মালয়েশিয়ার টেকসই অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রয়েছে বিদেশি শ্রমিকদের

আহমাদুল কবির
আহমাদুল কবির আহমাদুল কবির , মালয়েশিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৫:১৬ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

মালয়েশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১৬ সালের মার্চ থেকে একটি গবেষণা শুরু করে বিশ্বব্যাংক। ২০২০ সালের এপ্রিলে ‘হু ইজ কিপিং স্কোর? এসটিমেটিং দ্য নম্বর অব ফরেন ওয়ার্কার্স ইন মালয়েশিয়া’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়। সেখানে দেখানো হয়, মালয়েশিয়ার টেকসই অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রয়েছে বিদেশি শ্রমিকদের।

দেশটির লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য ব্যবহার করে এতে বলা হয়, সেখানে প্রায় ২২ লাখ ৭০ হাজার বিদেশিকর্মী বিভিন্নখাতে কর্মরত। সে হিসেবে দেশটিতে অবৈধভাবে কর্মরত প্রায় ১২ লাখ বিদেশি।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় অবৈধ হয়ে পড়া বিদেশিকর্মীর ৪১ শতাংশই বাংলাদেশি, ৩০ শতাংশ ইন্দোনেশিয়ার, ১২ শতাংশ ভারতের, ফিলিপাইনের ছয় শতাংশ ও নেপালের পাঁচ শতাংশ, দুই শতাংশ করে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারের নাগরিক। এছাড়া শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ড থেকে প্রবেশ করা কর্মীরাও মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থান করছেন।

অবৈধ হলেও মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে অবদান রাখায় এসব কর্মীদের নব্বইয়ের দশক থেকেই বৈধ হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, সম্প্রতি ৬ পি, রি হায়ারিং, রিকেলাইব্রাসি এবং কোম্পানি পরিবর্তন করার সুযোগও দিয়েছে দেশটি। এসব কর্মসূচির আওতায় বৈধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে বিদেশি কর্মীরা।

তাদের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মীদের অংশ সর্বাধিক। ফলে এটাই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের কর্মীরা বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করতে বেশি আগ্রহী। আবহাওয়া, খাবার, ধর্মীয় মিল থাকায় বাংলাদেশিদের জন্য পছন্দের অন্যতম দেশ মালয়েশিয়া।

অবৈধ হওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকের গবেষণা মতে, বিভিন্ন দেশ থেক উল্লেখযোগ্য একটা অংশ সেখানে গিয়েছিলেন ট্যুরিস্ট ভিসায় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ দেশে না ফিরে তারা সেখানে বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত হয়ে থেকে যাচ্ছেন। দেশটির আইন অনুযায়ী, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকরা ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে মালয়েশিয়ায় ৩০ দিনের বেশি অবস্থান করতে পারবেন না।

তবে আসিয়ানের সদস্য নয় এমন দেশগুলোর নাগরিকরাও অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থান করেছেন। এসব নাগরিকের বেশিরভাগ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার। এ কারণে মালয়েশিয়া সরকার ২০১৯ সালে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল ও মিয়ানমারের নাগরিকদের অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে।

jagonews24

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৭ সালেই মালয়েশিয়ায় এক লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ জন বিদেশি অন অ্যারাইভাল সুবিধা নিয়ে প্রবেশ করে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেখানে অবৈধভাবে অবস্থান করেছেন। একই সঙ্গে তারা কর্মসংস্থানের চেষ্টাও করেছেন। বৈধতা না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালায় দেশটির ইমিগ্রেশন ও পুলিশ। মাহাথির সরকারের সময় মালয়েশিয়ান নাগরিকদের অবৈধ বিদেশিদের সম্পর্কে তথ্য দিতে অনুরোধ করে এবং এখন অবধি বহাল আছে। ইদানিং বিশেষ টাস্কফোর্স করে ইমিগ্রেশন বিভাগের নেতৃত্বে বিদেশিকর্মী অধ্যুষিত এলাকা বা কারখানায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ বিদেশি শনাক্ত করা হচ্ছে। তবে বিদেশি নাগরিক বা কর্মীদের করোনাভাইরাসের টিকা বিনামূল্যে দিচ্ছে মালয়েশিয়া সরকার।

এদিকে চলমান করোনাভাইরাসের সংক্রমণে অন্য দেশের মতো মালয়েশিয়ার অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতির শিকার। ফলে স্থানীয়কর্মীদের কাজের পরিধি বাড়াতে প্রবাসীকর্মী কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। এরকম হলে অবৈধভাবে যারা কাজ করছে তাদের সেই কাজ হারিয়ে বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে যারা বৈধভাবে নিয়োগকর্তার অধীনে আছে তাদের কাজের অবস্থা আগের মতো আছে এবং মেয়াদ শেষ হলে নিয়োগকর্তা আইন অনুযায়ী নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরিসংখ্যান বলছে, মালয়েশিয়ায় অবৈধদের অধিকাংশই অদক্ষ ও স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিক। তারা দেশটির নিম্নমানের পেশায় কাজ করেন। এ অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে বড় অংশ প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও বাংলাদেশের। এ অনিয়মিতকর্মীদের মধ্যে অনেকেই দেশটির মধ্যে পলিয়ে থেকেই কাজ করে। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার এ অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধতা দিতে ‘জিরো ইরেগুলার মাইগ্রেশন বাই ২০২০’ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী অবৈধভাবে প্রবেশ, পাসপোর্ট-ভিসা না থাকা, ভিসার অপব্যবহার করা এবং ওভার স্টে করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলছে, দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অধিক অভিবাসন খরচ হওয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে অবৈধ হওয়ার হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক মালয়েশিয়াকে প্রস্তাব করেছে, প্রবাসীকর্মীদের জন্য অভিবাসন নীতি তৈরি করলে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে আরও এগিয়ে যেতে পারবে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তাদের সহযোগিতায় আরও এগিয়ে আসবে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে মালয়েশিয়া প্রতিনিয়ত উন্নত হলেও তাদের শ্রমবিষয়ক সুযোগ-সুবিধা অপরিবর্তিত রয়েছে। স্বল্পদক্ষ প্রবাসীদের ওপর তুলনামূলক কাজের চাপ বেশি থাকে। দেশটির উৎপাদনখাতে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমেছে বলেও উল্লেখ করেছে।

সম্প্রতি মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা মালয়েশিয়ায় থাকা কর্মীদের মিথ্যা আশ্বাস, কাজের মিথ্যা তথ্য, অতিরিক্ত অভিবাসন খরচ, বেতন, আবাসন, পাসপোর্ট আটকে রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ ২২টি বিষয়ে তথ্য দিতে অনুরোধ করেছে এবং কিছু এনজিও এ নিয়ে কাজ করছে। অপর দিকে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় একই বিষয়ে বা কর্মীর যে কোন সমস্যার বিষয়ে অবহিত করার জন্য ওয়ার্কিং ফর ওয়ার্কার নামক অ্যাপ চালু করেছে।

এমএসএম/এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]