সাবলাইম পয়েন্ট ওয়াকিং ট্র্যাক : পাহাড় সমুদ্রের যোগসূত্র

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৫৫ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০

সিডনি শহর গড়ে উঠেছে সমুদ্রের কোল ঘেঁষে। আর সমুদ্রের ঠিক পাড়েই রয়েছে সুউচ্চ পর্বতশ্রেণি। দেখলেই মনে হবে এটা যেন অনেকটা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি শহররক্ষা বাঁধ। সিডনির দক্ষিণের শহর ‘ওলংগং’ যেন সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানেই সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে রয়েছে সুউচ্চ সব পাহাড়।

এসব জায়গাগুলোতে পাহাড়ের উপর থেকে সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখার জন্য রয়েছে একাধিক লুইকআউট। বুলাই এবং সাবলাইম পয়েন্ট ঠিক তেমনি দুটি লুকআউট। এই জায়গাগুলোতে দাঁড়ালে পুরো একশ আশি ডিগ্রিতে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। আর মাঝে মাঝেই মেঘেরা এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় মেঘেদের দেশে।

মেঘ সরে গেলেই আবার সামনের সবুজের পরের অবারিত নীল জলরাশি শরীর এবং মনকে শান্ত করে দেয় মুহূর্তেই। একদিন পরিকল্পনা করে আমি আর আমার দশ বছরের মেয়ে তাহিয়া এবং পাঁচ বছরের ছেলে রায়ান বেরিয়ে পড়লাম সাবলাইম পয়েন্টে। আমাদের সবার্ব মিন্টো থেকে ঘণ্টাখানেকের ড্রাইভ।

jagonews24

সিডনি শহর থেকে যেতে চাইলেও ঘণ্টাখানেকের ড্রাইভ। সাবলাইম লুআউটের পাশেই গাড়ি পার্কিং আছে তাই পার্ক করার ঝামেলা নেই। গাড়ি পার্ক করে আমরা নেমে হেঁটে লুকআউটের গ্রিলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাতাসের একেবারে আমাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সামনেই সমুদ্রের তটরেখা দেখা যাচ্ছে। দেখলে মনে হবে কোনো এক শিল্পী তার নিপুণ তুলির আঁছড়ে আঁকাবাঁকা সমুদ্রের তটরেখাটি এঁকে দিয়েছেন।

সেখানে গ্রিলের বাইরে চেইন ঝুলিয়ে মানুষ তাদের ভালোবাসার তালা ঝুলিয়ে গেছেন। মোট চারটা স্প্যানের চেইনে অনেকগুলো বাহারি রঙের এবং আকৃতির তালা ঝুলানো। সেখান থেকে একটু ডানদিকে হাঁটার পর দেখলাম একটা কাঠের নামফলকে লেখা সাবলাইম পয়েন্ট ওয়াকিং ট্র্যাক। দূরত্ব সাতশ মিটার এবং এটা ওয়ান ওয়ে। আর এটা শিশুদের জন্য উপযোগী না।

ওয়াকিং ট্র্যাকগুলো হাঁটার এবং পথের কাঠিণ্যের উপর ভিত্তি করে মোট পাঁচভাগে ভাগ করা হয়। গ্রেড এক থেকে শুরু করে বেশি কাঠিণ্যের ক্রোম অনুসারে পাঁচে যেয়ে শেষ। এই ওয়াকিং ট্র্যাকটার গ্রেড চার তাই বলা হয়েছে অভিজ্ঞ মানুষদের জন্য এটা উপযোগী। আমাদের সামনে দিয়ে দু’জন ভদ্রলোক ট্র্যাকটির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন দেখে গল্প জুড়ে দিলাম।

Austrelia1

বললাম- আমরা প্রতি শনিবার হাঁটতে বের হয়। আজকে এখানে এসেছি। এখন আপনারা বুদ্ধি দেন বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা কারণ এখানে লেখা আছে বাচ্চাদের উপযোগী না। তারা বললেন হ্যাঁ এটা আসলেই বাচ্চাদের জন্য না। তোমার মেয়ে পারলেও ছেলেটার জন্য অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে কারণ ঢালগুলো একেবারে খাঁড়া। পা ফেলতে হয় খুবই সাবধানে। তোমরা এক কাজ করো। আমাদের পিছু পিছু মই পর্যন্ত চলো তারপর ফিরে এসো।

এখানে ছোটবড় মিলিয়ে মোট সাতটা মই আছে। অগত্যা আমরা তাদের পিছু পিছু মই পর্যন্ত গেলাম। এই রাস্তাটুকু মোটামুটি সহজ। পাথরের কোল ঘেঁষে আবার কখনওবা পাথরের নিচ দিয়ে হেঁটে গেলাম।

মইয়ের কাছে গিয়ে তারা মই বেয়ে নিচে নেমে গেলেন আর আমরা ফিরে আসতে শুরু করলাম। ফিরে আমরা সাবলাইম পয়েন্ট ক্যাফে এবং ফাংশন সেন্টারে নাশতা সেরে নিলাম। এখানে নাশতা এবং দুপুরের খাবার পাওয়া যায়। প্রত্যেকটা টেবিলে সাদা কাগজ বিছিয়ে দেয়া হয়। আর সাথে দেয়া হয় রং পেন্সিল যাতে বাচ্চারা খেতে খেতে আঁকিবুকি করতে পারে। আমরা জানালার ধারে একটা টেবিলে বসে পড়লাম।

Austrelia2

এখানে নাশতা করতে করতেও নিচের ভিউ দেখা যায়। এরপর থেকেই পরিকল্পনা করছিলাম একদিন একা একা গিয়ে পুরো ওয়াকটা শেষ করব। এবং সেটা শুরু করতে হবে নিচ থেকে তাহলে নামার সময় আর কষ্ট হবে না।

এরপর একদিন সকাল সকাল ছেলে-মেয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে একা একা বেরিয়ে পড়লাম। সাবলাইম পয়েন্ট ওয়াকের অন্য প্রান্ত শুরু হয়েছে ফুটহিল রোড থেকে। ফুটহিল রোডেই গাড়ি পার্কিং করা যায় তবে বেশি শব্দ না করাই ভালো কারণ পাহাড়ের কোলে সেটা একটা আবাসিক এলাকা। আমি যতবারই ওখানে গেছি ওখানকার মানুষগুলোকে মনে মনে ঈর্ষা করেছি।

বেশিরভাগ বাড়ির পেছনের বারান্দা বনের মধ্যে প্রসারিত। সেখানে ইজি চেয়ারে বসে থাকার চেয়ে জীবনের শান্তির আর কাজ আছে। বনের নিজস্ব একটা গুঞ্জন আছে। তার বাইরে অবিরাম ঝিঁঝি পোকার ডেকে চলা, বিভিন্ন রকমের পাখ-পাখালির ডাক পুরো পরিবেশটাকে একটা অতিপ্রাকৃতিক রূপ দেয়। ঘরে ফিরতে আর ইচ্ছে করে না মোটেও।

গাড়িটা পার্ক করেই হাঁটা শুরু করলাম। শুরুতে কিছু দূর সমতলে যাওয়ার পর রাস্তাটা উঁচু পাহাড় বেয়ে উপরে উঠে গেছে। প্রথম ধাপটা অতিক্রম করার পর রাস্তাটা দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একটা গেছে বামদিকে সমতল বরাবর যেটা আবার শেষ হয়েছে ফুটহিল রোডে এসেই। এই ট্র্যাকটার না ‘গিবসন ট্র্যাক’। আর সোজা উপরে চলে গেছে সাবলাইম পয়েন্ট ট্র্যাক। আমি সমতল জায়গাটাতে পাতা কাঠের বেঞ্চে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিলাম।

Austrelia4

এভাবে কিছুদূর উঠার পরপর বিশ্রাম নেয়ার জন্য কাঠের বেঞ্চ পাতা আছে। খাড়া পাহাড়ে উঠার জন্য দমের দরকার হয়। আমি এই বেঞ্চগুলোতে জিড়িয়ে নিয়ে আবার উঠা শুরু করতে পারেন। আমি প্রথমবার উঠছিলাম তাই বেশি ক্লান্তি বোধ হচ্ছিল।

বিশ্রাম নিয়ে আবারও হাঁটা শুরু করলাম। আসলে হাঁটা না বলে সিঁড়ি ভাঙা বলায় ভালো। পাহাড়ের উঁচু খাঁজে খাঁজে কাঠের ছোট ছোট পাত বসিয়ে সিঁড়ির আকার দেয়া হয়েছে। কিছুদূর উঠার পর দেখলাম চারজন বৃদ্ধা নেমে আসছেন। এসব কঠিন কাজেও এখানে বৃদ্ধদের দেখা যায়। আসলে উন্নত দেশগুলোতে বয়স্ক মানুষদেরও যে একটা আলাদা জীবন আছে সেটা খুব পরিষ্কারভাবে চোখে পড়ে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম আর কতদূর আর কতটাই বা কঠিন। তারা জানালেন তোমার উঠার সময় কষ্ট হবে কিন্তু নামার সময় মনে হবে উঠার কষ্টটা সার্থক। আর শোনো শরীরের উপর চাপ নিয়ো না। একবারে যতটুকু উঠতে পারো উঠবে তারপর দরকার হলে সে জায়গাতেই বসে বিশ্রাম নেবে। তাদের একটা কথা আমার খুব পছন্দ হলো ‘লিসেন টু ইউর বডি’।

Austrelia6

আমি আবারও নব উদ্যোমে উপরে উঠা শুরু করলাম। চারপাশের পরিবেশ অনেক সুন্দর কিন্তু উঠার সময় সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার ফুরসৎ মিলবে না কারণ সিঁড়িগুলো একেতো খাড়া আর বেশ সরু। আর সিঁড়ি ভাঙতে যেয়ে আপনি এতটাই ক্লান্ত হয়ে যাবেন যে আশপাশে তাকানোর কথা মনে পড়বে না। এভাবে উঠতে উঠতে অনেকের সাথেই দেখা হলো।

সবার সাথেই হালকা কুশল বিনিময় হচ্ছিল। একজন আমার দূরবস্থা দেখে বললেন তোমার সাথে এক বোতল পানি রাখা দরকার ছিল, তুমি চাইলে আমার বোতলটা নিয়ে যেতে পার। আমি বল্লাম না আজকে আর পানি খাচ্ছি না, আসলে সকালে পেটভরে নাস্তা খেয়ে এসেই ভুল করেছি তা নাহলে এত কষ্ট হত না। আর অবশ্যই একটু ভালো মানের কেডস পরে নিতে হবে তাহলে সিঁড়ি ভাঙার কষ্টটা অনেকখানি লাঘব হয়ে যাবে।

এভাবে উঠতে উঠতে একটা সময় মইগুলোর গোড়ায় চলে আসলাম। সেখানে গিয়ে দেখি এক বাবা তার ছয় বছর এবং চার বছর বয়সী দুই বাচ্চাকে নিয়ে নামছে। আমি ছোট বাচ্চাটাকে দেখে বললাম তোমার তো অনেক সাহস। উত্তরে সে আমাকে বলল কি যে বলো না তুমি, আমিতো এর চেয়ে আরও কঠিন কাজও করতে পারি। আমি তাকে বললাম তুমি সিঁড়িতে একটু দাঁড়াও তোমার ছবি তুলে নিই, আমার ছেলেকে দেখাব তাহলে এরপর আমি তাকেও নিয়ে আসতে পারব।

Austrelia7

তোমাকে দেখে অনেকটা উৎসাহ পাচ্ছি। এরপর ওরা আমাকে হাই ফাইভ দিয়ে এবং শুভ কামনা জানিয়ে নিচের দিকে যাওয়া শুরু করলো। আর আমি মইয়ের সিঁড়ি ভাঙা শুরু করলাম এবং একটা সময় উপরে পৌঁছে গেলাম। উপরের সৌন্দর্যের বর্ণনা তো আগেই দিয়েছি। উপরে এসে আমি পাবলিক টিপকল থেকে পানি নিয়ে চোখে মুখে দিয়ে এবং কিছুটা খেয়ে আবার নিচের দিকে নামা শুরু করলাম।

নিচে নামার সময় বুঝতে পারলাম মানুষ এত কষ্ট করে হলেও উপরে উঠে। শারীরিক ব্যায়াম ছাড়াও নিচে নামার সময় মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করে। নিচে নামার প্রক্রিয়াটা আমার কাছে মনে হয়েছে আমি যেন পাখি হয়ে উড়ে উড়ে নামছি। মাঝে মাঝেই কোমল ঠাণ্ডা বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল।

আর বন বনানীর ফাঁকা দিয়ে কাছেই সমুদ্রকে দেখা যাচ্ছিল। নামার সময় আমিও অনেককে উৎসাহ দিলাম বিশেষ করে যারা সেদিনই প্রথম এসেছে। আপনিও চাইলে চলে যেতে পারেন সিডনির অদূরে সাবলাইম ওয়াকিং ট্র্যাকে যেখানে সাগর এবং পাহাড় মিতালি করে।

মো. ইয়াকুব আলী মিন্টো, সিডনী, অস্ট্রেলিয়া/এমআরএম/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]