হৃদয়ে যখন নৈতিক মূল্যবোধের অভাব

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা সুইডেন থেকে
প্রকাশিত: ১১:১৯ এএম, ২৯ অক্টোবর ২০২০

চোখ প্রাণি জগতের আলোক-সংবেদনশীল একটি অঙ্গ ও দর্শনেন্দ্রিয় যা আলোর উপস্থিতি পার্থক্য করতে পারে। প্রাণি জগতের চোখের মণি যেমন দেখতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঠিক ব্ল্যাক হোলকে দেখে মনে হবে আলোকরশ্মির মধ্যে কালো একটি চোখের মণি যাকে ফাঁকি দেবার শক্তি নাকি আালোরও নেই।

অনেকেরই ব্ল্যাক হোল নামটির সঙ্গে নতুন পরিচয় ঘটেছে। ব্ল্যাক হোল হচ্ছে একটি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং এতই প্রখর যে তার হাত থেকে কোনোকিছুই পালাতে পারে না, এমনকি আলোর রশ্মিও।

এর নাম ব্ল্যাক হোল বলা হলেও আসলে এটা ফাঁকা নয় বরং এতে বিপুল পরিমাণ পদার্থ জমাট বেঁধে আছে। যার ফলে এর মহাকর্ষশক্তি এত জোরালো।

পৃথিবীর নানা প্রান্তে বসানো আটটি রেডিও টেলিস্কোপের এক নেটওয়ার্ক দিয়ে ব্ল্যাক হোলের ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে। ছবিটি দেখলে মনে হবে বৃত্তাকার কালো আঁভার চারদিকে এক উজ্জ্বল আগুনের বলয়।

জানা গেছে, পৃথিবী থেকে এই ব্ল্যাক হোল ৫০ কোটি ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে, এবং এটার ভর (এর মধ্যেকার পদার্থের পরিমাণ) সূর্যের চাইতে ৬৫০ কোটি গুণ বেশি।

ব্ল্যাক হোলটি এতই বড় যে এটাকে একটা দানব বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দানবাকৃতির এই ব্ল্যাক হোল পৃথিবী যে সৌরজগতের অংশ তার চাইতেও বড়। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এর আয়তন ৪ হাজার কোটি কিলোমিটার যা পৃথিবীর চাইতে ৩০ লক্ষ গুণ বড়।

এখন দানব কী বা তা দেখতে কেমন বা কত বড় সেটা কি আমরা জানি! ভাবনার বিষয় কী হবে ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে জেনে বা আমাদের কী উপকারে আসতে পারে এটা।

আদার বেপারী হয়ে জাহাজের খবর নেয়া কথাটি অতীতে যেভাবে বলা হোত এখন কিন্তু সেভাবে বলা ঠিক হবে না। কারণ বস্তা বস্তা আঁদা এখন জাহাজে করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে রফতানি হচ্ছে। বলা যায় না কখন দেখা যাবে ব্ল্যাক হোল মানবকল্যাণে এমনভাবে কাজে লাগবে যে হয়তো বা দুর্নীতি, অনীতি, কুকর্ম বা ধর্ষণ কিছুই করা যাবে না।

ব্ল্যাক হোলের কাছ থেকে যখন কোনোকিছুই পালাতে পারে না, এমনকি আলোর রশ্মিও, তাহলে আমাদের ভালো-মন্দ কর্মের সব কিছুই কি ব্ল্যাক হোলে ধরা পড়ছে না?

আমি পড়েছি বেশ চিন্তায়। পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ এখনও তাদের দিনের খাবার জোগাড় করতে সক্ষম হয়নি, আবার কেউ ব্ল্যাক হোলের সন্ধান দিচ্ছে। অন্যদিকে অনেকে মতামতের অমিলে ধৈর্য্য এবং সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে অন্যের দেহ থেকে মাথা সরিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করছে না।

আমরা নিজেদের মধ্যে ঘৃণার বীজ বপণ করে প্রতিহিংসার জন্ম দিচ্ছি। ক্ষমতা ধরে রাখতে উঠে পড়ে লেগে আছি। অন্যদিকে পাশ্চাত্যে কী দেখছি! ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেবার চিন্তা-ভাবনা করছেন। কারণ যে বেতন তিনি পান সেটা তার অতীত আয়ের চেয়ে কম এবং বর্তমান প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

আগে একটি পত্রিকায় কলাম লিখে তিনি বছরে আয় করতেন ২ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড। এছাড়া মাসে দু’টি সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে তিনি আয় করতেন ১ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ডের কাছাকাছি। সেখানে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তার উপার্জন কমে গেছে। বাংলাদেশে কী কখনও এমনটি হতে পারে বা ভাবা যেতে পারে?

সুইডেনে প্রায়ই এমনটি দেখা যায়। বেশি দিনের কথা নয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মডারেট পার্টির লিডার এবং তৎকালীন অর্থমন্ত্রী দু’জনেই তাদের দায়িত্ব ছেড়ে অন্যখানে চাকরি নেন। কারণ রাজনীতি এসব দেশে অন্যান্য কাজের মতোই। ভালো না লাগলে বা অন্য কোথাও ভালো বেতন পেলে অনেকে চাকরি ছেড়ে দেয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটে।

কারণ পাশ্চাত্যে কোনো দেশে রাজনীতিবিদদের প্রভাব খাঁটিয়ে কোটি কোটি টাকা কামাই করার সুযোগ নাই। তাদেরকে সচরাচর দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যহার করতে দেখা যায় না। মূলত দেশসেবা করার জন্যই এরা এ কাজে আসে।

যদি সেটা মনপূত না হয় তখন আস্তে করে সরে যায় এ পেশা থেকে। কিন্তু আমাদের সমাজে বিষয়টি কেন যেন একটু ভিন্ন ধরনের। আমাদের মাইন্ডসেট বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভিন্ন। এত বড় ব্যবধান ভাবতেই গা শিউরে উঠে! গা শিউরে উঠছে এবং মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে আমরা অর্থে গরিব, মহাশূন্যের তথ্য জানার মতো সুযোগ সুবিধা আমাদের নেই।

তবে হাসপাতালে প্রতিদিন নানা ধরণের রোগী নানা ধরনের রোগ নিয়ে হাজির হয়। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মুমূর্ষু রোগী হাসপাতালে আসে। এখানকার ইমারজেন্সি আর বাংলাদেশের ইমারজেন্সি আকাশ পাতাল তফাঁৎ যদি তুলনা করি। কারণ যে স্ট্রেস নিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসকরা কাজ করে তা কখনও এখানে দেখা যায় না।

সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিকিৎকরা যে অভিজ্ঞতা পায় তা পাশ্চাত্যের ডাক্তাররা পায় না। তারপরও এরা যা জানে, শেখে এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে সেই অর্জনে খ্যাতনামা ডাক্তার এবং হাসপাতাল গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে।

আমরা সেভাবে প্রশিক্ষণকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারছি না। বরং নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই করে চলছি। তাই আমি মহশূন্যের ব্ল্যাক হোলের মতো নতুন কিছু ভাবছি না। আমি আমাদের হৃদয়ের ব্ল্যাক হোলের কথা ভাবছি।

এমআরএম/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]