নিজে ঠিক হলেই দেশের পরিবর্তন হবে

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৮:১৬ পিএম, ১৮ মার্চ ২০২১ | আপডেট: ০৮:১৭ পিএম, ১৮ মার্চ ২০২১

আমি আমার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই লিখি। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। তার মধ্যে যেটা বেশি গ্রহণযোগ্য আমার কাছে সেটা হচ্ছে আমি যা জানি তাই লিখি। এ লেখার মধ্যে সত্যতার সঙ্গে শিক্ষণীয় দিকগুলো থাকে যা অতিসহজেই বোধগম্য হয়।

আমার দূরপরবাসের প্রায় চল্লিশ বছর সময় যা কিছু সুন্দর মধুময় হয়েছে তার সবকিছুর পেছনে বাংলাদেশের অবদান রয়েছে। অনেকেই বলবে এটা নেহায়েত একটু বাড়াবাড়ি করে বলা ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু না, বাড়াবাড়ি না, এটাই সত্য।

চলুন জেনে নেয়া যাক কী বলতে চেয়েছি আমি। আমার নানা এবং দাদা আদি কৃষক পরিবারের সন্তান। বাড়ির ভাত খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়েছেন আজীবন। সে আবার কী? প্রথমে ব্রিটিশ, পরে পাকিস্তানিদের দেশ থেকে কীভাবে তাড়াতে হবে সেটাই ছিল তাদের কাজ।

আমার দাদি মারা যান দুই সন্তান রেখে, বাবা জন্মের শুরুতে হন মা হারা। দাদা নতুন করে বিয়ে করেন, যার ফসল হয় পরে বাবারা পাঁচ ভাই দুই বোন। অন্যদিকে নানা প্রথম বিয়ে করেন এবং তার দীর্ঘদিন ধরে মাত্র দুই মেয়ে। কে দেখবে তার জমিদারি মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে?

চিন্তার বিষয়, শেষে করলেন আরেক বিয়ে। নতুন বউ ঘরে আসার পরে দুই নানিরই সন্তান হতে শুরু করে এবং তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় তেরো জনে। আমার বাবা-মার একবারই বিয়ে হয়েছে এবং আমরা মোট এগারো ভাইবোন, তার মধ্যে দু’জন মারা যায়। এখন আমরা নয় ভাইবোন, একজন ছাড়া সবাই দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে বসবাস করে।

আমাদের ভাই-বোনদের সবারই দুটো করে ছেলেমেয়ে শুধু একজন ছাড়া। স্বাভাবিকভাবেই সবার ধারণা ছোট পরিবার। তারপর সবাই কমবেশি প্রতিষ্ঠিত। নিশ্চয় আমরা আমাদের বাপ-দাদার পরিবার থেকে সুখ-স্বাচ্ছন্দে আছি। কিন্তু না, তা ঠিক নয়।

কারণ দুর্নীতি, হিংসা, প্রতিহিংসাপরায়ণতায় ভরা আমাদের পরিবার। প্রশ্ন হতেই পারে তা কী করে সম্ভব? চলুন জানা যাক এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে। আমাদের পরিবারের সবাই পৃথক, কারও সঙ্গে কারও দেখাই হয় না প্রায়।

এমনকি কথাও হয় না বহু বছর ধরে। তারপরও সুযোগ পেলেই গুজব ছড়াতে, খারাপ মন্তব্য করতে আমরা সবাই পাকা। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কেউ কাউকে চেনে না। এমনকি একে অন্যের নাম পর্যন্ত জানে না। কারণ এসব কিছু জানতে হলে মেলামেশা করতে হবে কিন্তু তা কখনও হয়নি এবং হবে বলে মনেও হয় না।

গ্রামের প্রবাদ বাক্যে বলা হয় ‘হাড়ির কাছে হাড়ি থাকলে লাগে বা ভাঙ্গে।’ এখন প্রশ্ন হতে পারে আমাদের তাহলে এ অধঃপতন কেন? ওই যে কথায় বলে সুখে থাকলে ভুতে কিলায়; সেই মানসিক রোগে ধরেছে। অনেক সময় ভেবেছি, হয়তো অনেকগুলো ভাইবোন, ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়েছে।

ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। যেমন জন্মের পর পরই মায়ের দুধের উপর ছোটজন সব সময় ভাগ বসিয়ে বড় জনকে বঞ্চিত করেছে। আবার বড় জন সব সময় বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে ইত্যাদি কারণ জড়িত থাকতে পারে আমাদের অধঃপতনের পেছনে। কিন্তু অনেক পরিবারে মাত্র একটি বা দুটি সন্তান সত্ত্বেও তাদের মধ্যেও তেমন কথা বা মেলামেশা হয় না।

আমি চিৎকার করে বলতে পারি এর নাম বাংলাদেশ। আমি আমার পরিবার থেকে শুরু করলাম এই কারণে সেটা হলো প্রথমেই বলেছি আমি যা জানি তার উপর লিখি। আমি সমাজের সব বিষয়ের উপর লিখি তার কারণ একটাই, সেটা হলো পরিপূর্ণ পরিবার, সমাজ বা একটি দেশ পেতে দরকার হলিস্টিক ভিউ, যেখানে কোনো কিছু বাদ দেওয়া যাবে না।

আমরা পরচর্চা এবং পরনিন্দা বেশি করি যদি তুলনা করি পাশ্চাত্যের সঙ্গে। কারণ যে বিষয়গুলো নিয়ে নিন্দা করি তার সবই নিজেদের ব্যক্তি এবং পারিবারিক প্রতিচ্ছবি। যার কারণে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে পরনিন্দা এবং পরচর্চা করে থাকি।

এর থেকে রেহাই পেতে দরকার পরিবর্তন এবং সে পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজ নিজ জায়গা এবং পরিবার থেকে। বাংলাদেশের অনেকেরই ধারণা আমরা একটি সার্থক পরিবার, কিন্তু না কথাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। আমরা অনেক দিক দিয়ে অনেকের চেয়ে একটি ব্যর্থ পরিবার।

আমার কথায় কেউ অবাক হবে না, কারণ সবাই জানে, তারপরও বলি, আমাদের সবারই জন্মের শুরুতেই একটি পরিপূর্ণতা বিদ্যমান। শব্দ থেকে শুরু করে গন্ধ পর্যন্ত এবং প্রথম দুই বছরের মধ্যেই আমরা পূর্ণাঙ্গতা পেয়ে থাকি। আমরা কথা বলা থেকে শুরু করে হুড় হুড় করে সবকিছুতেই পরিপূর্ণতা পাই।

তা সত্ত্বেও কখন, কোথায়, কাকে, কোন কথাটা বলতে হবে বা বলা উচিত—এটাই শিখতে দেখা যায় বাকি জীবন পার করে দিই। অথচ সেটাই শিখতে পারিনি সারা জীবন ধরে। কারণ একটাই, সেটা হলো নিজেকেই জানা হয়নি। হবে কী করে?

আমরা তো পরনিন্দা এবং পরচর্চা নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত। আমরা যেমন সবাই প্যারাডাইসের কথা ভাবি, কিন্তু কাউকে দেখছি না যে সেখানে যেতে তারা ব্যস্ত। যা কিছুই সেখানে রয়েছে তার সবকিছুই দুনিয়া থেকে ভালো। তারপরও কেউ দুনিয়া ছেড়ে যেতে রাজি না।

ব্যাপারটা কী? এখানে এত সমস্যা তারপরও কেউ বিদায় নিতে রাজি না। কারণ অনেক সময় আমরা অনেক কিছু বলি তবে মিন করি না। আমরা সবাই পরিবর্তন হতে চাই কিন্তু মিন করি না। স্বাধীনতার মাস তাই মন থেকেই অনেক কিছু ব্যক্ত করলাম, শেয়ার ভ্যালুর কনসেপ্ট থেকে।

আমি আবার শেয়ার করতে পছন্দ করি, ‘ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো, তোমার মনের মন্দিরে। আমার পরাণে যে গান বাজিছে, তাহার তালটি শিখো, তোমার চরণমঞ্জীরে।’

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]