উন্নয়নে জাপান হতে চাই, আচরণে কেন নই?

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৪১ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০২১

ওমর ফারুক হিমেল

গত বছরের লকডাউনের সময় কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে দেশ। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে পুলিশের অনুমতি লাগত। নিচের যে ছবিটি দেখছেন সেটি মাহাথিরের। পুলিশ মাহাথির মোহাম্মদের গাড়ি চেক করছে। এখানে কোনো সমস্যা নেই রাষ্ট্রের পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে।

যে বিষয় নিয়ে আজকের লেখা, কিছুদিন আগে ডাক্তার-ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশের ঘটনা নিয়ে। ডাক্তার-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যকার ঘটনার কোরিয়ান সংস্করণ।

ম্যাজিস্ট্র্যাট: জিনসিমরো সেসুনহামনিদা (আন্তরিকভাবে দু:খিত)
আপনার কি মুভম্যান্ট পাস আছে?
ডাক্তার: জিনসিমুরো সেসুনহামনিদা (আন্তরিকভাবে দু:খিত) আমি জেনেছি যে ডাক্তারদের মুভম্যান্ট পাস লাগে না!
পুলিশ: দানসিনও সিনবুনজুংউল বুলসু ইসসুবনিদা (দয়া করে কিছু মনে করবেন না) আপনার আইডি কার্ডটা কি দেখতে পারি? অনেকে অনৈতিকভাবে সুযোগ নেয় তো তাই!

ডাক্তার: জিন সিমুরো সেসুনহামনিদা (আমাকে ক্ষমা করুন) তাড়াতাড়ি বের হতে গিয়ে বাসায় ফেলে এসেছি। আমি বিএসএমইউর (পিজি) একজন সহকারী অধ্যাপক।
ম্যাজিস্ট্র্যাট: সিনছা জিনসিমুরো সেসুনহামনিদা (সত্যিই আমরা দু:খিত)
আপনার সহযোগিতার জন্য অনেক ধন্যবাদ! দয়া করে আইডি কার্ড সাথে রাখবেন, সবিনয় অনুরোধ করছি। সাবধানে যাবেন।

ডাক্তার: খোমাবসুমনিদা (আপনাদেরকেও ধন্যবাদ) আপনাদের দায়িত্ব দেখে আমি মুগ্ধ! করোনা মোকাবিলায় সবাই এক সাথে কাজ করবো। ভাল থাকবেন।

পুলিশ: দায়িত্বের খাতিরে আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য সেসুনহামনিদা (ক্ষমা প্রার্থী)। সাবধানে যাবেন। কোরিয়া হলে ঘটনা এমন হত নিশ্চিত। ডাক্তার-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যকার ঘটনার জাপানি সংস্করণ হলে কি হতো, সরকার জীবন নামে একজন প্রবাসী লিখেছেন।

jagonews24

ম্যাজিস্ট্র্যাট: সুমিমাসেন (আমাকে ক্ষমা করবেন)
আপনার কি মুভম্যান্ট পাস আছে?
ডাক্তার: সুমিমাসেন (আমাকে ক্ষমা করবেন) আমি জেনেছি যে ডাক্তারদের মুভম্যান্ট পাস লাগে না!
পুলিশ: মোশি ওয়াকে গুজাইমাসেন (দয়া করে কিছু মনে করবেন না) আপনার আইডি কার্ডটা কি দেখতে পারি? অনেকে অনৈতিকভাবে সুযোগ নেয় তো তাই!

ডাক্তার: সুমিমাসেন (আমাকে ক্ষমা করুন) তাড়াতাড়ি বের হতে গিয়ে বাসায় ফেলে এসেছি। আমি বিএসএমইউ (পিজি) র একজন সহকারী অধ্যাপক, আমার গাড়িতে ডাক্তািরি কিছু সরঞ্জাম আছে, চাইলে দেখতে পারেন।
ম্যাজিস্ট্র্যাট: হনতোনি সুমিমাসেন (সত্যিই আমরা দু:খিত)
আপনার সহযোগিতার জন্য অনেক ধন্যবাদ! দয়া করে আইডি কার্ড সাথে রাখবেন, সবিনয় অনুরোধ করছি। সাবধানে যাবেন।

ডাক্তার: ইইএ কচিরাকছো আরিগাতো গোজাইমাস (আপনাদেরকেও ধন্যবাদ) আপনাদের দায়িত্ব দেখে আমি মুগ্ধ! করোনা মোকাবিলায় সবাই এক সাথে কাজ করবো ভালো থাকবেন!

পুলিশ: দায়িত্বের খাতিরে আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য গোমেন নাসাই (ক্ষমা প্রার্থী)। সাবধানে যাবেন। সত্যিকার অর্থে কোরিয়া জাপান হলে ঘটনা এমনই হত। আমরা উন্নয়নে জাপান হতে চাই, আচরণে কেন নই, পাঠক আপনারা জানেন, জাপান-প্রশান্ত মহাসাগরের একদম পূর্ব কোণে ৬৮০০টি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি দেশ; কিন্তু এই দেশটি নিয়ে পৃথিবীজুড়ে মানুষের বিস্ময়ের সীমা নেই।

প্রযুক্তির মুন্সিয়ানায় গোটা বিশ্বকে মাতিয়ে রেখেছে জাপানিরা, কিন্তু তাদের সাফল্যের দৌড় কেবল কাঠখোট্টা প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, শিল্প সাহিত্যে চিত্রকলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ঈর্ষণীয় বিচরণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ববাসী মনে করেছিল জাপান দাড়াতে পারবে না, কিন্তু সে জাপান বিশ্ব অর্থনীতির বর্ণিল মডেল।

জাপানের চলচ্চিত্র অস্কার পেয়েছে, কুস্তির জগতেও অনন্য। জাপান শিশুদের স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি আচার আচরণ আদব-কায়দা শেখানোর বিষয়ে গভীর গুরুত্ব দেয়। তারা আদব কায়দা সুন্দর ব্যবহারকে জীবনের পোশাক মনে করে। শিক্ষকদের সম্মান করা, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা, কঠিন বিপদে হাত বাড়িয়ে দেয়া।

jagonews24

সম্মীলিতভাবে কাজ করা, শৈশবে জাপানি শিশুদের মনে গেঁথে দেয়া হয়। ক্লাসে ছাত্র-শিক্ষক নিজেরাই মিলেমিশে একসাথে ক্লাসরুম, ক্যাফেটেরিয়া পরিষ্কার করেন, কোনো কাজকেই ছোট করে না দেখার অভ্যাস এখান থেকেই গড়ে ওঠে জাপানী শিশুদের।

গত বিশ্বকাপে রাশিয়ার মাঠে রাশিয়ায় মাঠে জাপান ও কলম্বিয়ার ম্যাচের পর। জাপান সমর্থকদের আনন্দ উল্লাস করার কারণ ছিল যেহেতু তারা ২-১ গোলে জিতেছে। দক্ষিণ আমেরিকার কোন দলের বিরুদ্ধে এটাই জাপানের প্রথম জয়।

খেলার মাঠে কলম্বিয়াকে ধরাশায়ী করার পর জাপানের সমর্থকরা কিন্তু গ্যালারিতে শুধু আনন্দ উল্লাসেই মেতে থাকেনি, বরং তারা গ্যালারি পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে যান। ঘুরে ঘুরে তারা সব পরিষ্কার করে যাই। জাপানি ফুটবল সমর্থকরা যে এধরনের কাজ এই প্রথম করেছে তা নয়। এর আগেও বিভিন্ন খেলার পরে তারা দল বেঁধে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেছে।

এই রকম উপমা শতশত আছে জাপানীদের। বিশ্বজুড়ে পরিশ্রমী একটি জাতি হিসেবে জাপানীদের সুনাম রয়েছে। ঘরের কাজে, বাচ্চাদের যত্ন, বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে ব্যস্ত সময় কেটে যায় জাপানীদের। পুরো জীবনটাই কাটে কাজের প্রতি বিপুল উদ্দীপনায়, পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে।

jagonews24

সামাজিক বন্ধনগুলো অনেক সুদৃঢ়। বিভিন্ন সমস্যায় সবাই মিলে একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমাধানে। জাপানের প্রতিটি মোবাইল ফোনে একটি ইমার্জেন্সি এলার্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করা থাকে। যে কোনো দুর্যোগ বিপর্যয়ে এই এলার্মগুলো বেজে ওঠে সবার মোবাইলে (সাউন্ড অফ করা থাকলেও!) এবং মুহূর্তের মাঝে চলে যায় মেসেজ- এই দুর্যোগ মোকাবিলায় কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে তাদের সেটি জানিয়ে।

একবার একটি মজার ঘটনা ঘটেছে। সুনামি আর ভূমিকম্পের আঘাতে বিপর্যস্ত পুরো জাপান, আক্রান্ত জনপদের কাছে খাদ্য, চিকিৎসা, সেবা ইত্যাদি পৌঁছে দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার, এমন সময় জনগণের সেবায় মাঠে নেমে এলো কুখ্যাত জাপানি মাফিয়া গোষ্ঠী- ইয়াকুজা!

তাদের সংঘবদ্ধতা এবং পেশাদারিত্ব পুলিশের চেয়ে ঢের বেশি, দেখা গেল দুর্গম সব লোকালয়ে সরকারি সাহায্য পৌঁছানোর অনেক আগেই পৌঁছে গেছে তাদের ত্রাণ! এভাবেই দুর্যোগ আর বিপর্যয়ে গোটা জাতি যখন দুরবস্থায় পড়ে, ভাল খারাপের সীমানাটা তখন মুছে যায়, মুখ্য হয়ে উঠে একমাত্র পরিচয়- আমরা জাপানি।

এভাবে জাপানকে অনুসরণ করে কোরিয়া তাদের সামাজিক ভিত দারুণ মজবুত করেছে, জাপানের মতো বিশ্ববাসীর উদাহরণ হয়েছে।আমরা উন্নয়নে জাপান কোরিয়া হতে চললেও আচরণে অমানবিক, করোনাকালে তাই প্রমাণ করলাম, অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি, কাড়ি কাড়ি সার্টিফিকেট অর্জনই সবকিছু নই, দুর্যোগে বিনয়, ভদ্রতা, অন্যর সাথে সুন্দর আচরণে মুখ্য। দুর্যোগে পেশার পরিচয় সীমানা মুচে দিয়ে, মুখ্য হয়ে উঠুক আমরা বাংলাদেশি।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]