বাংলাদেশিদের পছন্দ করে কোরিয়া, তবুও কেন এই অবস্থা?

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৪৪ পিএম, ০৫ মে ২০২১ | আপডেট: ০৫:২৩ পিএম, ০৬ মে ২০২১

ওমর ফারুক হিমেল

করোনার অতিমারিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় রয়েছে বিপুল সংখ্যক কর্মী সঙ্কট। মহামারিতেও ইপিএসভিত্তিক দেশগুলো থেকে প্রতিনিয়ত কোরিয়া ঢুকছে নতুন এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (ইপিএস) কর্মী। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আগের মতো এসব চাকরির অংশীদার হতে পারতেন। কোনো এক অদৃশ্য গাফিলতির কারণে কিছুই যেন হয়ে উঠছে না।

দক্ষিণ কোরিয়ার রয়েছে বাংলাদেশি কর্মীদের ব্যাপক সুনাম। অনেক মালিকও তাদের কর্মীদের ফিরিয়ে আনতে মুখিয়ে আছে। আটকেপড়া কর্মীর জন্য অপেক্ষা করছে সেখানকার মালিকেরা। নতুন কর্মীতো যেতেই পারছে না। কোটা পূরণেও বাংলাদেশ ব্যর্থ।

কোরিয়ান মালিকরা বাংলাদেশিদের নিয়োগ দিতে চায়, কিন্ত বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু গাফিলতির কারণে বারবার কোরিয়ার শ্রম বাজারে বাংলাদেশের কর্মী প্রবেশ বন্ধ হচ্ছে। দূতাবাস দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনে কিন্ত পরে আবার সেই আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

ইপিএসের স্বপ্নবাজরা অনেকটা হতাশ। সমস্যা নিয়ে সবাই আলোচনা করেন, সমাধান কিছু হয় না। আগের মতো অবস্থা। অথচ এই একটি বাজার সক্রিয়ভাবে ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে।

কোরিয়ার শ্রম বাজারে নেপাল, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। করোনাকালে নতুন আর কমিটেড কর্মী প্রবেশ করছে কয়েকটি ইপিএস প্রেরণকারী দেশ থেকে। কেন বাংলাদেশ থেকে কর্মী যেতে পারছে না, কেনইবা কোরিয়ার শ্রমবাজারে সংকুচিত হচ্ছে, মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন সামনে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, করোনার শুরুতে প্রায় প্রতিটি ইপিএসভিত্তিক দেশ কর্মীদের কোভিড পরীক্ষা সঠিকরূপে করে পাঠান। একই সঙ্গে নানান কৌশল অবলম্বন সরকারিভাবে তাদের কর্মী কোরিয়া প্রেরণ করছে, সম্প্রতি কোরিয়ায় কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড থেকেও প্রচুর নতুন কর্মী প্রবেশ করে।

দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, প্রথম নিষেধাজ্ঞার পরে অভিবাসনখাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিল সংশ্লিষ্টরা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। অনুসন্ধান বলছে, কোরিয়া মধ্যে কোরিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সব জায়গায় বারবার তাগাদা দেয় যাতে কোভিড পজিটিভ কোনো কর্মী যাতে কোরিয়ায় প্রবেশ না করেন।

যারা যাচ্ছেন তারা যেন ভালো করে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেন। কারণ একবার নিষেধাজ্ঞা তুলতে অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। বারবার এ রকম হলে কোরিয়া বাংলাদেশ থেকে আস্থা বিশ্বাস হারাবে। কিন্ত কে শোনে কার কথা।

কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের উপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৩ জনের করোনা পজিটিভ। এ অবস্থায় দূতাবাসেরও কী করার আছে? করোনা পজিটিভ কর্মী যেন না যায় তার জন্য দূতাবাসের সবরকম চেষ্টা বিফলে যায়। ১৬ এপ্রিল থেকে আবারও বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্য কোরিয়ার দরজা।

বেলা-শেষে ইপিএস কর্মীদের কপাল পুড়ল:

বাংলাদেশের জন্য কোরিয়া বড় একটি সম্ভাবনাময় বাজার। কোরিয়ার কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি কর্মীদের পছন্দ করে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশিরা বিশ্বস্ত। খুব একটা নিরূপায় না হলে বাংলাদেশিদের কোম্পানি ছাড়েন না। তারপরও কেন এ অবস্থা। কিন্ত দেশে আটকেপড়া প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি কর্মীর ব্যাপারে চোখে পড়ার মতো কোনো উদ্যোগ নেই।

সবচেয়ে বড় কথা হলো কর্মীদের মধ্যে অনেকে পুরনো প্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে কাজ করতে চায়। কিন্ত পুনরায় নিষেধাজ্ঞা সবার মনকে হতাশ করে দিয়েছে। অনেকেই ধার-দেনা করে দিকভ্রান্ত। তারা ভেবে পাচ্ছে না এখন কি করবে, কোথায় যাবে, কার কাছে ধর্না দেবে।

বিভিন্ন জায়গায় ধর্না দিয়েও আশানুরূপ কোন সাড়া পাচ্ছে না। কিছুই করার নেই তাদের। ফলে এসব কর্মীরা আদৌ কোরিয়া যেতে পারবে কিনা এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

কেউ কিছু বলছে না:

বোয়েসেল ও দূতাবাসের এই সংশ্লিষ্ট কেউ মুখ খুলছে না। কেউ কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে গত ১২ এপ্রিল প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সভাপতিত্বে যে জুম মিটিং হয় তাতে রাষ্ট্রদূত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় বাজার। যা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

গত ২০২০ সালে ২৩ জুন কোরিয়া বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পর ১৯ জন কর্মীর করোনা পজিটিভ হয়ে কোরিয়া গমন করেন। রাষ্ট্রদূত এ ধারা অব্যাহত থাকলে পুনরায় নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

তার সাথে এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহিনও। তিনিও ইপিএস কর্মীদের সম্ভাব্য সকল ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে দ্রুততম কোরিয়া গমনের বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা বলেন। পরবর্তীতে দেখা যায় যা হবার তা হয়ে গেছে। কোরিয়া সরকার বাংলাদেশের উপর আবারও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে আটকা পড়েছে বিপুল পরিমাণ ইপিএস কর্মী।

খেসারত দিচ্ছে ইপিএস কর্মীরা:

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে কেউ কি ইচ্ছে করে কোরিয়াতে বাংলাদেশের শ্রম বাজার নষ্ট করতে চাইছে। নাকি অজ্ঞতা। নাকি গাফিলতি।

জানা গেছে, সিউলের বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বারবার চিঠি দিয়ে জানিয়েছে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার বিষয়ে। সম্প্রতি বোয়েসেল, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কোরিয়াগামী বাংলাদেশিদের জন্য যাত্রার আগে দেশে কোয়ারেন্টাইনের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় মিটিং সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এখনো তার কোনো প্রতিফলন নেই।

এখন কি করবেন বাংলাদেশে আটকে পড়ারা:

কোরিয়াতে বাংলাদেশের বারবার নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশের সুনাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোরিয়া যাবার আগে কেন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো কর্মীদের করোনার বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই করছে না। কয়েক জনের কারণে যে বিপুল সংখ্যক কর্মী যাবার প্রতিক্ষায় দিন গুনছিল তাদের কি হবে। কবে আবার স্বাভাবিক হবে সব কিছু। আবারও কোরিয়া সরকারকে বোঝাতে পারবে কি বাংলাদেশ?

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]