ডরমিটরিতে ঢুকেই দেখলাম ভিন্নরূপ!

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:২১ পিএম, ০৭ অক্টোবর ২০২১

নূরুল আলম এন এ, সিঙ্গাপুর থেকে

সিঙ্গাপুর একটি ক্ষুদ্রতম দ্বীপরাষ্ট্র। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণতম প্রান্তে, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। দেশটির স্থলভূমির মোট আয়তন ৬৯৯ বর্গকিলোমিটার। মূল ভূখণ্ডটি একটি হীরকাকৃতি দ্বীপ, তবে এর প্রশাসনিক সীমানার ভেতরে আরও বেশ কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ অবস্থিত। কয়েক ডজন ক্ষুদ্রাকার দ্বীপের মধ্যে জুরং দ্বীপ, পুলাউ তেকোং, পুলাউ উবিন ও সেন্তোসা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বড়।

স্বপ্নের দেশ সিঙ্গাপুরে আসার আগে মাথায় অনেক কিছুই ঘুরপাক করছিল। কেমন হবে দেশটি, কোথায় থাকতে দেবে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কী আরও কত কিছু। আমার ভাবনার সঙ্গে কিছু মিল-অমিল পেয়েছি। দেশটি আসলেই চমৎকার। যেনো সৃষ্টিকর্তা নিজে আলাদা করে পরিপাটি করে বানিয়েছে। কিন্তু ডরমিটরিতে যখন প্রবেশ করলাম তখন দেখলাম ভিন্নরূপ।

এত সুন্দর ও উন্নত একটি দেশে শ্রমিকদের বেহাল দশা। প্রবাসীদের একই রুমে ঠাসাঠাসি করে রাখবে তা ছিলো ধারণার বাইরে। যদিও বেশ কিছু নতুন ডরমিটরিকে উন্নত করা হয়েছে কিন্তু এখনো অনেকগুলো পুরোনো রয়েছে যেখানে বসবাস করা সত্যিই কঠিন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুস্থ থাকার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো গুরুত্ব নেই।

সিঙ্গাপুর ডরমিটরিতে বসবাসরত প্রবাসী শ্রমিকদের যেসব সমস্যায় প্রতিনিয়ত পড়তে হয় তুলে ধরা হলো-

একই রুমে বেশি মানুষ থাকায় পরস্পরের কথোপকথনে সমস্যা হয়। কেউ আগেই ঘুমিয়ে পড়েন, কেউ দীর্ঘ সময় ফোনে কথা বলেন, কেউ খাবার খাচ্ছেন, কেউ মোবাইলে গেম খেলছেন কেউবা বাল্ব বন্ধ বা চালু রাখছেন।

অধিকাংশ ডরমিটরিতে নিষ্কাশন ফ্যান না থাকায় রুমের ভেতরে প্রচুর গরম লাগে। কাছাকাছি টয়লেট থেকেও গন্ধ আসে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

একই রুমে বিভিন্ন জাতির মানুষ বসবাস করায় খাবার-দাবার নিয়ে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন- কেউ লাইট অফ করে আগেই ঘুমিয়ে পড়েন আবার কেউ পরে ঘুমান। কেউ রুমেই ড্রিংক করেন।

বড় সমস্যা হলো সকালে ঘুম থেকে উঠেই টয়লেটে লাইন ধরে দাঁড়াতে হয়। পর্যাপ্ত বাথরুম না থাকায় শারীরিক সমস্যাতেও পড়তে হয় অনেককে।

পর্যাপ্ত গ্যাসের চুলা না থাকায় রান্নার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়াও মাঝে মাঝে গ্যাসের সংকটে পড়লে রান্নায় ব্যাঘাত ঘটে।

ডরমিটরিতে ফ্রিজ রাখার অনুমতি না থাকায় অতিরিক্ত খাবার, ফল বা সবজি নষ্ট হয়। সেজন্য প্রবাসীরা সপ্তাহের জন্য খাবার বা ফল কিনে রাখতে পারেন না।

কাজ শেষ করে রাতে গোসলে অধিকাংশ সময়ে লম্বা লাইন ধরতে হয় এবং পানির গতির কম থাকায় গোসল করেও শান্তি পাওয়া যায় না।

প্রতিটি ডরমিটরির সঙ্গে রয়েছে দোকান যা মিনিবাজার হিসেবে পরিচিত। এসব মিনিবাজার থেকে রান্নার যাবতীয় জিনিসপত্র কিনতে হয় কিন্তু দাম এতোই বেশি যে মাস শেষে বেতনের হিসাব থেকে অতিরিক্ত কমপক্ষে ৭০ ডলার চলে যায়।

এছাড়াও ডরমিটরির ক্যান্টিনের খাবার মানসম্মত নয় এবং দামও বেশি।

সবার জন্য পৃথক পৃথক প্রার্থনার জায়গা নেই। যদিও খেলাধুলার স্থানে প্রার্থনার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কিছু কিছু ডমমিটরিতে যাতায়াতের জন্য তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। ডরমিটরিতে থেকে বেশ দূরত্বে বাসস্ট্যান্ড/স্টেশন নেই। প্রতিটি ডরমিটরির নিকটবর্তী অন্তত একটি বাসস্ট্যান্ড থাকলে সবাই উপকৃত হতেন।

একটি বেডের উপর আরেকটি বেড থাকায় উঠা-নামায় উভয়ের সমস্যা হয়। নিজ নিজ ড্রয়ার না থাকায় টাকা-পয়সার নিরাপত্তায়ও ভুগতে হয়।

প্রতিটি ডরমিটরিতে লাইব্রেরি কিংবা রিডিংরুম থাকলেও তা প্রবাসীদের জন্য সবসময় উন্মুক্ত থাকে না। আয়তনেও যথেষ্ট নয়। খবরের কাগজ বিনামূল্যে দেওয়া হয় না। ফলে অনেকে তা পড়েও না।

কাপড়-চোপড় ধোয়ার জন্য অধিকাংশ ডরমিটরিতে মাসে ৪০ ডলার পর্যন্ত চার্জ কাটে জনপ্রতি। ফলে বেশিরভাগ প্রবাসীই জামাকাপড় ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার না করে নিজেরাই পরিষ্কার করে। অথচ কোম্পানি সবার কাছ থেকেই ৪০ ডলার কেটে নেই। যা খুবই দুঃখজনক।

ডরমিটরিতে বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। প্রবাসীদের মনের খোরাকের কথা বিবেচনা করে সপ্তাহে কিংবা মাসে অন্তত একবার হলেও বিনোদনের ব্যবস্থা করা উচিৎ।

ডরমিটরির দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে প্রবাসীরা তাদের পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সঠিকভাবে যোগাযোগ করতে পারে না। এক্ষেত্রে ডরমিটরিতে ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা দেওয়া উচিত।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]