বিদায় শহীদুল স্বাগত সারওয়ার : প্রবাসীদের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

আহমাদুল কবির
আহমাদুল কবির আহমাদুল কবির , মালয়েশিয়া প্রতিনিধি মালয়েশিয়া
প্রকাশিত: ০৫:০৫ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০২০

বিদেশে দেশের মানুষের অভিভাবক বলা হয়ে থাকে সে দেশে নিযুক্ত হাইকমিশনারকে। তাই প্রবাসীদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা থাকে দূতাবাস পরিবারের কাছে। সব প্রত্যাশা পূরণ হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস গত ৬ বছর প্রবাসীদের প্রত্যাশা পূরণে ছিল স্বচেষ্ট।

৬ বছরের সেবা ও বিদায়ী হাইকমিশনার মহ. শহীদুল ইসলামের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা পাভেল সারওয়ার সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘বিদেশের মাটিতে এক টুকরো বাংলাদেশ হচ্ছে আমাদের হাইকমিশন। আর হাইকমিশনার হচ্ছেন আমাদের অভিভাবক। আমরা মালয়েশিয়া প্রবাসীরা পেয়েছিলাম একজন মানবিক হাইকমিশনার।’

Malaysia2

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রে অবস্থিত দেশটিতে বাংলাদেশের দূত হিসেবে ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি হাইকমিশনারের দায়িত্বে আসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৯৮৪ ব্যাচের পেশাদার কূটনীতিক মহ. শহীদুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্স এবং বেলজিয়ামের ইউনির্ভাসিটি লিব্রে ডি ব্রুসেলস থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে দ্বিতীয়বার মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করা এই কূটনীতিক মালয়েশিয়ায় আসার পর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।

দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন, অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ-সুরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণসহ নানা বিষয়ে কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রবাসীরা ‘তাদের কর্ম, শিষ্টাচার, মেধা ও প্রজ্ঞা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন বাংলাদেশিরা। বিগত ৬ বছরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলো গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।

Malaysia2

দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে হাইকমিশনার বেশ কিছু কাজ করেছেন। যেমন- ডিজিটাল পাসপোর্ট সেবা: ডাক যোগে পাসপোর্ট আবেদন পাঠিয়ে দেয়া। অনলাইনে ডেলিভারি স্লিপ জানা এবং অনলাইনে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নির্ধারিত দিনে পাসপোর্ট বিতরণ।

এসব কাজ ঘরে বসেই করা যাচ্ছে। ফলে দালালদের কাছে যেতে হচ্ছে না। কিন্তু ক্ষেপে গেছে কিছু দালাল! চালিয়ে যাচ্ছে অপপ্রচার। করোনাকালীন মালয়েশিয়া থেকে চাকরি হারিয়ে কাউকে দেশে ফেরত যেতে দেননি। কোম্পানি পরিবর্তন করার সুযোগ এনে দিয়েছেন যা কখনোই ছিল না।

Malaysia3

হাইকমিশনার মহ. শহীদুল ইসলামের অনুরোধের প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকার সকল অবৈধদের বৈধতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি যারা ক্যাম্পে বা জেলে আছে তাদেরকেও বৈধতা দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সরাসরি কোম্পানিতে লোক নিয়োগ যা আগে ছিল এজেন্ট, দেশ থেকে লোক এনে জিম্মি করে রাখত, ইচ্ছামত কাজ দিত।

সেটা তিনি বন্ধ করেছেন তাই কোনো আদম বেপারী এই বিষয়টি পছন্দ করেনি। কর্মীদের জন্য সুরক্ষা দিয়ে নিয়োগ চুক্তি করেছেন যেটাতে কর্মী ও কোম্পানি সই করে কোনো এজেন্ট বা দালাল নয়। ব্যাংক একাউন্টে বেতন দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন, যাতে এজেন্ট বা দালাল বেতন থেকে টাকা কেটে নিতে না পারে।

Malaysia4

নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন সরাসরি কোম্পানির অধীনে। যা আগে ছিল এজেন্টের অধীনে ফলে এজেন্ট অনেক টাকা কেটে নিত। মালয়েশিয়া সরকারের কাছে বাংলাদেশের লোক পাঠানোর কোনো আইনি স্বীকৃতি ছিল না, হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম এসে সে স্বীকৃতি আদায় করেছেন এবং বাংলাদেশকে মালয়েশিয়া লেবার সোর্স কান্ট্রির স্বীকৃতি দেয়।

২০০৬-৭ সালে বিএনপির আমলে এজেন্টরা অনেক বেশি লোক এনে রাস্তাঘাটে ছেড়ে দিয়েছিল, কোনো থাকা খাওয়া কাজের ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৭ সালে লোক এসেছে সরাসরি কোম্পানির অধীনে ফলে সে রকম বাজে অবস্থা হয়নি। (ফলে বাংলাদেশি এজেন্টরা খুব ক্ষিপ্ত)।

Malaysia5

শহীদুল ইসলাম মালয়েশিয়া সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলাদেশি কর্মীদের যেন পেনশন দেয়া হয় যাতে কাজ শেষ করে দেশে ফেরত গেলে আজীবন পেনশন পায়। মালয়েশিয়া সরকার রাজি হয়ে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। কর্মীদের সেভিংসের জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন, যেন কাজ শেষে দেশে ফেরার সময় খালি হতে না ফিরে যেতে হয়।

এসব কাজ আগে এজেন্টরা করত। এখন করতে পারে না তাই তারা খুব ক্ষিপ্ত। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া পণ্য রফতানি ছিল ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিগত ৬ বছরে বেড়ে হয়েছে ২৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। করোনা না হলে তিনশর কাছাকাছি হত।

Malaysia7

সর্বশেষ, পাসপোর্ট সেবা দেয়ার জন্য আলাদা ভবন নিয়েছেন যেখানে ৮ শ লোক বসতে পারে এসি রুমে। যা মালয়েশিয়ার দূতাবাসের ইতিহাসে এই প্রথম। তারপরও শোনা যায় হাইকমিশন কিছু করে না।

মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ করে রি-হিয়ারিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে তিন লাখের বেশি বাংলাদেশি অবৈধ লোক বৈধতা পায়। (এতগুলো লোক দেশে ফিরে গেলে কি হত!) কিছু লোক অবৈধ ছিল কিন্তু জেল জরিমানার কারণে দেশে ফিরে যেতে পারছিল না। সরকারকে বলে তাদের নামমাত্র জরিমানা দিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যার নাম দেয়া ছিল ব্যাক ফর গুড কর্মসূচি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়া সরকারকে বাংলাদেশের পক্ষে থাকা, জাতিসংঘে কথা বলা এবং কক্সবাজারে ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করার মতো কাজ করে নিতে পেরেছেন শহীদুল ইসলাম।

Malaysia7

যারা ছুটিতে দেশে গিয়ে আটকে আছে, অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাদেরকে মালয়েশিয়া ফেরত আসা এবং কাজে যোগ দেবার বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারকে রাজি করিয়েছেন এবং তারা সকলেই ফিরতে পারবে। তবে মহামারি করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকার সিদ্ধান্ত দিতে সময় নিয়েছে।

হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, মানবিক হাইকমিশনার মহ. শহীদুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন ওমানে নিযুক্ত আরেক মানবিক হাইকমিশনার গোলাম সারওয়ার। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিচ্ছেন তিনি।

এদিকে মালয়েশিয়ায় ঠিক কত বাংলাদেশি রয়েছেন তার কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও নেই দূতাবাসের কাছে। তবে অনুমান করা যায়- বৈধ, অবৈধ মিলে এ সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়াবে। শ্রমিকদের পাশাপাশি বর্তমানে মালয়েশিয়ায় সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুতে শিক্ষক, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, আইটি কোম্পানিগুলোতে কম্পিউটার প্রকৌশলীও রয়েছে অনেক।

Malaysia8

মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেমন হাইকমিশন প্রত্যাশা করেন আপনারা? জবাবে তারা বলেন, প্রবাসে হাইকমিশনার আমাদের অভিভাবক। বিপদে-আপদে সবাই তার ওপরই ভরসা করবে। মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে বড় শ্রেণিটি শ্রমিকের। তাই সবারই চাওয়া হাইকমিশনার এবং তার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হবেন শ্রমিকবান্ধব।

প্রবাসীদের প্রত্যাশা-নতুন নিযুক্ত হাইকমিশনার হবেন বিদায়ী হাইকমিশনার মহ. শহীদুল ইসলামের চেয়ে আরও বন্ধুসুলভ। প্রবাসীদের সঙ্গে মিশবেন, সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নেবেন, নিজেদের সংস্কৃতি বিকাশে উদ্যোগ নেবেন।

শ্রমিকরা যেন হাইকমিশনে গিয়ে সহজে সেবা পায়, মাসের পর মাস পাসপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়, সে বিষয়ে যত্ন নিতে হবে। কারণ শ্রমিকরা মালিকের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে যান দূতাবাসে। সেদিনের ওভারটাইমের বেতন মার যায় তাদের। স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিকদের জন্যে সেবার মান বাড়াতে হবে কর্মচারীদের। ধমক না দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে তাদের। তারা যেন এম্বেসিকে ভয় না পেয়ে বরং সেখানে সেবা নিতে পছন্দ করেন।

Malaysia9

একাধিক সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় নেই বাংলাদেশিদের একটি একতাবদ্ধ কমিউনিটি। কারণ শক্তিশালী সংস্কৃতির বিকাশ সেখানে হয়নি। প্রবাসীদের বিশ্বাস, নতুন হাইকমিশনার বিষয়টিতে দৃষ্টি রাখবেন।

কোম্পানির দুর্নীতির কারণে বা মালিকের অনিয়মের কারণে অনেক সময় বিপদে পড়তে হয় প্রবাসীদের। শ্রমিকরা অসহায় হয়ে পড়ে অনেক সময়। পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হয়। এমন বিপদে হাইকমিশনকেই বাড়াতে হবে সাহায্যের হাত।

এছাড়া মালয়েশিয়ার বিভিন্ন জেলখানায় সবসময়ই আটক থাকে বাংলাদেশি শ্রমিক। অবৈধ কাজে জড়িত থাকা ছাড়াও অনেকে পুলিশি হয়রানিতে আটক থাকে। এসব বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে যুক্তিসঙ্গত আলোচনার মাধ্যমে সুরাহায় আরও মনোযোগ দিতে হবে নতুন হাইকমিশনারকে।

এমআরএম/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]