২০২০ সালে বসনিয়ায় ৭ হাজার শরণার্থীকে ফিরিয়ে দিয়েছে ক্রোয়েশিয়া

রাকিব হাসান রাফি
রাকিব হাসান রাফি রাকিব হাসান রাফি , স্লোভেনিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৪:৫৯ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২১

গত বছর ৭ হাজার ২১০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে বসনিয়ায় ফিরিয়ে দিয়েছে ক্রোয়েশিয়া প্রশাসন। বসনিয়ার অন্যতম প্রশাসনিক অঞ্চল উনা সানার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নেরমিন ক্লিয়াইচ দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার আয়োজিত নিরাপত্তা বিষয়ক এক অধিবেশনে এ তথ্য জানিয়েছেন।

নেরমিন বলেন, ক্রোয়েশিয়ার সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে তাদের দেশে আটক হওয়া সব নাগরিককে আমাদের দেশে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কেননা তাদের দাবি, এসব শরণার্থীর সবাই বসনিয়া হয়ে ক্রোয়েশিয়াতে প্রবেশ করে। কিন্তু আমরা জানি, সব শরণার্থীকে বসনিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে তাদের সার্বিয়া কিংবা মন্টিনিগ্রোর সীমানা পাড়ি দিতে হয়।

তিনি বলেন, ক্রোয়েশিয়া যদি অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে তাদের দেশে আটক হওয়া সব নাগরিককে আমাদের কাছে ফেরত পাঠাতে পারে, আমরা কেনও তাদের সার্বিয়া কিংবা মন্টিনিগ্রোতে ফেরত পাঠাচ্ছি না? আমাদের ফেডারেল সরকার এত কিছুর পরও তাদের বিষয়ে একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারছে না, যা সত্যি হতাশাজনক।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের জরিপ অনুযায়ী, বসনিয়াতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীর সংখ্যা ৯ হাজারের কাছাকছি। তবে স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের দাবি, বাস্তবে দেশটিতে এরও তিনগুণ শরণার্থী বাস করছেন, যাদের বেশিরভাগ আশ্রয় নিয়েছেন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ক্রোয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহে।

বর্তমানে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের জন্য পৃথিবীর অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষের কাছে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ বসনিয়া অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। বসনিয়াতে বর্তমানে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের প্রায় সবারই লক্ষ্য প্রতিবেশী দেশ ক্রোয়েশিয়া হয়ে স্লোভেনিয়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স কিংবা পর্তুগালে পা রাখা।

অনেক শরণার্থী ইতোমধ্যে বসনিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়া হয়ে স্লোভেনিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু এ দুই দেশের পুলিশের তৎপতার কারণে তাদের বাধ্য হয়ে বসনিয়াতে ফেরত আসতে হয়।

বসনিয়াতে আশ্রয় নেয়া এক পাকিস্তানি শরণার্থী সাদ্দাম হোসাইন ঘুমানি স্থানীয় গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি এর আগে কয়েকবার চেষ্টার পর একবার ক্রোয়েশিয়ার সীমানায় পৌঁছাতে সক্ষম হই। কিন্তু ভাগ্য ভালো না থাকায় স্থানীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়ি। তারা আমাকে বন্দি করে এবং আমার কাছে টাকা-পয়সা থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনসহ যা ছিল সব ছিনিয়ে নেয়।

‘এমনকি আমার পায়ের জুতাটিও আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়। আমাকে তারা লাঠি দিয়ে অনেক জোরে আঘাত করে, ফলে আমার পিঠের একটি হাড় ভেঙে যায়। এ অবস্থায় তারা আমাকে বসনিয়াতে পাঠিয়ে দেয়।’

বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে শরণার্থীদের ওপর ক্রোয়েশিয়া পুলিশের শারীরিক নির্যাতনের খবর বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছে। যদিও ক্রোয়েশিয়ার পুলিশ এ ধরনের অভিযোগ সব সময় অস্বীকার করে আসছে।

দেশটির পুলিশ প্রশাসনের মুখপাত্র ডেভর বোজিনোভিচ বলেছেন, আমরা কখনও নিয়ম বহিৰ্ভূত কোনও কাজকে সমর্থন করতে পারি না। অনেক সময় এসব শরণার্থীদের অনেকে এমন কিছু অন্যায় আচরণ করে যার কারণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা বাধ্য হই, কিন্তু সব সময় এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে আমরা মানবিকভাবে বিবেচনার চেষ্টা করি।

ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার ডুনিয়া মিয়াটোভিচ জানিয়েছেন, ক্রোয়েশিয়া তাদের সীমানায় আটক হওয়া সব অবৈধ অভিবাসীকে কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থন কিংবা অ্যাসাইলাম আবেদনের সুযোগ না দিয়ে জোরপূর্বক বসনিয়ায় পাঠিয়ে দিচ্ছে, যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অভিবাসন আইনের পরিপন্থি। এ ধরনের ঘটনা সত্যি দুঃখজনক।

এদিকে, তীব্র শীত ও ভারী তুষারপাতের ফলে বসনিয়ায় আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের মাঝে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তাদের অনেকের জীবন। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো সেকেন্ড ওয়েভে বসনিয়াতে ক্রমাগত করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশটিতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের অনেকে প্রবল স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ঠাণ্ডাজনিত শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন অনেক শরণার্থী।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]