জাতিসংঘে ভেটো পদ্ধতি পরিবর্তন চাই

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৭:৪৩ পিএম, ২৫ জুন ২০২১

দীর্ঘ ছয় বছর (১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল) ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলে। বিজয়ী মিত্রশক্তি পরবর্তীকালে যাতে যুদ্ধ ও সংঘাত প্রতিরোধ করা যায় এই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়। তখনকার বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৈরি জাতিসংঘের সাংগঠনিক কাঠামো এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা। এই পাঁচটি দেশ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া এবং গণচীন। এর কারণ হলো এরা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী দেশ। এখানে মাত্র পাঁচটি দেশ দলবেঁধে বিশ্বের ১৯৩ দেশের উপর নজরদারি থেকে শুরু করে সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে।

গণচীন এ গ্রুপে আছে এবং এই ভেটো বিষয়ে কোনো আপত্তি করেনি। অথচ জি-৭ জোটে গণচীন না থাকার কারণে ইদানীং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছে, দলবেঁধে বিশ্ব চালানোর দিন শেষ। কয়েকটি দেশের ‘ছোট’ একটি গ্রুপ বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করবে, সেই দিন এখন আর নেই। কয়েকদিন আগে জি-৭ নেতাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে এ মন্তব্য করেছে চীন।

ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ৩ দিনের জি-৭ সম্মেলনে শনিবার চীনবিরোধী ঐক্যের প্রতিক্রিয়ায় পরদিন লন্ডন দূতাবাস থেকেই এ বিবৃতি দিয়েছে চীন। জি-৭ সম্মেলনের নাম উল্লেখ না করেই দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন আন্তর্জাতিক যে কোনও সিদ্ধান্ত বিশ্বের গুটিকয়েক দেশ ছোটখাট দল তৈরি করে নিয়ে ফেলত। সেদিন অনেক আগেই চলে গেছে।

আসলে কি চলে গেছে? চলেই যদি যায় তবে কিভাবে জাতিসংঘ টিকে আছে? যখনই কেউ বিতাড়িত তখনই বলতে শোনা যায়, ‘আমরা বিশ্বাস করি ছোট বা বড়, শক্তিশালী বা দুর্বল, ধনী কিংবা গরিব বলে আলাদা কিছু নেই। বিশ্বে সবাই সমান। সব দেশকেই সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।’

রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জি-৭ সম্মেলনে করোনা মোকাবিলা, প্রাকৃতিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোকে ইস্যু করা হলেও নেপথ্যে চীন বিরোধিতায় ঐকমত্য তৈরি করতেই এ সম্মেলন।

বিশ্বের ধনী দেশগুলোর এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাঁক্রো, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাঘি।

এছাড়া জি-৭ গোষ্ঠীর সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভার্চুয়ালি নিজের বক্তব্য পেশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গণচীনকে বাদ দিয়ে এযুগে কিছু করা মানে করোনার মতো ভয়াবহ কোনো কিছুকে আমন্ত্রণ জানানো ছাড়া আর কিছুই নয় বলে আমি মনে করি।

সেক্ষেত্রে পরিবর্তন যদি সত্যিই করতে হয় তবে জাতিসংঘের পরিবর্তন আগে করা দরকার। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ১৯৩। এর সদর দফতর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে অবস্থিত। জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী হলেন এর মহাসচিব। কথিত রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন সমস্যা এবং শত কোটি মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে জাতিসংঘের মহাসচিব এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ফ্রান্স এই ৫টি দেশের প্রত্যেকেই ভেটো ক্ষমতার অধিকারী। ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমে যে কোনো একটি দেশ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত যে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আইন প্রণয়ন অনুমোদনে বাধা প্রদান করতে পারে।

যার কারণে অন্যসব দেশ প্রস্তাবের পক্ষে থাকলেও কোনো কাজ হয় না। যেমন গণহত্যাসংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে বিধায় অনেক সমস্যার কোনো সমাধান নেই।

নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যদেশ বেসামরিক মানুষদেরকে রক্ষার চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেয়। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বেসামরিক মানুষদেরকে রক্ষায় দারুণভাবে ব্যর্থ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর এভাবেই চলছে জাতিসংঘের কাজ। বিশ্ব রাজনীতিতে জোর যার মুল্লুক তার কনসেপ্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের তেমন কোনো ক্ষমতা নেই জাতিসংঘে প্রভাব বিস্তার করা।

কেউই এখন আর রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে আগ্রহী নয়, সবাই চায় কেবল রাজত্ব করতে। বাঙালি এবং বাংলাদেশি বিতর্ক এখন আর আগের মতো নেই। ফলে কেউ এখন বাংলাকে যে সোনার বাংলা করতে হবে তা নিয়ে ভাবে না। তবে মুসলিম বাংলা গঠনের চিন্তা করছেন কেউ কেউ। কিন্তু সেটা সমাধান নয় কারণ মুসলিম শাসন দিয়েই তো ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে দল বেঁধেছিলাম।

কী পেয়েছি আর কী হারিয়েছি মনে আছে? এখন দরকার নৈতিক আদর্শ নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা করা। নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটিয়ে ধর্ম, বর্ণ, ভাষার দোহাই দিয়ে গণতন্ত্রের শাসন কায়েম করা সম্ভব হবে না। বরং দুর্নীতির অবসান ঘটাতে হবে।

সন্ত্রাস দূর করার জন্য বাংলাদেশে অপারেশন ক্লিনহার্ট, এনকাউন্টার, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি চালানো হচ্ছে। জঙ্গিবাদ দমনের জন্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জঙ্গিবাদবিরোধী যুদ্ধে শামিল থাকার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে।

কোভিড-১৯ এর কারণে গোটা বিশ্ব সমস্যার মাঝে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছে। গ্লোবালাইজেশন এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। বিশ্ব ভাবতে শুরু করেছে কীভাবে প্রযুক্তিকে আরো জোরালো করা এবং সেই সঙ্গে মানুষের ফিজিক্যাল মুভমেন্ট বন্ধ করা যায়। গ্লোবালাইজেশনের অবসান ঘটাতে হলে গ্লোবাল মুভমেন্টের বন্ধ করতে হবে।

তাকি আদৌ সম্ভব এখন? ধর্ম, রাজনীতি, বর্ণ ভাষাগতভাবে মানুষ জাতি চেষ্টা করেছে পৃথিবীতে স্থিতিশীলতা আনতে, সম্ভব হয়নি। এখন কী করা বাকি রয়েছে বা আমাদের কী করণীয় যদি একটি সুন্দর পৃথিবী পেতে চাই?

আমি মনে করি নিজ নিজ জায়গা থেকে পরিবর্তন আনতে হবে। Agree to disagree concept-এ বিশ্বাস আনতে হবে। দরিদ্রতা দূর করতে হবে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ কমাতে হবে, respect and be respected, accept and be accepted কনসেপ্টের উপর গুরত্ব দিতে হবে। ভিক্ষা, ধার বা অনুদান কখনও স্বাধীনতা দিতে পারে না।

সবশেষে জাতিসংঘের পরিবর্তন ঘটাতে হবে যেমন ৫টি সুপার পাওয়ার নয়, ১৯৩টি দেশের সমন্বয় ঘটাতে হবে সবধরনের সিদ্ধান্তে। নইলে সত্যের জয় কখনও হবে না। একটি সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা বলি, চীন ভেটো দেয়ায় মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিতে পারেনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ স্থানীয় সময় মঙ্গলবার মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে বসে। তবে চীন সমর্থন না দেয়ায় তারা যৌথ বিবৃতি দিতে ব্যর্থ হয়।

বিবিসির বুধবারের খবরে জানা যায়, যৌথ বিবৃতি দিতে চীনের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীনের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ঠিক একইভাবে রাশিয়ার ভেটো দেয়ার কারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কিছু করতে পারছে না বেলারুশ সমস্যা নিয়ে।

সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে বর্তমানে জাতিসংঘ বিশ্ব সমস্যার সমাধানে ‘গুড ফর নাথিং’ ভূমিকা পালন করছে। সেক্ষেত্রে ভুল হবে কি যদি বলি জাতিসংঘের পরিবর্তন ঘটাতে হবে আর তুলে নিতে হবে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা? একই সাথে মনে করিয়ে দিতে চাই বিশ্বকে আমরা সবাই রাজা আমাদের এই খোদার রাজত্বে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]