এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আশ্রিত শরণার্থীদের কাছে ‘আত্মহত্যাই সমাধান’

রাকিব হাসান রাফি
রাকিব হাসান রাফি রাকিব হাসান রাফি , স্লোভেনিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৬:৫১ পিএম, ৩০ ডিসেম্বর ২০২০

কয়েক বছরের বন্দিদশার ফলে গ্রিসের সীমান্তবর্তী এজিয়ান সাগরের বিভিন্ন দ্বীপে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের মাঝে দিনে দিনে প্রকট হয়ে উঠছে মানসিক বিষণ্নতা। ইতোমধ্যে তাদের কারও অবস্থা এতটা জটিল হয়ে উঠেছে যে তারা মনে করছেন আত্মহত্যাই তাদের জীবনের একমাত্র সমাধান।

সম্প্রতি গ্রেট ব্রিটেনভিত্তিক গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এমনটি বলা হয়েছে। ছোট-বড় সব মিলিয়ে গ্রিসে প্রায় ৬০০০ এর মতো আইল্যান্ড রয়েছে, গ্রীষ্মকালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য পর্যটক এ সকল আইল্যান্ডে বেড়াতে আসেন। বলাবাহুল্য এ সকল আইল্যান্ড গ্রিসের পর্যটনখাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

হলিউড থেকে শুরু করে বলিউড কিংবা বিশ্বের অনেক বিখ্যাত সিনেমার সুটিং হয় সান্তোরিনি, ক্রেতে, মিকোনোস, প্যাক্সোসসহ গ্রিসের বিভিন্ন আইল্যান্ডে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিসে শরণার্থীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গ্রিসের সরকার অনেক শরণার্থীকে এ সকল দ্বীপে আশ্রয় দিয়েছেন।

এছাড়াও কোভিড-১৯ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৩০০ এর মতো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী নাগরিকদের গ্রিক সরকার এ সকল আইল্যান্ডে স্থানান্তরিত করে।

উল্লেখ্য, গ্রিসে সব মিলিয়ে ৬,০০০ এর মতো আইল্যান্ড থাকলেও মাত্র ২২৭টি আইল্যান্ডে জনবসতি রয়েছে যাদের বেশিরভাগের অবস্থান দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় এজিয়ান সাগরে।

বর্তমানে গ্রিসে যে সকল দ্বীপে শরণার্থী শিবির গড়ে তোলা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লেসবস, সামোস, চিওস ইত্যাদি। তাদের মধ্যে লেসবসে অবস্থিত মোরিয়া নামক শরণার্থী শিবিরটিকে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরের মধ্যে একটি ধরা হয়। যেখানে প্রায় ১৩,০০০ এর মতো মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন কিন্তু সম্প্রতি এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে এ রিফিউজি ক্যাম্পটি আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

এজিয়ান সাগরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গ্রিসের সঙ্গে প্রতিবেশি তুরস্কের বৈরিতা দীর্ঘদিনের। এজিয়ান সাগরে গ্রিসের মালিকানাধীন অনেক দ্বীপ রয়েছে যেগুলো গ্রিসের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে কিন্তু তুরস্কের মূল ভূ-খণ্ড থেকে সেগুলো কাছে। এ কারণে চাইলেও এ সকল দ্বীপে শরণার্থীদের অনেকে দ্বীপের বাহিরে অন্য কোথাও যাতায়াত করতে পারেন না।

এছাড়াও এ সকল শরণার্থী শিবিরে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা অপ্রতুল। আসন্ন শীতের আগমন যেনও এ সকল রিফিউজে ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের মাঝে বাড়তি দুর্ভোগ যোগ করেছে। ভূ-মধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশ হওয়ায় গ্রিসে অন্যান্য ঋতুর তুলনায় শীতকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়ে যায়।

পরিকল্পিত অবকাঠামো না থাকায় বৃষ্টিপাতেও অনেক শরণার্থী শিবির ভেসে যায়। এ সকল শরণার্থীক শিবিরে অনেক রিফিউজি আছেন যারা প্রায় পাঁচ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন, অনেকে কয়েক বছর পূর্বে গ্রিসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন কিন্তু তাদের আবেদনের বিষয়ে দেশটির সরকার কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি।

গ্রিসের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস অনেকটা রক্ষণশীল এবং অতি ডানপন্থী মনোভাবের একজন রাজনীতিবিদ। যদিও বর্তমানে ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় গ্রিসে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি কিন্তু শরণার্থীদের বিষয়ে কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস সরকারের অবস্থান একেবারে ঋণাত্মক।

যদিও গ্রিস ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং একই সাথে সেনজেনের সদস্য রাষ্ট্র তবে আক্ষরিক অর্থে গ্রিস সেনজেনভুক্ত অন্যান্য দেশের চেয়ে একেবারে বিচ্ছিন্ন। গ্রিসের প্রতিবেশি দেশ আলবেনিয়া, মেসিডোনিয়া ও তুরস্ক ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে কিন্তু এখনও তারা ইইউ এর সদস্য হতে পারেনি।

আরেক প্রতিবেশী বুলগেরিয়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করে ২০০৭ সালে। গ্রিসের সবচেয়ে কাছের সেনজেনভুক্ত দেশ হচ্ছে হাঙ্গেরি ও ইতালি কিন্তু দেশটির রাজধানী এথেন্স থেকে ইতালির রাজধানী রোম ও হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের দূরত্ব যথাক্রমে ৫৪৮ মাইল ও ৬৭৭ মাইল।

স্থলপথে সরাসরিভাবে গ্রিসের সঙ্গে এ দুই দেশের সংযোগ নেই। অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত দিক থেকেও গ্রিস ইইউভুক্ত অনেক দেশের থেকে পিছিয়ে। বর্তমানে গ্রিসে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। এছাড়াও বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের অনেক নাগরিকও দেশটিতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন।

হাঙ্গেরির ইউনিভার্সিটি অব পেচে অধ্যয়নরত এক গ্রিক শিক্ষার্থী জেঅ্যানে টিসাভদারি এক সাক্ষৎকারে জানিয়েছেন, ‘গ্রিক জাতির চিরন্তন রীতি হচ্ছে অতিথিপরায়ণতা, বাহিরের দেশের কোনও নাগরিক যদি আমাদের দেশে আসেন তাহলে সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে আমরা তাদের আপ্যায়নের চেষ্টা করি।

এটা এমন একটা ধারা যা কয়েক সহস্রাব্দ ধরে চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা আমাদের এ চিরায়ত রীতি থেকে অনেকটা সরে আসতে বাধ্য হচ্ছি। বিশেষত বিভিন্ন দেশ থেকে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীরা আমাদের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ যোগ করছে।

‘এদের অনেকে আমাদের চিরায়ত যে সংস্কৃতি সেটার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। রাস্তা-ঘাটেও অবাধভাবে চলাচল করা কঠিন হয়ে উঠছে অনেক সময় তাদের আচরণের জন্য। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং একই সাথে সাম্প্রতিক সময়ের ঋণ সমস্যা আমাদের অর্থনীতিকে একেবারে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।’

জেঅ্যানে আরও বলেন, ‘গ্রিসের থেকে প্রতিনিয়ত তরুণ প্রজন্মের অনেকে জার্মানি, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। এমন অবস্থায় সত্যি এ সকল শরনার্থীদের অবস্থান সত্যি আমাদের জন্য বাড়তি চাপ, ধারণ ক্ষমতারও অনেক বেশি শরণার্থী আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে।

‘এমনকি প্রতিবেশী তুরস্ক, মেসিডোনিয়া ও আলবেনিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুব বেশি একটা ভালো না হওয়ায় চরম উত্তেজনার মুহূর্তে তারা আমাদের দেশে অনেক রিফিউজি পুশ করছে।’

শরণার্থী সমস্যা সমাধানে জেঅ্যানে কোটাভিত্তিকভাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের মাঝে এ সকল শরণার্থী বণ্টনের প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোকে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় চিরস্থায়ী শান্তিস্থাপনে কার্যকরি সমাধান বের করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]