যৌনতায় নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার হোক দুর্নীতিমুক্ত জাতি গঠনে

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৯:২৯ পিএম, ০৫ মে ২০২১

আমার ছোটবেলা বাংলাদেশের গ্রামে কেটেছে। কৃষিপ্রধান দেশের গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এবং নদী, নালা, খাল-বিলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে মানুষের মাঝে গড়ে ওঠা ছোটবেলার দিনগুলো মনে করে দেয় স্মৃতিজড়িত অনেক ঘটনা।

ছোটবেলার সব ঘটনা নয় শুধু কয়েকটি ঘটনার উপর আলোচনা করব। কী অবস্থা ছিল তখন বাংলাদেশের গ্রামে আর এখন কী অবস্থা! মাঝখানে প্রায় চল্লিশ বছর পার হয়েছে। এর মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। পণ্যদ্রব্যের বেচাকেনার উপর কী পরিবর্তন হয়েছে আসুন দেখি।

তখন দুধ কিনতে বাজারে যেতাম। যিনি দুধ বিক্রি করতেন তাকে জিজ্ঞেস করতাম দুধে পানি নিশানো হয়েছে কি? দুধ কখন দোহানো হয়েছে? দুধ ঠিকমতো মেপে দিলো কিনা ইত্যাদি।

অন্যদিকে দুধ বিক্রেতা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতেন একদম খাঁটি দুধ, সদ্য দোহানো হয়েছে, গাভীকে কাঁচা দুবলো ঘাস খাওয়ানো হয়েছে ইত্যাদি। কেনাবেচায় দর কষাকষি করা, কোয়ালিটির উপর দক্ষ তদারক করা ছিল বাজার করার একটি বিশেষ দক্ষতা।

এতকিছুর পরও অনেক সময় ঠকেছি যেমন দাম বেশি নিয়েছে, দুধে পানি মিশিয়েছে যা বাড়িতে এলে জানা গেছে। দুধ গরম করতেই দেখা গেছে দুধ জমে গেছে। যাচাই-বাছাই করা সত্ত্বেও সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

কারণ সততার তখনও বেশ অভাব ছিল। বাংলাদেশের শহরে বর্তমান কিভাবে দুধ বেচাকেনা হয় জানি না তবে গ্রামে নিশ্চয় এ পদ্ধতি এখনও প্রচলিত রয়েছে।

এবার আসুন জেনে নেই সুইডেনের কী অবস্থা। আমি এখানে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে আছি। পরবাস জীবনের শুরুতেই লক্ষ্য করেছি পণ্যদ্রব্য কেনা-বেচায় ডিজাইনের প্রাধান্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মাকালের ফল যেমন দেখতে ভালো ভেতরে কিন্তু বেজায় কালো। কিছু কিছু প্যাকেট যখন খুলেছি ইমপ্রেজ হইনি। আমেরিকানরা পাকেজিং-এর বিষয় খুবই এক্সপার্ট। চাকরির সিভি লেখা থেকে শুরু করে তাদের প্রেজেন্টশন সব সময় কিছুটা ভিন্ন, কারণ এদের ধারণা ফার্স্ট ইম্প্রেস লাস্ট।

যাইহোক সব মিলে বলতে হয় বর্তমান প্যাকেজিং-এর গুরুত্ব রয়েছে অপরিসীম, বিশেষ করে টেকনোলজির যুগে। যেমন এক লিটার দুধ প্যাকেটে বিক্রি করা হয়। দুধের গুণাগুণসহ শেলফ লাইফ, কী পরিমাণ ফ্যাট, কী পরিমাণ ভিটামিনসহ যাবতীয় তথ্য দুধের প্যাকেটে লেখা রয়েছে।

কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই। শতভাগ দুষণমুক্ত। কোয়ালিটির ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত ইত্যাদি। শতভাগ নিশ্চিত বিধায় সমস্যা ধরা পড়লে কোনো রকম তর্ক ছাড়া টাকা ফেরত পাওয়া যায়, ফাঁকি দেবার কোনো উপায় নেই বলা যেতে পারে।

সব মিলে সুইডিশ ভাষায় বলা হয় ‘‘du får det du betalar för.’’ (you get you pay for). পৃথিবী সৃষ্টির পর মানুষ জাতি চেষ্টা করে আসছে সততা এবং নিষ্ঠতার সঙ্গে জীবন যাপন করতে। ভেজালমুক্ত খাবার পেতে সব চেষ্টাই মানুষ জাতি করেছে।

ধর্মের দোহাই দেয়া হয়েছে। কিছুতেই কিছু সম্ভব হয়নি দুর্নীতি বা ভেজালমুক্ত সমাজ পেতে। শেষে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ আজ বিশেষ করে পাশ্চাত্যে ভেজালকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।

যদি ফিরে যাই দুধের দিকে, সত্যি আশ্চর্য হবার কথা যখন দেখি দুধের প্যাকেটে যা লেখা তার ব্যতিক্রম কিছুই নেই। দুধের প্যাকেট হাজার কথা বলে যার ফলে পণ্যের দাম যা তার চেয়ে বেশি খরচ করা হয় ডিজাইনের উপর। আমরা যদি অ্যাডভার্টাইজগুলো লক্ষ্য করি একই অবস্থা।

আমার প্যাকেজিং-এর উপর কথাগুলো তুলে ধরার কারণ হলো বাংলাদেশকেও নানাভাবে সবকিছুর কোয়ালিটি সমৃদ্ধকরণ আশু প্রয়োজন। সবকিছুর উপর রুচিসম্মত হতে হবে। যাই করি বা পড়ি না কেন তার উপর গ্লামারের ছাপ থাকা দরকার।

প্রেজেন্টেশনের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। সর্বোপরি মনে রাখা দরকার যাই করি না কেন সেটা যেন মন দিয়ে করি। দেশের মানুষের নৈতিক অবনতি হয়েছে অনেক বেশি অতীতের তুলনায়। অনেকের ধারণা ভালোই তো যাচ্ছে।

আমিও বিষয়টিতে একমত যে দুর্নীতি করেই আজকাল বাংলাদেশের অনেকেই উন্নতির ধাপে পৌঁছে যাচ্ছে ঠিকই, তবে ভাবুন এবং দেখুন তাদের জীবনে তারা কি সত্যিকারে সুন্দর জীবন ভোগ করছে?

আমি জানি না তবে আমি সত্যিকারার্থে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে চাই একজন ভালো মানুষকে। কিন্তু দুঃখ্যের বিষয় সৎ মানুষের অভাব হতে চলেছে এবং তাদের খুঁজে পাওয়া এখন কঠিন।

মনে পড়ে গেল ‘ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়, বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়, মুখ ঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায়, মানুষকে কী দেখে চিনবে বলো?’ সত্যি মানুষকে চেনা বড় দায় এ যুগে। পাশ্চাত্যের অনেক দেশ এখন ক্যাশ টাকার পরিবর্তে প্রযুক্তির ব্যবহার করছে, যার ফলে বেচাকেনায় টাকার পরিবর্তে সুইস বা কার্ড ব্যবহার হচ্ছে।

পানি যেমন নিচের দিকে গড়ে মানুষ জাতিও তার নৈতিকতার বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করে না যদি সুযোগ পায়। মনুষ্যত্বের অবক্ষয়ের কারণে সিস্টেমের আবির্ভাব হয়েছে এবং সিস্টেমই পেরেছে মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে। প্রযুক্তিকে শুধু যৌনতায় নয় তাকে দুর্নীতিমুক্ত জাতি গঠনেও ব্যবহার করা হোক।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]