হঠাৎ ইউরো জ্যাকপটে ৪০০ মিলিয়ন!

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৫:১৭ পিএম, ০১ আগস্ট ২০২১

শুক্রবার, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চলেছে। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল, ডিনারে বসেছি, ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না। কয়েকবার রিং বাজার পর টেলিফোন ধরে বললাম, রহমান। ‘সেনারে রহমান, গ্রাটিস ফর মেগা ভিন্সতেন। ভি মোস্টে ফো ত্রেফ্ফা দেই স্নেল্লাহ! ছেই ইন্তে নেই।’ (মেগা বিজয়ের জন্য ধন্যবাদ, আমরা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই, না বলো না প্লিজ)!

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, তো উত্তরে বললাম, কে তুমি এবং মেগা বিজয়টাই বা কিসের? ‘আমি সুইডিশ এসপেল থেকে (লটারি এ্যাজেন্ট) আন্দের্স বলছি। তুমি ইউরো জ্যাকপট জিতেছ, ৪০০ মিলিয়ন ইউরো।’ আমি বললাম লাইনে থাকো। জ্যাকেটের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে লটারির নম্বরগুলো চেক করলাম। ফোন ধরে আন্দের্সকে বললাম নম্বরগুলো বলতো এবার?

আন্দের্স নম্বরগুলো বলছে আর আমি মেলাচ্ছি। কোথাও কোনো অমিল নেই, সব ঠিকমতো মিলে গেছে। টেলিফোন রেখে বাথরুমে গিয়ে হাতেমুখে ঠাণ্ডা পানি দিলাম। আমার স্ত্রী মারিয়া জিজ্ঞেস করছে কী ব্যাপার, কী হয়েছে?

আমি বললাম, ঘটনা ঘটে গেছে। কী ঘটনা? বললাম ৪০০ মিলিয়ন ইউরো। মারিয়া ড্রয়িং রুমে গিয়ে দিব্যি টিভি দেখছে। আমি কিছুক্ষণ একা একা থাকার পর মারিয়াকে বললাম, আমাকে জোরে একটু চিমটি দাওতো? ও বললো কেন? বললাম, ফোন করে বলছে আমি নাকি ৪০০ মিলিয়ন ইউরো জিতেছি।

মারিয়া উত্তরে বললো, তা চিমটি দিতে হবে কেন? আমি অবাক! বলে কী? এত টাকা জিতেছি, সে খুশিতে চিৎকার দিয়ে উঠে অজ্ঞান হয়ে পড়বে, তা না একদম স্বাভাবিক! যেভাবে টিভি দেখছিল সেভাবেই দেখে যাচ্ছে। আমাকে চিমটিটা পর্যন্ত দিল না। এক্ষেত্রে কোনো মানুষ তার মাথা ঠিক রাখতে পারে?

গতকাল আমার ক্ষেতে ছোট্ট একটি বেগুন ধরেছে বলতেই সে কী খুশি! অথচ ৪০০ মিলিয়ন ইউরো লটারিতে জিতেছি, দল বেঁধে কিছুক্ষণের মধ্যে টিভির ক্যামেরাম্যানসহ সাংবাদিক আসবে, ছবি তুলবে, ইন্টারভিউ নেবে। জিজ্ঞেস করবে এত টাকা দিয়ে কী করব, কী না করব, মাথার মধ্যে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে আমার, অথচ বউ আমার দিব্যি টিভি দেখছে? ধন্যবাদটা পর্যন্তও দিল না, ব্যাপার কী?

আমি মারিয়াকে বললাম, কী ব্যাপার তুমি খুশি হওনি? উত্তরে মারিয়া বললো, আমি বেজার ছিলাম কখন? আমি তো সব সময়ই খুশি।
আমি বললাম, এতগুলো টাকার খবর পেয়ে তোমার কি নতুন কোন চিন্তা মাথায় আসছে না?

মারিয়া বললো, আসছে একটাই চিন্তা, সেটা হচ্ছে তোমাকে নিয়ে। আমি বললাম সে আবার কী? মারিয়া বললো, তুমি কি সেই আগের মতই থাকবা নাকি বদলে যাবা, সেটাই ভাবছি এখন! আধাঘণ্টা ধরে যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে তুমি খুব ঝামেলার মধ্যে পড়েছ। আজ পুরো সন্ধ্যাটা মাটি হয়ে গেল। তারপর নানা জনে নানা সমস্যা নিয়ে হাজির হবে।

বন্ধুত্ব নষ্ট হবে, মন খারাপ হবে। আমি বললাম কী করা যেতে পারে তাহলে? মারিয়া বললো কয়েক মিলিয়ন ক্রোনার যেটা তোমার ব্যাংকের ধার আছে সেটা রেখে বাকি টাকা বাংলাদেশ এবং আফ্রিকার গরিবদের জন্য ডোনেট করবে। আমি বললাম তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? এত টাকা, সব দিয়ে দেব? আমরা কিছুই রাখব না?

আমার জীবনের বহু স্বপ্ন জমা হয়ে আছে, এক এক করে সেগুলো বলতে শুরু করলাম। মারিয়া কান পেতে সব শুনে বললো, যে টাকা পেয়েছ তাতে তো তোমার সমস্যারই সমাধান হবে না, সমাজের জন্য কী করবা? এই যে সারা জীবন শুনে আসছি মানুষের জন্য এটা করবা, ওটা করবা, সেটা করবা। এখন সুযোগটা যখন পেলে, নিজের বিবেকের কাছে এখন প্রশ্ন করে দেখো, অতীতের কথার সঙ্গে কি কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছো?

ভাবনায় পড়লাম, আধাঘণ্টা আগেও আমাদের আলোচনায় হাসি, তামাশায় ভরা ছিল। টাকা হাতে এখনও আসেনি, এর মাঝেই আমি সিরিয়াস হয়ে গেছি। আমি আর সেই আগের মতো নেই, থাকবোই বা কী করে? কোটি কোটি ডলারের মালিক। বড়ো লোকদের সারিতে এখন আমি। ইতোমধ্যে দরজায় নক করা শুরু হয়েছে।

দরজা খুলতে মন চাইছে না। মারিয়াকে বললাম, তুমি যাও কথা বলে বিদায় করে দাও। আমার শরীর ভালো না বলে দিও, যদি ঝামেলা করে। তাছাড়া সাংবাদিকদের আমি পছন্দ করি না, গত কয়েক দিন আগেও তাদের বলেছি বাংলাদেশের ফুটবলের উপরে একটি রিপোর্ট করতে, কেউ তেমন আগ্রহ দেখালো না। এখন দরজার সামনে রাত দুপুরে দাঁড়িয়ে আছে। থাক দাঁড়িয়ে, বুঝুক কেমন লাগে?

মারিয়া আমাকে বারবার ধাক্কা দিচ্ছে আর বলছে, রহমান, রহমান তুমি ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে কী সব বলছো? আমি হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে লটারি চেক করতে মানিব্যাগটা আনতে গেলাম। দেখি মানিব্যাগে কোনো লটারি টিকিট নেই। মারিয়া মনে করছে আমি পানি খেতে রান্নাঘরে গিয়েছি। কিছুক্ষণ পর ফিরে খাটে এসে মারিয়াকে বললাম বড্ড দুঃস্বপ্ন দেখেছি।

মারিয়া আমার গায়ে হাত বুলাতে লাগলো, কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না তবে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাজে সকাল সাতটা। দরজা নক করছে, মিস্ত্রী এসেছে ব্যালকনি গ্লেজিঙ করতে। উঠে দরজা খুলে দিলাম। কাজ চলছে। আমি সকালের নাস্তা শেষ করেছি, যাব এখন মাঠে সবজিগুলোতে পানি দিতে।

সুইডেনে এবার খুব গরম পড়েছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো। গোটা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন (ক্লাইমেট চেঞ্জ)-এর কারণে একের পর এক চলছে মহামারি, দুর্যোগ, বন্যাসহ হাজারও সমস্যা। এর থেকে রেহাই পেতে শারীরিক পরিশ্রম, নিজ হাতে কৃষিকাজ যেমন গাছপালা, শাকসবজি উৎপাদন করা ছাড়া গতি নেই।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]