প্রবাসীদের জন্য বাবা দিবস মানেই দীর্ঘশ্বাস

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ০৪:১১ পিএম, ২১ জুন ২০২১ | আপডেট: ০৪:২৭ পিএম, ২১ জুন ২০২১
সিডনি হারবার ব্রিজের সামনে প্রবাসী কন্যা প্রণতির সঙ্গে সুবোধ দাশ

বাবা দিবস, সন্তানের প্রতি পিতার অকৃত্রিম স্নেহ, ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষার খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতা ভরে উঠেছে। অনেকেরই বাবা জীবিত আছেন আবার অনেকের বাবাই গত হয়েছেন কিন্তু রয়ে গেছেন সন্তানের স্মৃতিতে।

বাবা বিষয়ে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বলতেন, ‘পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই’। যাইহোক করোনার এই সময়ে বাবা দিবসটা অনেকের কাছেই বড্ড দুঃখের কারণ এই করোনা তাদের কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছে তাদের প্রাণপ্রিয় বাবাকে। যে বাবাকে পাশে নিয়ে কেক কেটে বা হুল্লোড় করে বাবা দিবস পালন করার কথা ছিল সেই বাবা আজ আশ্রয় নিয়েছেন ছবির ফ্রেমে।

আজ এমনই দু’জন বাবার গল্প বলব। প্রবাসে আমরা একে একে জীবনের সবকিছু অর্জন করলেও সবসময়ই যে জিনিসটা খুবই অনুভব করি সেটা হচ্ছে দেশে গুরুজনের অকৃত্রিম স্নেহ এবং ভালোবাসা। তাই প্রবাসী প্রথম প্রজন্ম সবসময়ই বোবাকান্না করে চলে দেশে ফেলে আসা স্বজনদের জন্য বিশেষ করে লুকিয়ে অশ্রু মোছে দেশে ফেলে আসা বাবা মায়ের জন্য।

অনেকেই চেষ্টা করেন বাবা মাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে রাখার। আবার অনেকেই নিয়ে আসতে না পারলেও কিছুদিনের জন্য হলেও বেড়াতে নিয়ে আসেন। আর তাও না পারলে অন্ততপক্ষে প্রতি বছর নিজেরা দেশে গিয়ে বাবা মাকে দেখে আসেন। তাদের স্নেহের স্পর্শে খুঁজে নেন প্রিয়জনের ওম। বর্তমান বিশ্বে বাবা মাকে চাইলেই দেখা যায়, কথা বলা যায় কিন্তু তাদের মায়াময় স্পর্শ পাওয়া যায় না।

সামান্য একটা স্পর্শ যে মানুষের দুঃখকে কতখানি লাঘব করতে পারে সেটা প্রবাসী মাত্রই আমরা হাড়েহাড়ে বুঝি। বিদেশে আসার পর আমার গিন্নী প্রায় প্রতিদিনই আমার শ্বশুর শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলতেন এবং কান্না করতেন। সময়ের পরিক্রমায় কান্নার পরিমাণটা কমে আসলেও দীর্ঘশ্বাস কিন্তু থেমে নেই। প্রতি বার তাদের সঙ্গে কথার শেষ করে বুকে আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা বেরিয়ে আসে মনের অজান্তেই।

Father-day3.jpg

সিডনি অপেরা হাউসের সামনে সুবোধ দাশ

আমরাও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের আমাদের কাছে নিয়ে আসতে পারিনি। আর করোনার কারণে তাদের কাছে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই পরিচিত কারো বাবা মা তাদের কাছে বেড়াতে আসলে আমরা সবসময়ই উনাদেরকে একটা দিনের জন্য হলেও আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতে বলতাম। গুরুজনদের সান্নিধ্যে আমরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ফিরে পেতাম দেশে ফেলে আসা স্বজনদের ছোঁয়া আর আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম ফিরে যেতো শেকড়ের কাছে।

আমার গিন্নীর ক্যাম্পাসের বান্ধবী প্রণতি। তারাও অস্ট্রেলিয়া থাকেন আমাদের বাসার কাছেরই একটা সাবার্বে। ২০১৭ সালে তাদের বাবা মা এবং ছোট ভাই তাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। আসার খবরে প্রণতির পাশাপাশি আমরাও খুশি হয়েছিলাম কারণ বহুদিন পর কোনো অভিভাবকদের দেখা পাওয়া যাবে। তারা অস্ট্রেলিয়া এসে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছিলেন।

প্রণতির বাবা সুবোধ কাকুর সঙ্গে এর আগে থেকেই ফেসবুকে যোগাযোগ ছিল তাই তিনি আমাদের সবাইকেই একেবারে নামে চিনতেন। ফেসবুকে আমরা যে কোনো কিছু পোস্ট করলেই তিনি এসে সবার আগে প্রতিক্রিয়া এবং মন্তব্য দিতেন। এভাবেই তিনি আমাদের কন্যা তাহিয়া এবং পুত্র রায়ানকে নিজের নাতি নাতনির মতোই স্নেহ করতেন।

আমিও কাকাবাবুর পোস্টগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। তিনি অফিসের কাজের জন্য বিভিন্ন জেলায় গেলেই সেসব জায়গার ছবি তুলে পোস্ট করতেন। সেগুলো আমার খুবই ভালো লাগতো তাই আমি তার কাছে আবদার করে রেখেছিলাম দেশে গেলে তার সঙ্গে ঘুরবো কিছুদিন।

এছাড়াও প্রণতির ছোট ভাই প্রীতমের সঙ্গেও ফেসবুকে যোগাযোগ ছিল। প্রীতম গ্রামীণফোনে চাকরি করেন। আমিও জীবনের একটা দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে বাংলালিংক কোম্পানিতে চাকরি করেছি। আর আমাদের অনেক বন্ধু বিভিন্ন টেলিকম কোম্পানিতে চাকরি করতো বা এখনও করে। সেদিক দিয়েও প্রীতমের সঙ্গে একটা আত্মিক টান অনুভব করতাম।

একটা সময় গ্রামীণফোন বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি তৈরি করলো। আমি আবদার করাতে প্রীতম আমাদের তিনজনের জন্য সেই জার্সি পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেগুলো এখনও আমরা যত্ন করে রেখে দিয়েছি। বাংলাদেশের খেলা থাকলেই আমরা সেগুলো পরে খেলা দেখি। আবার ছেলে এবং মেয়েটা স্কুলের ‘জার্সি ডে’তে সেই জার্সি পরে এখনও স্কুলে যায়।

অবশেষে একদিন সন্ধ্যার সময় তারা আমাদের বাসায় বেড়াতে আসলেন। এসেই তাহিয়া এবং রায়ানকে কাছে ডেকে নিয়ে পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। এ যেন জীবনের পরম আদরের ধনকে কাছে পাওয়া। তাহিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের বাসার ওয়াইফাই এর পাসওয়ার্ড কি? ও যখন পাসওয়ার্ডটা বললঃ তখন তিনি খুবই খুশি হলেন।

এরপর তাদের নানা নাতনির গল্প শুরু হলো। দেখে মনে হবে তাদের এই গল্প যেন আর কখনওই শেষ হবে না। ছোট্ট রায়ান মাঝে মধ্যে এসে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল। এরপর তাদের নিয়ে গেলাম আমাদের বাসার পাশের মিন্টো টেম্পলে। সেখানে গিয়ে পূজা সেরে কাকাবাবু অনেক ছবি তুলে নিলেন আর আমাকে বললেনঃ তোমাদের এখানকার মন্দিরগুলো অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

কাকাবাবুরও আমার মতো ছবি তোলার উৎসাহ ছিল। যে কোনো জায়গায় গেলে সেখানকার অনেক ছবি তুলতেন। এরপর রাতের খাওয়া শেষ করে শ্যালক প্রীতমকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমাদের বাসার পাশের সবার্ব কেন্টলিনের উদ্দেশ্যে। কেন্টলিন সবার্বটা জর্জেস নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। নদীর দুপাশেই ঘন বন।

Father-day3.jpg

সপরিবারে সুবোধ দাশ

তার মধ্যে দিয়েই আছে পায়ে হাঁটার (বুশ ওয়াক) পথ, সাইকেল চালানোর পথ এবং মোটরবাইক চালানোর পথ। গাড়ি চালিয়ে একটা জায়গায় গিয়ে রাস্তা শেষ হয়ে যায়। সেখানে গাড়ি পার্ক করে অন্য কাজগুলো শুরু করতে হয়। আমরা রাস্তার শেষ প্রান্তে যেয়ে গাড়ি পার্ক করে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি চাঁদমামা উঁকি দিচ্ছেন।

গোলাকৃতি জায়গাটার চারদিকেই বন তাই আমাদের মাথার উপরে শুধু এক টুকরো গোলাকার আকাশ দেখা যাচ্ছিল। প্রীতম বেশকিছু ছবি তুলে নিলো। এরপর বাসায় ফিরে আসলাম আমরা। তার কিছুক্ষণ পর তারা ফিরে গেলেন।

এটাই ছিল কাকাবাবুর সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। এরপর একটা সময় তারা দেশে ফিরে গেলেন কিন্তু আমার কখনও মনে হতো না যে তারা আমাদের থেকে দূরে আছেন কারণ কাকাবাবু ফেসবুকে প্রচন্ড সক্রিয় ছিলেন এবং আমাদের প্রত্যেকটা কাজকর্মে নজর রাখতেন। এভাবেই সময় বয়ে যাচ্ছিল। আমি মনে মনে পরিকল্পনা করছিলাম ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে কাকাবাবুর সাথে অন্ততপক্ষে একটা ট্যুর দেয়ার।

সেই মোতাবেক আমাদের টিকিটও করা ছিল আগাম কিন্তু করোনা এসে সব ভেস্তে দিলো। কাকবাবুকে অফিসের কাজেই বাসার বাইরে যেতে হত। তাই এর মধ্যেই এক সময় তিনি করোনায় আক্রান্ত হলেন। তিনি আমার দেখা একজন অন্যতম জীবনযোদ্ধা ছিলেন কারণ তার হৃদযন্ত্রের হাজারো সমস্যাকে কেয়ার না করেই উনি জীবন চালিয়ে নিচ্ছিলেন।

আমরা তাই এবারও ভেবেছিলেন তিনি করোনাকেও জয় করে আবার আমাদের মধ্যে ফিরে আসবেন কিন্তু এইবার তিনি আর ফিরলেন না। চলে গেলেন মহাকালের পথে। প্রবাসীর বাবা দিবস মানেই একটা দীর্ঘশ্বাসের নাম কারণ বাবাকে ছুঁয়ে দেখতে পারেন না। কিন্তু জীবিত থাকলে অন্ততপক্ষে কথা বলা যায়, তাকে দেখা যায়। করোনার জন্য আমাদের অনেকেই তাদের বাবাকে হারিয়েছেন।

তাই এখন তাদের জন্য বাবা দিবস মানে বোবা কান্নার দিবস। বাবার অন্যান্য সন্তানেরাও হয়তো কান্না করেন কিন্তু প্রবাসীদের সাথে তাদের তফাৎ হলো প্রবাসীরা তাদের বাবাদের শেষ সময়ে উপস্থিত থাকতে না পারার কারণে মনের মধ্যে একটা ক্ষত বয়ে নিয়ে চলেন বাকি জীবনটা। এরপর তাই যতবারই তাদের জীবনে বাবা দিবস আসে ততবারই মনের মধ্যে একটা হাহাকার কাজ করে।

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]