দলিলে নয়, অনুভবে জানো বন্ধুরে

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৩:৪৯ পিএম, ১১ জুন ২০২১

ইসলামী আইনে বিয়ে হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে পবিত্র বন্ধন। ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে ছাড়াও এ বন্ধন সৃষ্টি হয় একটা আইনগত চুক্তির মাধ্যমে। মুসলিম বিয়েতে পাত্র-পাত্রী উভয়কে যে শর্তগুলো পালন করতে হয় সেগুলো হলো- একপক্ষ বিয়ের প্রস্তাব দেবে এবং অন্যপক্ষকে তা গ্রহণ করতে হবে।

যারা সুন্নি সম্প্রদায়ের তাদের ক্ষেত্রে দু’জন সাক্ষী থাকতে হবে আর শিয়া সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী না থাকলেও বিয়ে সম্পন্ন হবে। সাক্ষী দু’জন পুরুষ হবে অথবা দু’জন মহিলা ও একজন পুরুষ থাকলেই চলবে।

বিয়ের সময় পাত্র ও পাত্রীর মুখে উচ্চারিত ‘কবুল’ শব্দটি স্পষ্ট হতে হবে এবং উভয়ে কোনো রকম চাপ বা প্ররোচনা ছাড়াই তা স্বেচ্ছায় বলবে। একই বৈঠকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে হবে এবং গ্রহণ করতে হবে। এক বৈঠকে প্রস্তাব দিলে আর অন্য বৈঠকে প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তা কখনো বৈধ বিয়ের মর্যাদা পাবে না।

মুসলিম আইনে কোনো পক্ষেরই বিয়ের জন্য কোনো ধর্মীয় কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক নয়। বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ও বৈধ সন্তান জন্মদানের অধিকার লাভ করে ইসলামী আইন অনুযায়ী।

এখন যারা উপরের নিয়ম না মেনে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ও সন্তান জন্মদান করছে তাদের সন্তান ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী অবৈধ। এটা যদি সঠিক হয় তবে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার কত পারসেন্ট বৈধ?

বর্তমানের সস্তা ভালোবাসার এই যুগে সবচেয়ে সহজ যে কাজ, তা হলো বিয়ে করা। এ যুগে ‘ভালোবাসি’ বলা যতো কঠিন, ‘বিয়ে করব’ বলা ততোই সহজ।

যে সমাজের বিরাট একটা অংশ ভালোবেসে মানুষটিকে চিনতে চাই বলে সম্পর্ক গড়ে, সে সমাজে বিয়ের পর ভালোবাসা মারা যায়। আবার ইসলামের মানদণ্ড মেনে সঙ্গিনী খুঁজলে যে কেউ ঠকে না, এমনটি বিশ্বাস করাও দায়। আসলে ভালোবাসা ছাড়া বিয়ে করার মানেই হলো ভালোবাসাকে সস্তা করে দেখা।

এই মানসসিকতাই আমাদের বর্তমান অবিশ্বাসের মূল কারণ। সেক্ষেত্রে আস্থার জায়গাটা এখন বেশ নড়বড়ে। বিশ্বাস যেন রূপকথার এক নতুন চরিত্র। প্রায় সব ধর্মেই বিয়ে ছাড়া যৌন মিলনকে হারাম বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। হারাম ভালোবাসার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন, সর্বোপরি বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে নিদারুণভাবে।

যদি ভালোবাসা ছাড়া বিয়ে বন্ধন হয় তবে অনেকের ধারণা বিয়ের মাধ্যমে একে অন্যের ওপর যাবতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে।

যাই হোক, বিয়ে করতে হলে বা বিয়ে দিতে হলে প্রথমে দেখতে হবে পাত্র-পাত্রীর আইনে বর্ণিত উপযুক্ত বয়স হয়েছে কী না। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে কাবিননামায় স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে পালনীয় শর্ত উল্লেখ থাকবে।

দেনমোহরের পরিমাণ কত হবে তার উল্লেখ থাকবে। আর কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেয়া যেতে পারে। এতে পরবর্তীতে স্ত্রী যদি স্বামীর সঙ্গে কোনো কারণে সংসার করতে না পারে তাহলে আইন অনুযায়ী স্ত্রী তার স্বামীর পৃথক অনুমতি ছাড়াই তালাক নিতে পারবে।

আরও পড়ুন>> ভেজাল ওষুধে নতুন রোগ!

দেনমোহরের পরিমাণ উভয় পক্ষ মিলে ঠিক করবে। এটা নির্ভর করে পাত্র-পাত্রীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত মর্যাদার ওপর। কাবিনে দেনমোহরের পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে। তবে কোনো কারণে দেনমোহর ঠিক না করে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলে পরে তা নির্ধারণ করে নেয়া যাবে।

মুসলিম আইনে দেনমোহরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। নগদ দেনমোহর আর বাকি দেনমোহর। কোনটা কতটুকু হবে তা পাত্র ও পাত্রী পক্ষ আলোচনা করে ঠিক করে নেবে।

বিয়ে সম্পন্ন করার সময় কাজির উপস্থিতিতে নগদ দেনমোহর স্বামী সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করবে, যদি স্ত্রী তেমনটি চায়। পুরোটা পরিশোধ না করলে বাকি দেনমোহর ইচ্ছা করলে পরে আদায় করা যাবে। দেনমোহর কিভাবে পরিশোধ করা হবে, তা স্পষ্ট করে ঠিক করা না হলে পুরোটাই নগদ দেনমোহর হিসেবে ধরা হবে।

তখন স্ত্রী চাওয়ামাত্র স্বামী তা দিতে বাধ্য থাকবে। এ রকম অবস্থায় স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহরের অর্থ আদায় করার জন্য আইনের আশ্রয়ও নেয়া যাবে। তাছাড়া স্ত্রী তার সম্পূর্ণ দেনমোহর আদায় না করা পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে সহবাস করতেও অস্বীকৃত হতে পারবে।

বিয়ের প্রমাণ কাগজ-কলমে লিখে লিপিবদ্ধ করাই হলো রেজিস্ট্রেশন। এটি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে লিখিত বিয়ে-সংক্রান্ত দলিল, যা কাজি অফিসে সংরক্ষিত থাকে। যে কোনো মুসলিম বিয়ে সরকার অনুমোদিত রেজিস্ট্রার কর্তৃক রেজিস্ট্রি করতে হবে। বিয়ে রেজিস্ট্রি না করা আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

প্রশ্ন আসতে পারে, বিয়ে নিবন্ধনের এত প্রয়োজন কী? বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা না হলে আমাদের দেশে মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ঠকে।

বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হলে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন, কেউ বিয়ের সত্যতা অস্বীকার করতে পারে না; স্ত্রী তালাকের অধিকার পায়; দেনমোহর পায়; ভরণ-পোষণ পায়; ছেলে-মেয়ের দেখাশোনা ও অভিভাবকত্ব পায়; স্বামীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার হয় ইত্যাদি।

অতএব বোঝা যাচ্ছে, ওপরের সমস্যাগুলোর আইনগত সমাধানের জন্য বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। তাছাড়া রেজিস্ট্রেশন না করার সুযোগে খারাপ চরিত্রের পুরুষের দ্বারা অনেক সময় তার স্ত্রীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তখন স্ত্রী প্রতিকার পায় না। আর বিয়ের সত্যতা প্রমাণের জন্য বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের কপিটিই যথেষ্ট। রেজিস্ট্রেশন ফরমে কোনো ভুল বা মিথ্যা তথ্য দেয়া যাবে না। পরে প্রমাণ হলে আবার সাজা হতে পারে সংশ্লিষ্ট পক্ষের।

এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না। অর্থাৎ পরবর্তী বিয়ে করার জন্য আগের স্ত্রী বা স্ত্রীদের থেকে অনুমতি নিতে হবে এবং ওই অনুমতির একটি কপি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, লাইসেন্স নেই এমন কোনো কাজির কাছে বিয়ে নিবন্ধন করলে সেই বিয়ের কোনো আইনগত ভিত্তি থাকে না।

এছাড়াও বিয়ে নিবন্ধনের সময় কিছু বিষয়ে পক্ষগুলোকে খেয়াল রাখতে হবে। যেমন: বিয়ের মঞ্চেই বিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। বিয়ের মঞ্চে সম্ভব না হলে বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন থেকে ১৫ দিনের মধ্যে কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে নিবন্ধন করতে হয়।

কাজিকে বাড়িতে ডেকে এনে কিংবা কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে নিবন্ধন করা যায়। কাবিননামার সব শর্ত যথাযথ পূরণ করার পর বর-কনে, উকিল সাক্ষী ও অন্য সব ব্যক্তির স্বাক্ষর নিতে হবে।

অনেক সময় দেখা যায় ছেলে-মেয়েরা একে অন্যকে ভালোবেসে কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলে। কিন্তু আইনে কোর্ট ম্যারেজ বলে কোনো শব্দ নেই। আবেগে পড়ে এভাবে আদালতে হলফনামা করলেই বিয়ে হয়ে যায় না। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’-এর কোনো বৈধতা নেই।

দেখা যায় ছেলে-মেয়েরা ১০০, ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারি পাবলিকের কাছে গিয়ে এফিডেভিট বা হলফনামা করে। কিন্তু এটা বিয়ে নয়, বিয়ের ঘোষণামাত্র। আবার বয়স ১৮ বা ২১ না হলেও দেখা গেছে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের এ রকম বিয়ে টাকার জন্য স্বীকৃতি পেয়েছে কিন্তু পরবর্তীতে স্বামী অপরাধী হিসেবে গ্রেফতার হয়েছে।

স্বামীর গ্রেফতারের পর সে কি স্ত্রীর ভরণ-পোষণ করতে পারবে? যদি স্বামী জেলে চলে যায়, তাহলে স্ত্রী কি তিন বছর পর্যন্ত তার অপেক্ষা করবে? ওই নারীকে বিয়ের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য অধিকার দেয়া দরকার।

ইসলামে বিয়ে মানে জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক না। ইসলামে বিয়ে মানে একটি কন্ট্রাক্ট। মুসলিম আইনে বিয়ে এক প্রকার দেওয়ানি চুক্তি হওয়ায় বিয়ের সময় এই চুক্তির শর্তাবলি ঠিকঠাক করে নেয়া বর ও কনে পক্ষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরো কাহিনি যেভাবে সেট করা সেখানে বিয়ে টিকিয়ে রাখতেই হবে।

ভালোবাসার কোনো বালাই আছে বলে মনে হয় না। এতকিছু করার পেছনে যে কারণগুলো জড়িত তা হলো দরিদ্র্যতা, অবিশ্বাস, বেঈমানি, সংসারের দায়ভার থেকে এড়িয়ে যাওয়া, সন্তান হলে পরিচয় অস্বীকার করা ইত্যাদি।

পাশ্চাত্যে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস এবং ভালোবাসার বিনিময়ে বিয়ে বন্ধন হয়। বিয়ে বন্ধন কেনা বেঁচার জায়গা নয় বরং হৃদয় দেয়া পাওয়ার একটি মিলনায়তন। তবে কোনটি ভালো আর কোনটি খারাপ সে বিশ্লেষণে না গিয়ে বরং এতটুকু বলতে পারি পৃথিবীর মধ্যে এখনও দুটি ভিন্ন জগত রয়েছে যেখানে অর্থ এবং ভালোবাসার মূল্যায়ন বিভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

আমি মনে করি বৈধ বা অবৈধ নিয়ে তর্কে না জড়িয়ে বরং মেনে নিতে শিখি, কারণ-বিশ্বাসে মিলায় শান্তি তর্কে বহু দূর। আমাদের উচিত হবে ভালোবাসার বন্ধনে আটকে যাওয়া যেখানে দলিল নয়, শুধু অনুভবে হৃদয় চিনিবে হৃদয়ের বন্ধুরে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]