মায়া

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ০৪:১৬ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০২১

আমি এত বেশি মায়া নিয়ে পৃথিবীতে এসেছি যে জীবিত সব কিছুর প্রতিতো অনুভব করিই জড় বস্তুদের প্রতিও অনেক মায়া তৈরি হয়ে যায় অবিশ্বাস্যভাবে। অস্ট্রেলিয়ায় এসে যখন নতুন বাসায় উঠলাম তখন বাইরে থেকে দেখে খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম। আর আমার যেহেতু সাংসারিক জ্ঞান একেবারে শূন্যের কোটায় তাই বাসাটা আমার কাছে ভালোই মনে হয়েছিলো। বাসায় ওঠার পর ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো চোখে পড়তে শুরু হলো।

প্রথম অসুবিধা ছিলো কাপড় শুকানোর কোনো জায়গা ছিল না। আমরা কাপড় শুকাতে দেওয়ার একটা ছোট তাক কিনে আনলাম কিন্তু রাখবো কোথায়? এর মধ্যে শুনলাম সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়া বাসার সামনে কাপড় শুকালে প্রতিবেশীরা অভিযোগ করতে পারে। তাই প্রথম কয়েকদিন বাসার ভেতরেই কাপড় শুকাতে দিলাম। কিন্তু এটাতো সাময়িক, স্থায়ী সমাধান কিভাবে হবে।

পরে আর কোনো কিছু চিন্তা না করেই তাকটা বাইরে দিয়ে কাপড় শুকানো শুরু করলাম। কিন্তু প্রথম দিকে খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম এই বুঝি পুলিশ এলো। আর কাপড় বাইরে শুকাতে দিতে যাওয়ার সময় চারপাশটা ভালো করে দেখে নিতাম যাতে কেউ কাপড় মেলার সময় আমাদের দেখে না ফেলে। এ যেন ঠিক চোর-পুলিশের লুকোচুরি খেলা।

কিন্তু পরে এসে বুঝলাম আমাদের ভয়টা নেহায়েতই অমূলক ছিল। কিন্তু সমস্যা যেটা দেখা দিলো সেটা হচ্ছে একটু জোরে বাতাস হলেই কাপড়সহ তাকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়তো। পরে উপরের বারান্দার খুঁটির সঙ্গে একটা সুতা দিয়ে টানা দিয়ে সেই সমস্যাটার একটা মোটামুটি সমাধান করা গেল। অবশ্য এরপরেও বেশ কয়েকবার তাকে বাবাজি ডিগবাজি দিয়েছিলো কিন্তু সেটাতে আমরা আর খুব বেশি অবাক হয়নি।

দ্বিতীয় সমস্যায় ছিল কাপড় ধোঁয়া। আমরা বাংলাদেশের মানুষ হাত দিয়ে কাপড় কেচেই অভ্যস্ত তাই সেভাবেই চললো বেশ কিছুদিন। কিন্তু এক সপ্তাহে যে পরিমাণ কাপড় জমা হতো সেটা ধুতে গিয়ে অন্য অনেক কাজে দেরি হয়ে যেত। পরে বাড়িওয়ালার পরামর্শে আমরা একটা ছোট ওয়াশিং মেশিন কিনলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ওয়াশিং মেশিনটার পাইপে শুধু ঠাণ্ডা পানিই আসে গরম পানি আসে না।

আর এদেশের ঠাণ্ডা পানি মানে অনেক ঠাণ্ডা পানি। তাই আমাদের বড় মানুষদের কাপড়ের ময়লাগুলো পরিষ্কার হচ্ছিলো কিন্তু বাচ্চাগুলোর কাপড়ের আঠালো ময়লা আর সেভাবে পরিষ্কার হচ্ছিলো না। তাই অবশেষে আবার হাতের ওপরই ভরসা করতে হলো তবে কিছুটা হলেও পরিশ্রম কমে গেলো সেটাই বা কম কি?

তৃতীয় সমস্যা ছিল রান্নার ব্যবস্থা। রান্নার জন্য ছিল একটা ইলেকট্রিক চুলা যেটা একের ভেতর তিন। সেটা একই সঙ্গে হিটার, মাইক্রোয়েভ ওভেন এবং বার-বি-কিউ এর মেশিন। আমরা শুধু হিটারটাই ব্যবহার করেছি বাকি সুবিধাগুলোর ব্যবহার আর শেখা হয়নি। সেই হিটার চালাতে গিয়েও কত ঝাক্কি। এটা কিভাবে চালু করতে হয়। তাপমাত্রা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। টাইমার কিভাবে কাজ করে। অবশেষে আমরা সেটাতে রান্না শিখে গেলাম।

কিন্তু ওটা গরম হতে অনেক সময় নিত তাই শুরুতে আমরা মনে করেছিলাম এটা বোধহয় নষ্ট। এরপর রান্না করতে গেলে অনবরত নাড়তে থাকতে হবে বিশেষ করে তরকারি তা না হলে পাতিলের তলায় লেগে যায়। সেটাতেও আমরা দিন দিন অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ছোটজন হামাগুড়ি/হাঁটা শুরু করার পর থেকে। তার সব খেলনা বাদ দিয়ে চুলার কাছে যাবে। চুলার হাড়ি-পাতিল ফেলে দেবে। এখন চুলা কি জ্বালানো অবস্থায় না নেভানো সেটাতো আর সে বুঝবে না। তাই সেটা আমাদের জন্য মোটেও নিরাপদ ছিল না।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে মজার সমস্যাটা হলো বাথরুম কাম টয়লেট নিয়ে। ছোটজন হামাগুড়ি দেওয়ার আগে পর্যন্ত মোটামুটি চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল যদিও বাথরুমে কোনো প্রকার লক ছিল না। কিন্তু ছোটজন হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করার পর শুরু হলো মজার ঝামেলাটা। যেই বাথরুমে যায় তাকে তার প্রাতঃক্রিয়া বাদ দিয়ে খেয়াল রাখতে হয় দরজার দিকে।

কখন তাহির এসে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলে ফেলে। তাই আসল কাজের চেয়ে দরজার দিকেই মনোযোগ বেশি দিতে হয়। আরও একটা সমস্যা হলো তাহিরেরও পানির প্রতি গভীর প্রেম। তাই সে এমনিতেও মাঝে মধ্যেই বাথরুমে গিয়ে কমোডে হাত দিয়ে পানি ধরার চেষ্টাই থাকে।

এসব সমস্যাগুলোকে সঙ্গে নিয়েই আমরা চারজন প্রাণী ভালোই ছিলাম। কিন্তু চুলার সমস্যাটা আসলেই অনেক বড় সমস্যা। এটা থেকে দুর্ঘটনা ঘটার সুযোগ অনেক বেশি। তারপরও যখন এই বাসাটা ছেড়ে যাচ্ছি কেন জানি মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কারণ এই বাসার প্রতিটা দেয়াল আমার চেনা। কোথায় কি আছে আমার জানা। ঘুম থেকে উঠলেই কি কি চোখে পড়বে সেটা আগে থেকেই ঠিক করা।

বাসার প্রত্যেকটা দরজা জানালাও আমাকে চেনে। বাসার বাইরের ঘাসগুলোও আমার বন্ধু। বাসার সামনের যে গাছটার ছায়ায় দাঁড়িয়ে মাঝে মধ্যে আমরা রাস্তার দিকে নজর রাখি সেও একলা হয়ে যাবে। বাসায় ঢোকার মুখের গেটের দু’পাশের ইটের থাম দুটাও হয়তো আমার মতো মন খারাপ করছে। আমি প্রায়ই তাহিরকে ওই দুটা থামের ওপর দাঁড় করিয়ে দিতাম।

গিন্নীর হাতে লাগানো ফুলগাছগুলোতে ফুল ফোটা শুরু হয়েছে। তারাও হয়তোবা কাঁদবে তাদের অভিভাবকের জন্য। বাসার সামনের চির-পরিচিত পার্কটাই হয়তো খেলতে আসা হবে খুবই কম। আমার দুর্বল মুহূর্তগুলোর সাক্ষী পার্কের বেঞ্চটাও এক হয়ে যাবে আবার। আমি আর চাইলেই রাত-বিরাতে মন উদাস হলে তার ওপর শুয়ে আকাশের তারার সঙ্গে কথা বলতে পারবো না।

বৃষ্টি আসলেই আমরা বাপ-বেটি পার্কটাতে জমে থাকা পানিতে হাঁটতে যেতে পারবো না। জোরে বাতাস বইলে আর ঘুড়ি নিয়ে বের হয়ে পড়তে পারবো না আমরা। আর সারারাত ধরে ডেকে চলা সঙ্গিহীন পাখিটা যে ছিল আমার নির্ঘুম রাতগুলোর একমাত্র সাথী। সেও হয়তো আমাকে অনেক মিস করবে। এই পার্কটাতেই তাহিরের প্রথম হাঁটা শুরু, তাহিয়ার সাইকেল চালনা।

পার্কের দোলনা দুটোতে তাদের ভাইবোনকে বসিয়ে একই সঙ্গে দোল দেওয়া হবে না হয়তো আমার। সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্যটার দিকে কেউ আর হয়তো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে তার কৈশোরের স্মৃতিচারণ করবে না।

এগুলোতো গেলো প্রকৃতির প্রতি মায়া। মানুষের প্রতি মায়াটার কথা আর বলছি না। তাহলে আবেগ সংবরণ করা মুশকিল হয়ে যাবে। তবে হয়তো এমনই অন্যকোনো একটা বাসাতে আমরা আবার থাকা শুরু করবো। একটা সময় সেই বাড়ির সবকিছুকে আপন করে নেব। সেখানেও অবশ্যই এমনি কোনো পার্কে আমরা মনের আনন্দে সবাই মিলে খেলা করবো।

কিন্তু মানুষের মন এক বিচিত্র জিনিস। সে অকারণেই তার স্মৃতিপটে অনেক অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি জমা করে রাখবে বিশেষ করে প্রথম কোনো কিছুর স্মৃতি মনে দাগ কেটে থাকে অনেকদিন। তাই অস্ট্রেলিয়ায় থাকাকালে ঘুরে ফিরেই মনে পড়ে যাবে এসব স্মৃতি। অকারণেই মনটা ভারি হয়ে যাবে। হোকনা ভারি তা হলে আর আমরা মানুষ কিভাবে? আমরাতো যন্ত্র হয়ে যেতাম?

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]