জন্মভূমি ত্যাগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১০:০২ পিএম, ২৯ মার্চ ২০২১

চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, কেমিস্ট, অর্থনীতি যাই পড়ুন না কেন, যত ভালো শিক্ষার্থীই হোন না কেন, আজীবন একই জায়গায় একই চাকরি করতে হবে বা থাকবে বলে কোনো কথা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকরিতে ঢুকলেই যে আর প্রশিক্ষণের দরকার নেই এমন দিনও গোঁজার গিয়া।

কারণ বর্তমান যুগে কাজ আছে ততদিন ডিমান্ড আছে যতদিন। এই হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষ করে পাশ্চাত্যে। তারপর যদি কেউ বিদেশি হন তখন ভাষা, বর্ণ, ধর্ম সব মিলে ভেবেছেন কি কত বড় চালেঞ্জের মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হবে? প্রতিযোগিতার যুগে সারাক্ষণ হার মেনে নিলে শেষে নিঃশ্ব হয়ে ফিরে আসতে হবে।

তারপর যদি সেই ফেরার দেশে আপনি সংখ্যালঘু হন তাহলে তো সমস্যার শেষ নেই। পুরো জীবনটাই হচ্ছে ‘সেকেন্ড প্লেস ইজ ফর লুজার।’ সেক্ষেত্রে সুইডিশ ভাষায় বলা হয় ‘‘Kom inte sist” (পেছনে পড়ে না)। বিশ্বের সংখ্যালঘুদের মধ্যে বাংলাদেশের হিন্দুরা অতি সহজেই নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে ভারতে আশ্রিত হয়।

এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে! হয়ত বলবেন দেয়ালে পিট ঠেকে গেলে যখন কোনো উপায় না থাকে তখন ধাক্কা না দিয়ে সহজে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেই। কিন্তু ভাবুন যদি ভারত প্রতিবেশি দেশ না হতো তাহলে কি করতেন? চেষ্টা করতেন টিকে থাকতে। দেখুন পাশের দেশ চীন সেখানেও মুসলমান সংখ্যালঘুদের বাস, কই তারা তো সব ছেড়ে চলে যাচ্ছে না?

বিশ্বের অনেক দেশ রয়েছে যেখানে ভূমিপুত্রদের দেশহীন ও সহায় সম্বলহীন করে দেশান্তর করার জন্য যত রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা যায়, সেটা করে সংখ্যালঘুদের শেষ করা হয়েছে এখনও হচ্ছে। আসুন বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা করি।

লক্ষ্য করুণ বর্তমানে চীনে সংখ্যালঘু মুসলিম, ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের অবস্থা। বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় সেটা হলো সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ করার পেছনে অনেকেই ঐক্যবধ্য। সুশীল সমাজ এক্ষেত্রে চুপ। সংখ্যালঘুদের কেউই বিশ্বের কোথাও বলতে পারবে না যে তারা তাদের জন্মভূমিতে নিরাপদে বসবাস করছে।

শারীরিক নিরাপত্তা থেকে শুরু করে মানসিক নিরাপত্তা তাদের নিত্যদিনে কুরে কুরে খাচ্ছে। এরপরও বিশ্বে নানা সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করে চলছে। যে দেশে সকল জাতি সম্প্রদায়, ভাষা, বর্ণ, ধর্ম একত্রে বাস করতে না পারে সে দেশকে সৃজনশীল রাষ্ট্র বলা যেতে পারে না।

যেমন একটি ফুলের বাগানে শত শত নানা ধরনের ফুল থাকা সত্ত্বেও যদি বলি গোলাপ ফুলের বাগান, ঠিক হবে? তেমনি সকল জাতি সম্প্রদায় একটি রাষ্ট্রে বাস অথচ বলি ধরুন ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ তখন কি হয়, রাষ্ট্রের সকল তন্ত্রমন্ত্র এক কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। যার ফলে হয় সমস্যা সংখ্যালঘুদের জীবনে।

আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আশঙ্কা করছি বাংলাদেশে একদিন একটি হিন্দুও অবশিষ্ট থাকবে না যদি তারা তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য ফাইট না করে। এই ফাইট করার মনোবল না থাকার কারণে এবং অতি সহজে দেশ ত্যাগ করার সুযোগ থাকায় তারা দিনের পর দিন সংখ্যালঘু হচ্ছে।

আমি যখন বাংলাদেশে বসবাস করেছি তখন দেখেছি হিন্দু সম্প্রদায় রাতের আঁধারে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছে। তাদের পরিবারের প্রায় অর্ধেকের বসবাস সেই পারে। বাকিরা আস্তে আস্তে সব কিছু বিক্রি করে রাতের আঁধারে দেশ ছেড়েছে।

এ ধরনের ঘটনা প্রায় প্রতিবছরই ঘটে। সব সময় যে সাম্প্রদায়িক হামলার কারণে তা নয়, তার পরও বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে এগুলো ঝোঁকের মাথায় নিছক ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকে মূলত ভূমি দখলের রাজনীতি।

হামলাকারীরা সাধারণ কোনো মানুষ না, ধর্মীয় অনুভূতির সুড়সুড়ি দিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে এদের মূল লক্ষ্য থাকে ভূমি দখল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে রাষ্ট্র নিশ্চুপ থাকায় হামলাকারীরা প্রশ্রয় পায়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্রমাগত চাপ প্রয়োগে উৎসাহিত করে, যে পর্যন্ত না তারা ভূমি থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

অনেক সময় সেই হামলাকারীদের কাছেই নামমাত্র মূল্যে জমিটি বেঁচে দেয় তারা। ক্ষমতার ক্রমাগত চাপে এবং তাপে তত দিনে তারা জেনে যায়, বাপ-দাদার ভিটাবাড়িতে তারা আর থাকতে পারবে না। সাম্প্রদায়িক হামলার ধারাবাহিকতার পরও মৌখিক হুঁশিয়ারি ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কি সরকার থেকে?

বাংলাদেশের প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে যখন-তখন ধর্মকে ব্যবহার করে। সেক্ষেত্রে তারাও নিশ্চুপ থেকে এই হামলাকারীদের রাজনৈতিক আশকারা দেয়। বলা হয় ধর্ম যার যার, উৎসব সবার, রাষ্ট্র সবার—এ ধরনের কথাবার্তা যে শুধুই বুলি, তা প্রায় প্রতিবছরই ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো দেখলেই বোঝা যায়।

এজন্য দায়ী লোকগুলো কারা জানেন? আমরা সবাই। কারণ এতগুলো বছরে এদেশ থেকে নিরবে নিভৃতিতে হিন্দুদের দেশত্যাগের বিষয়ে আমরা কেউ কিছু করতে পারিনি। হিন্দুদেরকে মুসলমানদের মতই সমান নাগরিক সু্বিধা নিয়ে বেঁচে থাকতে দেখেছি অতীতে। কিন্তু সেটা এখন আগের মত নেই।

কারণ দেশে যখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, ফেসবুক থেকে শুরু করে মিডিয়া পর্যন্ত একদল তত্ত্বমারানি আবির্ভূত হয়। ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চায়- দোষ আসলে অন্য কারো, হামলাকারীরা নির্দোষ। এর পেছনে কারণ একটাই তা হলো এরা আসলে হামলাকেই জাস্টিফাই করে।

কিন্তু কেন সরকার থেকে শুরু করে সবাই সরল-সিধা ভাষায় নিন্দা জানিয়ে হামলার প্রতিবাদ করি না? আক্রান্ত-অনাক্রান্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াতে পারি না। অপরাধীদের নাম মুখে আনি না। বলি না সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিকে কীভাবে সাম্প্রদায়িকতা গ্রাস করছে।

একটি হামলার ঘটনায় জড়িতদের উপযুক্ত বিচার হয় না বলেই আরেকটি ঘটে। এসবের প্রতিবাদ না করতে পারলে চুপ থাকুন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আক্রান্ত ঘায়ে নুন ছিটাবেন না। “simply just keep your mouth shut down.” এখন হইছে অনেকটা—যে নেই তার জন্য সব কিছু যে আছে তার জন্য নেই কিছু।

যে দিছে তাকে নয় বরং যে নিছে তাকে মনে রাখো। দ্বিমত পোষণ করলে সব জাবে সহমত পোষণে সব পাবে। এগ্রি টু ডিজ এগ্রি, সে আবার কী? এখানে সবাই এগ্রি। এ কোন দেশ? এর নাম এখন বাংলাদেশ। আমি চিৎকার করে ঘৃণা করতে চেয়েও পারছি না চিৎকার করতে।

মনের দুঃখে লিখতে বসেছি একই সাথে নিজেকে ধিক্কার জানাচ্ছি। বাংলাদেশ কারও একার নয়। এটা হিন্দু-মুসলিম সবার। সবাই এখানে মিলেমিশে থাকবেন। দেশের বাসিন্দারা নিশ্চিতে এখানে বসবাস করবেন। আমরা যদি ধর্মীয় সংকীর্ণতায় ভুগি, তাহলে এভাবেই চলতে থাকবে।

এখানে যুগ যুগ ধরে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বাস করে আসছি। আমরা যেভাবে এখানে ছোটবেলা থেকে মিলেমিশে বাস করছি, ভবিষ্যতেও করব। যাদের ভেতরে ধর্মীয় সংকীর্ণতা আছে, সেগুলো বাদ দিতে হবে। উদার হতে হবে। নিজেকে এলাকার সন্তান হিসেবে, এ মাটির সন্তান হিসেবে আমার দায় আছে।

আমি সব সময় খোঁজ রাখব। এলাকার পরিস্থিতি সব সময় আমার নজরে থাকবে। আপন জন্মভূমির ওপর বিশ্বাস ভঙ্গ করা মহাপাপ এই বিশ্বাস ও আস্থা ধরে রাখা ছাড়া নিজেদের মানবিক ও গণতান্ত্রিক বলে দাবি করার সুযোগ নেই।

যারা সমস্যা সৃষ্টি করে তারা সাম্প্রদায়িকতার জন্য দায়ী। এদের পরিষ্কার ভাষায় বলে দিতে হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠের বা সংখ্যালঘুদের উপর কোনো অন্যায় আমাদের বাংলাদেশ মেনে নিবে না। মধুরাত নয়, মায়া চাঁদ নয়, আসুন মানুষের কথা ভাবি।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - ja[email protected]