টিনের স্লেট

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ০৪:০৬ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আমাদের সময় লেখাপড়ার হাতেখড়ি হত আদর্শলিপি বই আর টিনের স্লেটে চক দিয়ে লেখার মধ্য দিয়ে। ক্লাসের হিসেবে তখন ছোট ওয়ান, বড় ওয়ান তারপর ক্লাস টু। অ-তে অজগরটি আসছে তেড়ে, আ-তে আমটি আমি খাব পেড়ে।

১, ২ নিয়েও এ রকম ছড়া ছিল, যেটা এখন আর ভালোভাবে মনে করতে পারছি না। হাট থেকে আব্বা সস্তার টিনের স্লেট এনে দিতেন সঙ্গে হয়তোবা একটা দুইটা চক কিন্তু অনেক বেশি লেখার কারণে দু’এক দিনের মধ্যেই চকটা ক্ষয় হয়ে যেত। তখন মায়ের কাছে বায়না ধরতাম আমরা নতুন চকের জন্য।

কিন্তু মায়ের হাতে বেশিরভাগ সময়ই পয়সা থাকত না। তখন মা আমাদেরকে চক বানানোর একটা সহজ উপায় বাতলে দিতেন। গোসল করতে গিয়ে আমরা পুকুরের পাড় থেকে নরম এঁটেল মাটি দলা বানিয়ে তুলে আনতাম। তারপর সেটা প্রথমে ছেনে তারপর হাতের তালুতে নিয়ে মাটির ওপর ঘষে ঘষে লম্বা আকৃতি দিতাম আমরা।

এরপর সেগুলোকে রোদে শুকাতে দেয়া হত। রোদে শুকিয়ে গেলে সেগুলোকে মাটির চুলাতে রান্নার শেষে যে আগুন থাকে সেই আগুনের মধ্যে ফেলে ঢেকে দিতাম। এরপর একটা সময় মা সেই আগুনের ছাইগুলোকে ফেলার সময় বেছে বেছে চকগুলোকে আলাদা করে দিতেন। হাতে বানানো এই চকগুলো সাধারণ চকের মতো অতটা মোটা হত না।

jagonews24

আর এগুলোর বর্ণও সাধারণ চকের মতো সাদা হত না বরং মাটির রং অনুযায়ী এক একটা এক এক রঙের হত। সেগুলো দিয়ে আমরা লিখতাম। আর লেখা মুছে ফেলার জন্য মা পুরোনো কাপড়ের একটা ছোট পুঁটলি বানিয়ে দিত। সেটা পানিতে ভিজিয়ে ভিজিয়ে মোছার এবং পুনরায় লেখার কাজটা চলত। এক এক একটা অক্ষর লেখার পর আমরা সবাইকে দেখিয়ে বেড়াতাম কারটা সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে।

আমরা পাড়ার ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে দলবেঁধে স্কুলে যেতাম। তারপর কোরাসে ওপরের ওই ছড়াগুলো পড়তাম। আর স্যার/আপারা লিখতে দিলে কে কার আগে লিখে স্যারকে দেখাতে পারে, সেটা নিয়ে আমাদের মনে এক ধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করত। লেখা জমা দেয়ার ব্যাপারে আমি বরারই সবার আগে থাকতাম।

একটা জমা দেয়া হয়ে গেলে অন্য লেখাটা নিয়ে আগেই স্যারের টেবিলের পাশে ঘুরঘুর করতাম। এমনই একদিন কোনো কারণে আমি সবার আগে লেখাটা জমা দিতে পারলাম না। আমার আগেই আমার ক্লাসের প্রবাল নাম অন্য একটা ছেলে লেখাটা জমা দিয়ে দিলো। সেটা দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হলো ছেলেটার ওপর। সেই রাগ ঝাড়ার জন্য হাতে ধরা টিনের স্লেট দিয়ে ওর মাথা বরাবর একটা ঘা বসিয়ে দিলাম।

সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে ওর মাথা থেকে রক্ত বের হয়ে এল। সারা ক্লাস রক্তে মাখা-মাখি হয়ে গেল। স্যার ম্যাডাম সবাই তখন ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর আমি সুযোগ বুঝে দ্রুত ক্লাস থেকে বের হয়ে বাড়ি যেয়ে মায়েরর অজান্তে সোজা খাটের তলায় ঢুকে পড়লাম। তারপর প্রবালের পুরো পরিবার আমাদের বাড়ি এসে আমার মায়ের কাছে নালিশ দিলো।

jagonews24

এরপর অবধারিতভাবেই আমার কপালে জুটেছিল মায়ের বকুনি। পাড়ার সম্পর্কে প্রবালের মাকে আমরা কর্তা মানে দাদি বলে ডাকতাম। সেই হিসেবে প্রবালের সঙ্গে আমাদের কাকা-ভাতিজার সম্পর্ক ছিল। একই ক্লাসে পড়া ছাড়াও আমরা সারা পাড়াময় দাঁপিয়ে বেড়াতাম দলবেঁধে।

আর সবধরনের কাজেই আমরা দু’জন দলনেতা হয়ে বসতাম। বড় হয়ে যাওয়ার পর একদিন প্রবালের সঙ্গে দেখা। ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করতেই প্রবাল বলল, ভাতিজা কি যে এক ঘা দিছিলা এখনও আমার মাথার ওই জায়গায় চুলা ওঠে নাই। বলে মাথাটা আমার দিকে ঝুকিয়ে দিলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম সত্যিই ওর মাথার মাঝামাঝি জায়গায় অনেকখানি জায়গাজুড়ে গড়ের মাঠ। এভাবেই আমাদের লেখাপড়ার পাঠ শুরু হয়েছিল।

এরপর নিজে যখন সন্তানের পিতা হলাম তখন আমার মনের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ভাবনা কাজ করছিল যদি আমাদের মেয়ে তাহিয়াকেও আমাদের ছোটবেলার মতো আদর্শলিপি আর স্লেট দিয়ে লেখাপড়াটা শুরু করাতে পারতাম। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে উত্তরার আজমপুর ওভারব্রিজের নিচের ফুটপাত দাঁড়ালাম।

সেখানে সোবহান ভাইয়ের একটা অস্থায়ী দোকান। সেখানে বিভিন্ন প্রকার পত্রিকার পাশাপাশি দৈনন্দিন বই পুস্তক এমনকি বড় বড় উপন্যাসের বইও পাওয়া যায়। সোবহান সাহেবকে আমার মনের ইচ্ছের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্লাস্টিকের মোড়াকে বাঁধানো রংচঙা একখানা আদর্শলিপি ধরিয়ে দিলেন।

jagonews24

আদর্শলিপিতো সহজেই জোগাড় হয়ে গেল। আর মুদি দোকান থেকে নিয়ে আসলাম চকও। কিন্তু গোল বাঁধলো স্লেট খুঁজতে গিয়ে। স্লেটের চল উঠেই গেছে তখন। অনেক খোজাঁখুজি করেও স্লেট জোগাড় করতে পারলাম না। এর মধ্যেই একদিন অফিসের কাজে একবার খুলনা গিয়েছিলাম। সাইটের কাজ পরিদর্শন শেষ করে ফিরছিলাম এক বিকেলে।

ডমুরিয়া বাজার পার হতে হতেই মনে পড়ল ছোটবেলায় আব্বা তো হাট থেকেই আমাদের জন্য স্লেট কিনে এনেছিলেন। ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হলে হয়তোবা টিনের স্লেট পেয়ে যেতে পারি। বাজার পার হয়ে গাড়ি থেকে নেমে বাজারে গিয়ে বিভিন্নজনকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম, এখানে কোথাও স্লেট পাওয়া যায় কি না।

একজন বললঃ বাজারের মাঝামাঝি একটা বই খাতার দোকান আছে ওখানে দেখতে পারেন। আমি খুঁজে খুঁজে অবশেষে দোকানটা পেয়ে গেলাম। দোকানিকে আমার ইচ্ছের কথা বলতেই তিনি বললেনঃ আমার কাছে স্লেট আছে তবে সেটা টিনের না প্লাস্টিকের। আমি দেখাতে বললাম। তিনি বের করে দেখালেন। স্লেটটা হুবহু আমাদের শৈশবের টিনের স্লেটের মতো কিন্তু শুধুমাত্র প্লাস্টিকের তৈরি।

এরপর সেটাই কিনে নিয়ে আসলাম এবং মেয়েকে লেখাতে শুরু করলাম। মেয়ে এটা পেয়ে খুবই খুশি হলো। একই লেখা বারবার লেখে আর মুছে ফেলে আবার লেখে। এভাবেই ও একটা সময় বাংলা বর্ণমালা থেকে শুরু করে অংক সবই লেখা শিখে গেল। এরপর ফেব্রুয়ারি মাস আসলে ওকে বললাম আমাকে একুশ লিখে দেখাও।

ও তখন আমাকে প্রশ্ন করলো শুধুমাত্র একুশ কেন। আমি বললাম কারণ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের দেশের ছাত্ররা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দাবি করে রক্ত দিয়েছিল। যে কারণে এখন আমি তুমি বাংলায় কথা বলতে এবং লিখতে পারছি। সে কি বুঝলো জানি না কিন্তু গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে আমাকে অনেক বড় আকারের একটা ২১ লিখে দেখালো। খুশিতে আমি ক্যামেরায় ওর লেখাটার ছবি তুলে রাখলাম।

jagonews24

এরপর জীবনের বহমানতায় একটা সময় অস্ট্রেলিয়ার সিডনি এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলাম। এতদিনে আমাদের পরিবারে আরো একজন সদস্য যোগ হয়েছে। তার নাম রায়ান। রায়ানও একটা সময় বড় হয়ে গেল। এক সময় ওর স্কুলে যাওয়ার ক্ষণও ঘনিয়ে এলো কিন্তু আমার মনে ইচ্ছে ছিলো বাংলাদেশের আদলে ওকেও হাতেখড়ি দেয়ানোর।

সিডনিতে অনেক সংগঠনই সরস্বতী পূজা পালন করে। আমাদের বাসার কাছাকাছি আগমনী অস্ট্রেলিয়া এবং শঙ্খনাদ নাম দুটো সংগঠন পূজা উৎসবগুলো পালন করে থাকে। আমি আগে থেকেই জানতাম সরস্বতী পূজার সময় হাতেখড়ি দেয়া হয় তাই সরস্বতী পূজাকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিতে থাকলাম।

চক খুব সহজেই জোগাড় হয়ে গেলো মুশকিল হলো স্লেট খুঁজতে গিয়ে। অনলাইনে খুঁজেও পেলাম কিন্তু সেগুলোর ডেলিভারি আসতে আসতে পূজা পার হয়ে যাবে। এরপর সরস্বতী পূজার কয়েকদিন আগে আমাদের বাসার পাশের মিন্টো মার্কেটপ্লেসের কেমার্ট চেইনশপ যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম স্লেট পাওয়া যায় কি না?

ওরা আমার কথা ঠিক বুঝলো না তখন গুগল করে স্লেটের ছবি দেখলে জানালো ওরা এমনই একটা জিনিস বিক্রি করে কিন্তু নিশ্চিত না এখন স্টকে আছে কি না। বলে আমাকে একটা দিক দেখিয়ে বললেনঃ ওখানে গিয়ে দেখতে পারেন। আমি অনেক খুঁজে একটা জায়গায় অবশেষে স্লেট পেয়ে গেলাম যদিও সেটা সাধারণ স্লেটের তুলনায় দ্বিগুণ আকৃতির কিন্তু স্লেটতো তাই নিয়ে নিলাম।

এরপর সরস্বতী পূজার দিন অফিস থেকে অর্ধেক দিন ছুটি নিয়ে আসলাম হাতেখড়ি দেয়ানোর জন্য। বাসায় ফিরে তাহিয়াকে তার স্কুল থেকে আর রায়ানকে তার কেয়ার থেকে নিয়ে শঙ্খনাদের পূজা মণ্ডপ মিন্টোর রন মুর কমিউনিটি সেন্টারে চলে গেলাম।

হাতেখড়ির উৎসবটা একটু আগেই শেষ হয়ে গেছে কিন্তু রবি দাদা জানতেন আমি অনেকদিন ধরে হাতেখড়ির পরিকল্পনা করছি। তিনি আমাদের দেখে বললেনঃ তাড়াতাড়ি ভেতরে যান, রিপন দাদা হয়তোবা এখনও আছেন। তাকে বললেই রায়ানকে হাতেখড়ি দিয়ে দিবেন। আমরা ভেতরে ঢুকে দেখি রিপন দাদা বিশ্রাম নিচ্ছেন।

আমাদের ইচ্ছের কথা শুনে কোল থেকে তার বাচ্চাটাকে নামিয়ে দিয়ে এসে হাতেখড়ি দিতে বসলেন। রায়ান এমনিতেই লাজুক। তাই তাকে সাহস দেয়ার জন্য আমি আর তাহিয়া পাশে বসে পড়লাম। এরপর হাতেখড়ি দেয়া শেষ হলে রিপন দাদাকে ধন্যবাদ দিয়ে সরস্বতী দেবির সঙ্গে ওদের ছবি তুলে নিলাম।

এইভাবেই প্রবাসেও বাংলা ভাষা তার স্বমহিমায় বেঁচে আছে। প্রবাসে জন্ম নেয়া এবং বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় প্রজন্মের জন্য বাংলা ভাষা শিক্ষার অনেকগুলো কমিউনিটি স্কুল আছে অস্ট্রেলিয়াজুড়েই। আমাদের বাসার পাশেই দ্য গ্র্যাঞ্জ পাবলিক স্কুলেরই কয়েকটি কক্ষে সপ্তাহান্তের রোববার সকাল দশটা থেকে একটা পর্যন্ত চলে বাংলা ভাষা শিক্ষার ক্লাস।

বাংলা ভাষা শিক্ষার এই স্কুলটার নাম ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এখানে বাংলা ভাষার পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতির কবিতা, গান, নাচ, নাটিকা সবকিছুই শেখানো হয়। এছাড়াও গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয় বাংলাদেশের সকল জাতীয় দিবস তন্মধ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অন্যতম।

আমাদের মেয়ে তাহিয়া এই স্কুলেই তার বাংলা শেখার চর্চাটা অব্যাহত রেখেছিল। এখন আমরা পরিকল্পনা করছি রায়ানকেও এই স্কুলে ভর্তি করে দেয়ার। আমাদের বাসাতে বেশিরভাগ আলাপই বাংলাতে হয় তাই রায়ান এখন ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাটাও বলতে পারে। এখন এই স্কুলে গেলে বাংলা পড়া আর লেখাটাও শিখে যাবে আশাকরি।

অস্ট্রেলিয়ার এসফিল্ড পার্কে রয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ। সেখানে প্রতিবছরই ২১ ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে বইমেলা এবং সাংস্কৃতিক উৎসব পালন করা হয়। সেখানে গেলে কিছুটা হলেও বাংলাদেশের বাংলা একাডেমির বইমেলার ছোঁয়া পাওয়া যায়।

আর নতুন প্রজন্ম জানতে পারে বাংলা ভাষার ইতিহার এবং বুঝতে পারে বাংলা ভাষা শেখার গুরুত্ব। এভাবেই বাংলা ভাষা একটা সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পৃথিবী থেকে অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে যথাযথ চর্চার অভাবে কিন্তু বাংলা ভাষার বিশ্বব্যাপী চর্চার ফলে সেটা কোনদিনই হারিয়ে যাবে না বলে আমার বিশ্বাস।

আমাদের শৈশবের টিনের স্লেটে শেখা ভাষা এখন সময়ের আধুনিক যন্ত্র মোবাইল এবং কম্পিউটারেও লেখা যায়। তার জন্য আবিষ্কার হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার। আমরা ছোটবেলায় স্লেটে লিখে সহজেই মুছে ফেলতে পারলেও এখনকার বাংলা ভাষা কখনওই আর মুছে যাবে না বরং বাঙালি এবং বাংলা ভাষাভাষীরা যেখানেই যাবেন সেখানেই এই ভাষার বীজ তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বুনে দেবেন আর তখনই বাংলা ভাষা বিশ্বব্যাপী আরো গুরুত্ব পাবে।

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]