অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে

রাকিব হাসান রাফি
রাকিব হাসান রাফি রাকিব হাসান রাফি , স্লোভেনিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৭:০৬ পিএম, ১৭ জানুয়ারি ২০২১

পূর্ব ইউরোপের দেশ হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো আবারও অভিযোগ করেছে, দেশটি ইউরোপিয় ইউনিয়নের অভিবাসন আইনের তোয়াক্কা করছে না। গত ১৭ ডিসেম্বর ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসও তাদের এক প্রতিবেদনে একই অভিযোগ করেছে।

স্থানীয় এক এনজিওর বিবৃতি অনুযায়ী, গত মাসে হাঙ্গেরি ২৩০০ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি সার্বিয়ায় পুশব্যাক করেছে। এমনকি সার্বিয়া ও ইউক্রেন সীমান্তে দেশটি প্রায় ১০৯ মাইল দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে কাজ করা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে হাঙ্গেরি একমাত্র দেশ যারা তাদের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বহাল রেখেছে। যদিও দেশটির প্রধানমন্ত্রী অর্বান ভিক্টর জানিয়েছেন, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং বর্তমান সময়ে করোনা মহামারির বিস্তার ঠেকাতে তার সরকারের এ সিদ্ধান্ত।

সম্প্রতি হাঙ্গেরিয়ান পুলিশ অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আফগানিস্তান থেকে আগত এক গর্ভবতী নারীকে আটক করে। তাকে প্রাথমিকভাবে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরে রাতের আঁধারে তাকে সার্বিয়ার সীমান্তে পুশব্যাক করা হয়। কিন্তু সার্বিয়ান পুলিশও তার দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।

ইতোমধ্যে বিবিসি, সিএনএন, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, দ্য গার্ডিয়ানসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি ও সার্বিয়ান পুলিশের শারীরিক নির্যাতনের চিত্র অসংখ্যবার ওঠে এসেছে। মাইগ্রেশন অ্যাকসেপটেন্স ইনডেক্স অনুযায়ী, হাঙ্গেরি বিশ্বের সবচেয়ে কম অভিবাসনবান্ধব দেশগুলোর একটি।

শুধু অভিবাসনপ্রত্যাশীরাই নয়, দেশটিতে বসবাসরত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার। রোমা নামক এক বিশেষ নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে হাঙ্গেরিসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে। তাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য অধিকার থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত।

হাঙ্গেরিতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব পেচের এক মেডিকেল শিক্ষার্থী আব্দুল জলিল সাদাহ। তিনি বলেন, ‘অভিবাসী হিসেবে সত্যি এখন হাঙ্গেরিতে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারা প্রায় অসম্ভব। ছয় বছর ধরে আমি হাঙ্গেরিতে বসবাস করছি। এখানকার ভাষাও আয়ত্ত করেছি। কিন্তু যখন হাসপাতালে রোগী দেখতে যাই, আমার ত্বকের রঙ ভিন্ন বলে অনেকেই বিভিন্নভাবে তাচ্ছিল্য করে।’

‘অনেক রোগী আমাকে দেখলে দূরে সরে যায়। তখন মনে হয়, আমি বুঝি ভিনগ্রহের একজন মানুষ। এমনকি আমার শিক্ষকেরাও আমার সঙ্গে বিরূপ আচরণ করে। নিজদেশ ইয়েমেনের অবস্থা ভালো হলে আমি সেখানে ফিরে যেতাম।’

ইউনিভার্সিটি অব পেচের জিওগ্রাফি শিক্ষক অধ্যাপক ড. আন্দ্রাস ট্রচসচায়াননি বলেন, ‘আমাদের বর্তমান সরকার অনেকটা নাৎসি ভাবধারায় একনায়কতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করছে। সংবাদমাধ্যমসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা অনেকটা খর্ব করে ফেলেছে। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে সরকার তার নিজের ইচ্ছামাফিক সংবিধানকে পরিবর্তিত করেছে।’

‘আমরা নামে ইইউভুক্ত রাষ্ট্র, বাস্তবে আমাদের দেশের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা তলানিতে এসে ঠেকেছে, সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের মাঝে বড় তারতম্যের সৃষ্টি হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকে হাঙ্গেরি ছেড়ে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়েসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের আর্থিক উন্নতির জন্য এখন ইমিগ্র্যান্টদের প্রয়োজন। কিন্তু সরকার এ বিষয়টা বিবেচনা না করে হাঙ্গেরিতে তাদের সুযোগের পথ সীমিত করে ফেলেছে। অনেকটা সুপ্রিমেসির মধ্য দিয়ে সরকার দেশ পরিচালনা করছে। যে কারণে এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে।’

এদিকে দেশটিতে বসবাস করা এক প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বলেন, ‘এখানে এসে আমি রীতিমতো হতাশ। একই কোর্স অথচ অনেক সময় দেখা যায় হাঙ্গেরিয়ান স্টুডেন্টদের জন্য এক ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি, আমাদের জন্য সেটা সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের।’

‘আমরা যারা ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট আমাদের জন্য একটা সেকশন আর হাঙ্গেরিয়ান স্টুডেন্টদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা সেকশন। শিক্ষকেরাও হাঙ্গেরিয়ান স্টুডেন্টদের প্রতি অধিক যত্নবান, আমাদের তারা তেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন না। ডরমেটরিতেও আমাদের ফ্লোর সম্পূর্ণ পৃথক।’

তিনি আরও বলেন, ‘একবার এক শিক্ষার্থী তাদের ফ্লোরের রান্নাঘরে গিয়ে ডিম সিদ্ধ করেছিল, এজন্য ডরমেটরি কর্তৃপক্ষ শাস্তিস্বরূপ আমাদের ফ্লোরের রান্নাঘর দুই দিন বন্ধ রেখেছিল। রাস্তা-ঘাটে চলাফেরার সময়ও আমাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকে আমাদেরকে জিপসিদের সঙ্গে তুলনা করে।’

ইউরোপিয়ান কমিশন ইতোমধ্যে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের জন্য হাঙ্গেরির সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রাসেলসে অবস্থিত হাঙ্গেরিয়ান অ্যাম্বাসির রাষ্ট্রদূতকে এ বিষয়ে তলব করা হয়েছে, যদিও তিনি এর প্রতিক্রিয়ায় এখনও কিছু জানাননি।

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]