগ পাবে সেখানে। বিশ্বজুড়ে হাজারও উদ্যোগী তরুণ নেতৃত্বের প্রচেষ্টায় ইওয়াইডিবি চির সবুজ একটি সংগঠন হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি জানান, আসছে গ্রীষ্ম এবং আগামী বছরগুলোতে আমরা দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের পরিকল্পনা হতে নিয়েছি। নিউইয়র্কের এডুকেশন্স ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে মিলে সিটিতে ইয়ুথ অ্যাক্টিভিস্ট কাউন্সিল গঠনের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি এ প্রকল্পের মাধ্যমে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে আরও বেশি সদস্য সংগ্রহ করতে পারব।

তিনি আরও জানান, বলতে দ্বিধা নেই, সমষ্টিগতভাবে ইওয়াইডিবি-এর সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও কিছু সাফল্য আর স্বীকৃতির ভাগিদার হতে পেরেছি। এ বছর বাঙালি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রথমবারের মতো দ্য প্রডেনশিয়াল স্পিরিট কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ডসে ফাইনালিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি।

এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কমিউনিটি সার্ভিসের সবচেয়ে বড় সম্মাননা। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি স্টেটের মিডিল স্কুল এবং হাইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য থেকে আউটস্ট্যান্ডিং অব কমিউনিটি ইনিশিবে-র এ স্বীকৃতি দেয়া হয়।

নিউইয়র্কের হাইস্কুল জুনিয়র থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখতে চলেছি। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত জ্ঞান যেন প্রিয় বাংলাদেশের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারি, এই দোয়া কামনা করছি সবার কাছে।

ভবিষ্যতে ইচ্ছে আছে মেধাবী ও তরুণ গঠন করার মধ্য দিয়ে যেন পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব প্রতিভাগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে তাদের বাংলাদেশের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারি।

লেখক: জাহিন রহমান রাইসা, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

সজীব হোসাইন/এমআরএম/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]