প্রেম যখন বেদনার

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৫:৪৭ পিএম, ১৯ জুন ২০২১ | আপডেট: ০৬:১৬ পিএম, ১৯ জুন ২০২১

সুইডেনে যেখানে সেখানে লেক। গরমের সময় ছোটবড় সবাই লেকের ধারে সময় কাটায়। আমি ইদানিং স্টকহোম ছেড়ে একটু গ্রামের দিকে এসেছি। ছোটবেলায় গরমে নবগঙ্গা নদীতে গোসল করেছি। পানি দেখলেই ঝাঁপ মারা ছোটবেলার অভ্যাস। সে কারণে আজও কিছুক্ষণ সাঁতার কাটা হলো। চমৎকার পরিবেশে ঘাসের ওপর চাদর ফেলে রোদে শুয়ে আছি। বহু বছর দেশের বাইরে, বিশ্বের নানা দেশে সাগর পাড়ে ছুটি কেটেছে।

রোদে শুয়ে আছি, অনেক কথাই মনে পড়ছে। তখন বয়স তেমন বেশি না প্রেমপ্রীতি নিয়ে কথা হতো। কয়েকজন বন্ধু সাগরে সাঁতার কাটছি আর আলোচনা করছি ভালোবাসা নিয়ে। এক বন্ধুর ধারণা, ভালোবাসা গভীর থাকলে কথা বা ভাষা জরুরি নয়! আরেক বন্ধুর ধারণা, ভাষা জানলে মনের কথা গুছিয়ে বলা যায়। ভালোবাসা গভীর হয়। একজন বললো কথা বলার মধ্য দিয়েই কেবল স্বামী-স্ত্রী বা পার্টনারের মধ্যে হওয়া নানা রকম ভুল বোঝাবুঝি এবং দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানো সম্ভব।

আমি তাদের প্রশ্ন করলাম গভীর ভালোবাসা মানে কী? এক বন্ধু বললো সন্দেহ ছাড়া ভালোবাসা গভীর ভালোবাসা। শুরু হলো তর্ক-বিতর্ক, আমি বেশ মজার সঙ্গে শুনছি। তাদের আলোচনা চলছে যেমন— অনেক প্রেমিকা-প্রেমিকা গর্ব করে বলেন যে, তারা কেউ কাউকে সন্দেহ করেন না। এটাও একেবারেই ভুল! কারণ, ভালোবাসার মূলমন্ত্র হচ্ছে বিশ্বাস। তবে দু’জনের সম্পর্কের মধ্যে যদি সন্দেহ বা খানিকটা ঈর্ষা না থাকে, তাহলে মনে হতে পারে যে, একে অপরের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

একটু আধটু সন্দেহ থাকা ভালোবাসারই নামান্তর। যৌনমিলন যত বেশি, সম্পর্ক তত স্থিতিশীল এটাও একটি ভুল ধারণা। দাম্পত্য জীবনে যৌনমিলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ–এ কথা ঠিক। তবে যৌনমিলন বেশি হলেই যে প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সম্পর্ক হবে সুখের বা স্থিতিশীল, তা কিন্তু বলা যায় না। কারণ, সুখের সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম।

প্রেম একবারই আসে জীবনে এ ধারণাও ভুল। একবার প্রেমে ব্যর্থ হলে বা কষ্ট পেলে অনেকে আর নতুন করে কাউকে ভালোবাসতে চায় না, এ কথা ঠিক। যদিও ব্যর্থ প্রেমের পর নতুন করে কাউকে ভালোবাসতে কিছুদিন সময় লাগে, তবে ভালোবাসা হতে পারে একাধিকবার।

সব সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না। প্রতিশ্রুতিহীন সম্পর্ককে সহজ সমীকরণে মেলানো যায় না। এটি অনেক রকম জটিলতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ডেকে আনে। প্রেম করব কিন্তু বিয়ে করব না, এমন সম্পর্কও যেমন স্থায়ী হয় না, তেমনি আবার ভালোবাসা নেই কিন্তু কথা দিয়ে ফেলেছি—সে সম্পর্কও সুখ বয়ে আনে না। ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতির যুগলবন্দিতে একটি সম্পর্ক পূর্ণ সৌন্দর্যে বিকশিত হতে পারে।

তারপর পাশ্চাত্যে লিভ টুগেদার খুব সাধারণ একটি বিষয় হলেও আমাদের দেশে তা ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তারপরও অস্বীকার করার উপায় নেই আমাদের সমাজে লিভ টুগেদার করার প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলছে। সামাজিকভাবে স্বীকৃতি না হলেও গোপনে অনেক প্রেমিকযুগলই লিভ টুগেদার করে। একই ছাদের নিচে তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করে বিয়ে না করেই।

অনেকেই স্বামী-স্ত্রীর মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া করে। যারা একা থাকে বা পরিবার থেকে দূরে থাকে, তাদের মধ্যেই এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। যে যাকে যত বেশি ভালোবাসে, তার চোখে সে তত বেশি সুন্দর- এই চরম সত্য কথাটি কেন যেন আমাদের সমাজ মেনে নিতে চায় না! আমাদের সমাজে শারীরিক সৌন্দর্যকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয়। ঠিক এ কারণেই যখন কোনো ফর্সা, রূপবান ছেলে তার চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম সুন্দর ও কালো মেয়ের প্রেমে পড়ে, তখন তার দিকে সবাই তীর্যক চোখে তাকায়।

একই ব্যাপার ঘটে সুন্দরী মেয়েদের ক্ষেত্রেও। অসুন্দর বা কম সুন্দর নারী-পুরুষদের যেন প্রেম করার যোগ্যতা নেই! তাই শারীরিক সৌন্দর্যও আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রেমের ক্ষেত্রে একটি বিতর্কিত প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা সময় প্রেমে জড়িয়ে পড়া মানে ছিল বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হওয়া।

সময় বদলেছে। বিশ্বায়নের এই মুক্ত দুনিয়ায় পশ্চিমের হাওয়া ঢুকে পড়েছে এ দেশেও। ফলে কমিটেড বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কের বাইরে এমন সম্পর্কেও মানুষ জড়াচ্ছে, যেখানে আজীবন একত্র বাসের অঙ্গীকার নেই, যেখানে প্রেমের উদ্দেশ্য—পরস্পরের সান্নিধ্যে বর্তমান সময় পার করা।

বিভিন্ন কারণে মানুষ দায়বদ্ধতায় যেতে অনাগ্রহী হয়। বিয়ে শুধু দুটি মানুষের যৌথ জীবনকে বৈধতা দেয়ার বিধান নয়, বিয়ে দুটি পরিবারের মধ্যে বন্ধনও বটে। বর-কনের পেশাগত-সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে দুটি মানুষের নিজস্ব জীবনপন্থা পাল্টে দিয়ে নানা রকম দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার ভার চাপিয়ে দেয়। তাই সফল প্রেমিক জুটি সফল দম্পতি না-ও হতে পারেন।

যাই হোক না কেন সেদিনের আলোচনার প্রেক্ষিতে অনেক কিছু লেখা হলো। আমার এক বাংলাদেশি বন্ধু থাকে পাশের অন্য একটি দেশে। সে তখন কয়েকটি ভাষা শিখেছে। তার ধারণা বেশি ভাষা জানলে মনের কথা গুছিয়ে বলা যায়। ভালোবাসা গভীর হয়। নতুন বান্ধবীদের সঙ্গে পরিচয় হয় ইত্যাদি। আমি তার কথা শুনলাম বটে তবে কোন তর্কে গেলাম না। কিছু দিন যেতে ফোন করেছে, কি ব্যাপার জিঙ্গেস করলাম।

উত্তরে বললো সে কোনো একটি বারে গিয়েছিল তার স্পেনিশ ভাষা প্র্যাক্টিস করতে। একটি মেয়ে তাকে নাকি বলেছে নাচতে। বন্ধু বলেছে ড্যান্স পারি না। মেক্সিকান মেয়ে বন্ধুকে বলেছে যে ডান্স জানে না তার কপালে তো মেয়ে জুটবে না। এ খবরে বন্ধুর মন খুব খারাপ তাই ফোন করছে। বন্ধুর ধারণা ছিল কয়েকটি ভাষা জানার ফলে প্রেমে সুবিধা হবে, কিন্তু না হলো না, শেষে দেখা গেল যে তাকে ডান্সের কোর্সে ভর্তি হতে হয়েছে।

বন্ধুর কথা শুনে একটু হাসি পেয়েছিলাম কিন্তু তাকে বুঝতে দেইনি। বন্ধু শেষে দেশে গিয়ে বিয়ে করে। যাইহোক অবকাশে অনেক কথায় মনে পড়ে, আজও তাই হয়েছে। হঠাৎ একটি পুরনো গল্প মনে পড়ে গেল ভাবছি শেয়ার করি শেয়ার ভ্যালুর কনসেপ্ট থেকে। রোঞ্জিত বিবাহিত হওয়া স্বত্বেও বউকে লুকিয়ে অন্য মেয়ের সাথে প্রেম করে। একদিন গার্লফ্রেন্ড তাকে বলল, ‘তোমার দাড়ি শেভ করো, কেমন জংলী জংলী দেখতে...বাজে লাগে।’

রঞ্জিত মনে মনে ভাবল, বউ ভালোবেসে এই দাড়ি রাখতে বলেছে... আর আমি যদি শেভ করে ফেলি... বউ তো আমাকে মেরেই ফেলবে। রঞ্জিত কিন্তু কিন্তু করে একটু সোহাগ করে বলল, অসুবিধে আছে, দাড়ি শেভ করা যাবে না। রেগে গিয়ে গার্লফ্রেন্ড বলল, করবে না? শেভ করবে না তো? শোনো, হয় দাড়ি শেভ করবে, নইলে এই বন মানুষের মত দাড়িওলা মুখ নিয়ে আমার সাথে আর কোনোদিন দেখা করবে না।

অনেক বোঝাবার পরেও রঞ্জিতের গার্লফ্রেন্ডের মন ভিজলো না। নিরূপায় হয়ে রাতে বাড়ি ফেরার পথে রঞ্জিত সেলুনে গিয়ে বৌয়ের সাধের দাড়ি কেটে ফেলল। বাড়ি এসে দেখে বউ সব আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বউ-এর গালাগালি খাওয়ার ভয়ে রঞ্জিত চুপিচুপি ঘরে ঢুকে দরজা আটকে বউ-এর পাশে শুয়ে পড়ল। ঘুম আর আসে না। চিন্তা হচ্ছে, কাল সকালে তার দাড়িহীন মুখ দেখে বৌয়ের কি প্রতিক্রিয়া হবে।

কিছুক্ষণ পর রঞ্জিতের বউ পাশ ফিরে ঘুমচোখে তার গালে হাত বুলিয়ে চমকে ওঠে, অন্ধকারের মধ্যে ধড়মড় করে উঠে বসে। ফিসফিস করে বলে, একি বিসনু... তুমি এখনো যাওনি..! তুমি একটা সব্বোনাশ না করে ছাড়বে না। এক্ষুনি আমার বর এসে পড়বে, পালাও শিগগিরই পালাও!

এ ধরনের ঘটনা এখন বাংলাদেশে শুধু গল্প নয়। ঘটে চলছে সারাক্ষণ, সর্বক্ষণ। গাছ থেকে যেমন প্রথমে ফুল পড়ে ফল হয়, কোনো এক সময় সেটাও ঝরে যায় শুধু গাছটিই টিকে থাকে, আমাদের জীবনেও প্রেম, বিয়ে, সংসার আবার কখনও ডিভোর্স হয়ে যায় শুধু স্মৃতিটায় টিকে থাকে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]